উচ্চশিক্ষা

ইতালিতে উচ্চশিক্ষা: কম খরচে পড়ার সুযোগ, আছে স্কলারশিপও

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য ইতালিতে রয়েছে বিশ্বের প্রাচীনতম সব বিশ্ববিদ্যালয়। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং ২০২৭-এ দেশটির শীর্ষ বিদ্যাপীঠগুলোর মধ্যে পলিটেকনিকো ডি মিলানো (৮৭), স্যাপিয়েঞ্জা ইউনিভার্সিটি অব রোম (১১১) ও ইউনিভার্সিটি অব বোলোগনা (১২৩) অন্যতম।

প্রধান ভাষা ইতালিয়ান হলেও ইংরেজিতে পরিচালিত অসংখ্য ডিগ্রি প্রোগ্রাম রয়েছে। বিশেষ করে মিলান, রোম ও তুরিনের মতো শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য জনপ্রিয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যারিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এখানে ইন্টার্নশিপ ও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও রয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি শেনজেনভুক্ত এই দেশটির সমৃদ্ধ ইতিহাস, শিল্প ও ইউনেসকোস্বীকৃত ৬২টি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান ইতালিকে শিক্ষার্থীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

চলুন, ইতালিতে পড়াশোনার আবেদন পদ্ধতি, স্টুডেন্ট ভিসা ও স্কলারশিপসহ যাবতীয় বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

ইতালির শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়

জনপ্রিয় কয়েকটি বিষয়

চারুকলা, ফ্যাশন ডিজাইন, ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা, সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক, হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম, মেডিসিন, কম্পিউটার সায়েন্স, অর্থনীতি, ফিন্যান্স, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি।

আবেদনের উপায়

ইতালি শিক্ষা ক্ষেত্রে দুই সেমিস্টার পদ্ধতি মেনে চলে -

ফল ইনটেক: প্রথম ভর্তি মৌসুমটি পরিচিত ফল ইনটেক নামে, যার আবেদন কার্যক্রম শুরু হয় নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যাবতীয় আবেদন শেষে কোর্স শুরু হয় সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে বা অক্টোবরের শুরুতে।

স্প্রিং ইনটেক: এই ইনটেকটিতে আবেদন নেওয়া হয় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এগুলোর সময়সীমা থাকে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ভর্তি শেষ করে কোর্স শুরু হয়।

এখানে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য পৃথকভাবে তাদের নিজস্ব ওয়েব পোর্টালে আবেদন করতে হয়। আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খরচসহ সুনির্দিষ্ট ডেডলাইনগুলো ওয়েবসাইটে বিস্তারিত উল্লেখ থাকে। এখানে খেয়াল রাখা উচিত যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু একটি বিষয়ে আবেদন জমা দেওয়া যায়।

প্রি-এনরোলমেন্ট

ইতালিতে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রি-এনরোলমেন্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ভর্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর এবং স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করার আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রি-এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করতে হয়। এর জন্য শিক্ষার্থীকে Universitaly পোর্টালে নিবন্ধনের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।

এ সময় পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যয়ন প্রোগ্রাম সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য ও নির্দেশনা পেতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট দেখতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিশন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যেতে পারে। এরপর নির্বাচিত অধ্যয়ন প্রোগ্রামের জন্য ইউনিভার্সইটালি পোর্টালে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি জমা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় আবেদনটি যাচাই ও গ্রহণ করার পর ইউনিভার্সইটালি  পোর্টালে প্রি-এনরোলমেন্টের অনুমোদন বা নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়। 

টিউশন ফি বা পড়ার খরচ বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সভেদে আলাদা হয়ে থাকে। তাই ফি কত এবং তা কখন পরিশোধ করতে হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক কিস্তিতে ফি পরিশোধের সুযোগ থাকলেও সবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কিস্তি বাধ্যতামূলক নয়।

আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

  • অনলাইনে পূরণ করা পূর্ণ আবেদনপত্র
  • একটি বৈধ পাসপোর্ট
  • বিগত শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি
  • স্নাতক প্রোগ্রামের জন্য হাইস্কুল ডিপ্লোমা বা সমতুল্য সনদ এবং একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট
  • স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামের জন্য স্নাতকের সনদ ও একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট
  • ডক্টরাল প্রোগ্রামের জন্য স্নাতকোত্তরের সনদ ও একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট
  • ভাষার দক্ষতা পরীক্ষার ন্যূনতম স্কোর
  • আইইএলটিএসে ৬ বা টোয়েফল আইবিটিতে ৫৯
  • মাস্টার্সের জন্য আইইএলটিএস স্কোর ৬.৫ কিংবা টোয়েফল আইবিটি ৭৯
  • পিএইচডির জন্য আইইএলটিএস স্কোর ৭ বা টোয়েফল আইবিটি ৯৬
  • অধ্যয়ন ফি পরিশোধের রশিদ: তিন কিস্তির ন্যূনতম এক কিস্তি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি প্রায় ১২০ ও ১৮০ ইউরোর মধ্যে থাকে, যা ১৫,৮৬২ থেকে ২৩,৭৯৩ টাকার (১ ইউরো = ১৩২.১৮ বাংলাদেশি টাকা) সমতুল্য।
  • সিভি
  • স্টেটমেন্ট অব পারপাস
  • একাধিক মোটিভেশন লেটার
  • মেডিকেল সার্টিফিকেট ও স্বাস্থ্যবিমা
  • জিম্যাট বা জিআরই পরীক্ষার ফলাফল (মাস্টার্সের জন্য)
  • পোর্টফোলিও: সৃজনশীল ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের জন্য
  • গবেষণা প্রস্তাব: পিএইচডির জন্য
  • যার অধীন গবেষণা করা হচ্ছে, তার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য এবং শিক্ষার্থীর গবেষণার তত্ত্বাবধান করবেন এই মর্মে একটি সম্মতিপত্র
  • প্রাসঙ্গিক পাবলিকেশনের সারাংশ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
  • কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ, নির্বাচিত কিছু প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে
  • বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্স ও প্রোগ্রাম বিশেষে আরও কিছু দরকারি কাগজ দিতে হতে পারে।

স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন পদ্ধতি

দীর্ঘমেয়াদি পড়াশোনার জন্য ইতালিতে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের টাইপ-ডি ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। ন্যাশনাল ভিসা নামে পরিচিত এই ভিসার মাধ্যমে ৯০ দিনের বেশি সময় ইতালিতে থাকার সুযোগ পাওয়া যায়। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ইতালির ভিসা আবেদনকেন্দ্র হিসেবে ভিএফএস গ্লোবাল-এর মাধ্যমে টাইপ-ডি ভিসার আবেদন করতে পারবেন।

আবেদনপত্রটি ডাউনলোড করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে পূরণ করতে হবে। এরপর সেটি প্রিন্ট করে নিজ হাতে সই করতে হবে। পূরণ করা আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে নির্ধারিত ভিসা আবেদনকেন্দ্রে জমা দিতে হবে।

ভিসার আবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

ইতালিতে উচ্চশিক্ষার জন্য স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করতে সাধারণত যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন

  • সম্পূর্ণ পূরণ ও স্বাক্ষর করা জাতীয় (টাইপ-ডি) ভিসা আবেদনপত্র। আবেদনপত্রটি ইংরেজি বা ইতালিয়ান ভাষায় পূরণ করতে হবে।
  • সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে তোলা দুটি একই রকম রঙিন ছবি। ছবির আকার ৪ × ৩ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার, ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা এবং আইসিএও ফরম্যাটের হতে হবে।
  • মূল পাসপোর্ট ও একটি ফটোকপি। পাসপোর্টে অন্তত দুটি ফাঁকা পৃষ্ঠা থাকতে হবে এবং এর মেয়াদ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অন্তত তিন মাস থাকতে হবে।
  • ইউনিভার্সিটালি পোর্টাল থেকে ডাউনলোড করা প্রি-এনরোলমেন্টের নিশ্চিতকরণ রসিদ। এতে ভর্তি ও টিউশন ফি-এর তথ্য থাকতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী ডিক্লারেশন অব ভ্যালু (DoV) বা এর জন্য আবেদনের রসিদ। বিকল্প হিসেবে যাচাইযোগ্য CIMEA সনদ দেওয়া যেতে পারে।
  • ইংরেজি ভাষার কোর্স হলে প্রয়োজন অনুযায়ী আইইএলটিএস সনদ। স্কোর কমপক্ষে ৬ হতে হবে এবং সনদটি ভিসা আবেদনের তারিখের দুই বছরের বেশি পুরোনো হওয়া যাবে না।
  • স্কলারশিপ পেয়ে থাকলে তার প্রমাণপত্র। তবে বৃত্তি পেলেও আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে।
  • আবেদনকারীর বাংলাদেশে পরিচালিত ব্যাংকের সর্বশেষ ১২ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট। প্রয়োজনে ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্ট বা অন্যান্য সম্পদের প্রমাণও দেওয়া যেতে পারে।
  • স্পনসর থাকলে তার সর্বশেষ ১২ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট। স্পনসর ইতালিতে বসবাস করলে তার বৈধ রেসিডেন্স পারমিটের কপিও দিতে হবে।
  • স্পনসর পরিবারের সদস্য হলে তার সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ। প্রয়োজনীয় জন্মসনদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অ্যাপোস্টিল করা থাকতে হবে।
  • ইতালিতে অন্তত ৩০ দিনের অস্থায়ী আবাসনের বুকিং, বাসা ভাড়ার চুক্তি অথবা ইতালির নাগরিক/বৈধ বাসিন্দার দেওয়া আবাসন ঘোষণাপত্র। ঘোষণাপত্রের সঙ্গে তার পরিচয়পত্রের কপিও দিতে হবে।
  • পিএনআর বা রিজার্ভেশন নম্বর এবং ভ্রমণসূচিসহ একমুখী বিমানের টিকিটের বুকিং।
  • পুরো শেনজেন এলাকায় গ্রহণযোগ্য ভ্রমণবিমা। এতে চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি ও প্রত্যাবাসন খরচসহ কমপক্ষে ৩০ হাজার ইউরোর কভারেজ থাকতে হবে।
  • বিবাহিত, তালাকপ্রাপ্ত, বিধবা বা বিপত্নীক হলে সংশ্লিষ্ট সনদ। এসব নথি ইংরেজিতে অনূদিত এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অ্যাপোস্টিল করা থাকতে হবে।
  • অপ্রাপ্তবয়স্ক আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিপত্র, তাদের পাসপোর্টের কপি, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ এবং অ্যাপোস্টিল করা জন্মসনদ।
  • বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বৈধভাবে বসবাসের রেসিডেন্স পারমিট।

ভিএফএস গ্লোবালে ভিসা আবেদন জমা

যাবতীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে প্রস্তুত করার পর ভিসা আবেদন ভিএফএস গ্লোবালের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। Universitaly পোর্টালে নিয়মিতভাবে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের ভিএফএস গ্লোবাল সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ভিসা আবেদন জমা দেওয়ার অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ ও সময় জানিয়ে দেবে। এক্ষেত্রে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, Universitaly-তে নিবন্ধনের সময় যে ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই একই ই-মেইলেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংক্রান্ত বার্তা পাঠানো হবে।

বাংলাদেশে ইতালির ভিসা আবেদন জমা দেওয়ার জন্য ভিএফএসের তিনটি কেন্দ্র রয়েছে - 

ঢাকা: নাফি টাওয়ার (৪র্থ ও ৫ম তলা), ৫৩, সাউথ গুলশান অ্যাভিনিউ, গুলশান ১, ঢাকা-১২১২।

চট্টগ্রাম: ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার চট্টগ্রাম (৫ম তলা), ১০২/১০৩ আগ্রাবাদ সি/এ, কমার্স কলেজ রোড, চট্টগ্রাম-৪১০০।

সিলেট: ভিসা অ্যান্ড লিগ্যালাইজেশন অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার, ৪র্থ তলা, নির্ভানা ইন কমপ্লেক্স, রামের দীঘির পাড়, মির্জাজঙ্গল রোড, সিলেট-৩১০০।

নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভিএফএস কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হবে। এ সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি প্রার্থীর ছবি তোলা ও বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে ভিসা ফি ও ভিএফএসের আনুষঙ্গিক খরচ পরিশোধ করতে হবে। এর বিপরীতে প্রার্থীকে রশিদ দেওয়া হবে।

ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সময় ও আনুষঙ্গিক খরচ

স্টাডি ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণে নির্দিষ্ট সময় লাগলেও, কাগজপত্র যাচাই, অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন হওয়া বা অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে ভিসার আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ভিসা আবেদনের জন্য নির্ধারিত ভিসা ফি এবং ভিএফএস গ্লোবালের সার্ভিস চার্জ প্রযোজ্য। ফি-এর পরিমাণ সময় ও প্রযোজ্য বিনিময় হার অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগে ভিএফএস গ্লোবালের বর্তমান ফি তালিকা দেখে সর্বশেষ পরিমাণ জেনে নেওয়া উচিত।

পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার সম্ভাব্য খরচ

বিষয়, প্রোগ্রামের স্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে ইতালিতে পড়াশোনার খরচে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের European Education Area-এর তথ্য অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক টিউশন ফি সাধারণত ৯০০ থেকে ৪ হাজার ইউরো বা প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার থেকে ৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরে প্রায় ৬,০০০ থেকে ২০,০০০ ইউরো বা তার বেশি খরচ হতে পারে, যা প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজার থেকে ২৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্স ও শিক্ষার্থীর পারিবারিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে ফি কম-বেশি হতে পারে।

ইতালিতে জীবনযাত্রার খরচও শহর ও ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থীর মাসিক জীবনযাত্রার খরচ সাধারণত ৭০০ থেকে ১,১০০ ইউরো বা প্রায় ৯৮,০০০ থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা হতে পারে। 

প্রধান শহরগুলোর আবাসন ব্যয়ের আনুমানিক চিত্র অনুযায়ী - 

নাম্বিও (গ্লোবাল লিভিং কস্ট ডেটাবেজ) - এর শহরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ইতালির প্রধান শহরগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় শহর ও বাসস্থানের ধরনভেদে ভিন্ন হয়। একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ মিলিয়ে মাসিক বাজেট আনুমানিক হতে পারে - 

রোম: প্রায় ১,৮০০ থেকে ২,২০০ ইউরো 

মিলান: প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৪০০ ইউরো 

বোলোগনা: প্রায় ১,৬০০ থেকে ২,০০০ ইউরো

ফ্লোরেন্স: প্রায় ১,৭০০ থেকে ২,২০০ ইউরো 

তুরিন: প্রায় ১,৪০০ থেকে ১,৭০০ ইউরো 

ইতালিতে স্কলারশিপের সুযোগ-সুবিধা

ইতালির শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত ব্যয়বহুল শহরগুলোতে অবস্থিত হওয়ায় সামগ্রিক খরচের চাপ সামলাতে স্কলারশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইতালিতে সরকারি, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিচালিত বিভিন্ন স্কলারশিপের দারুণ সুযোগ রয়েছে:

১. ইতালীয় সরকারি স্কলারশিপ (MAECI)

ইতালির পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্ত্রণালয় (MAECI) কর্তৃক প্রদত্ত এই সরকারি স্কলারশিপের জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারেন। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের মাসে ১,২০০ ইউরো করে সর্বোচ্চ ৯ মাসে মোট ১০,৮০০ ইউরো প্রদান করা হয়। এই বৃত্তিটি মাস্টার্স, উচ্চশিক্ষার কলা, সংগীত ও নৃত্য (AFAM), পিএইচডি, যৌথ তত্ত্বাবধানে গবেষণা এবং ইতালিয়ান ভাষা ও সংস্কৃতির নির্দিষ্ট কোর্সের জন্য প্রযোজ্য।

২. ইউনিভার্সিটি অব বোলোগনা স্কলারশিপ (International Talents @Unibo)

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক এই বৃত্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। তবে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের বৃত্তির সুনির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ বা শর্তাবলি জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুসরণ করা প্রয়োজন।

৩. ইউনিভার্সিটি অব পাডুয়া (Padua International Excellence Scholarship)

ইংরেজিতে পরিচালিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) প্রোগ্রামের মেধাবী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এই স্কলারশিপ দেওয়া হয়। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে এই বৃত্তির আওতায় সর্বোচ্চ ৬৯ জন শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করা হবে। এতে বছরে ৮,০০০ ইউরো বৃত্তির পাশাপাশি সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফের সুবিধা রয়েছে।

৪. ইনভেস্ট ইউর ট্যালেন্ট ইন ইতালি (Invest Your Talent in Italy - IYT)

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও এই বিশেষ প্রোগ্রামের জন্য যোগ্য। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে এই বৃত্তির মেয়াদ ৯ মাস এবং বার্ষিক বরাদ্দের পরিমাণ ১০,৮০০ ইউরো। নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট মাস্টার্স বা পোস্টগ্র্যাজুয়েট কোর্সে অধ্যয়নের পাশাপাশি ইতালীয় কোনো প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ বা পেশাগত প্রশিক্ষণের সুবর্ণ সুযোগ পান। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি ও অ্যাডমিশন ফি মওকুফ থাকলেও আঞ্চলিক শিক্ষা কর, স্ট্যাম্প ডিউটি এবং স্বাস্থ্যবিমার খরচ শিক্ষার্থীকে নিজে বহন করতে হয়।

৫. ইরাসমাস মুন্ডুস জয়েন্ট মাস্টার্স (Erasmus Mundus Joint Masters - EMJM)

এটি মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) Erasmus+ কর্মসূচির আওতাধীন একটি যৌথ মাস্টার্স প্রোগ্রাম, যা শুধুমাত্র ইতালিতেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেসব ইইউ প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেগুলোতে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ ২৪ মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ১,৪০০ ইউরো করে বৃত্তি পেতে পারেন। এই বৃত্তিতে টিউশন ফি, ভ্রমণ, ভিসা এবং আবাসনসহ যাবতীয় আনুষঙ্গিক খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।

খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ

ইতালিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করতে পারেন। এর জন্য আলাদা ‘ওয়ার্ক পারমিট’ নেওয়ার প্রয়োজন নেই; স্টাডি রেসিডেন্স পারমিট নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কাজের অনুমতি দেয়। শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা এবং বছরে সর্বোচ্চ ১,০৪০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন।

তবে পড়াশোনাই শিক্ষার্থীর মূল কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০ ঘণ্টার সাপ্তাহিক সীমার বেশি নিয়মিত কাজ করতে হলে স্টাডি পারমিটকে কাজের পারমিটে রূপান্তর করতে হয়। ইতালির সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ স্টাডি পারমিট থাকা অবস্থায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে এটি কাজের পারমিটে রূপান্তর করা সম্ভব।

খণ্ডকালীন কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ‘১৫০ ওরে’ নামে একটি বিশেষ সুযোগও রয়েছে। এটি সাধারণ চাকরি নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, লাইব্রেরি, শিক্ষার্থীসেবা ও অন্যান্য সহায়ক কাজে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণত পরিবারের আয় ও মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয় এবং এখানে সর্বোচ্চ ১৫০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে কাজের ধরন ও পারিশ্রমিক ভিন্ন হতে পারে; উদাহরণস্বরূপ, ইউনিভার্সিটি অব বোলোগনায় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ১৫০ ঘণ্টার এই সহযোগিতায় প্রতি ঘণ্টায় ৮.৫০ ইউরো পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে।

ইতালিতে শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য আয় কোনো নির্দিষ্ট চাকরির পদের ওপর ভিত্তি করে দেশজুড়ে এক নির্ধারিত হারে ধরা ঠিক নয়। চাকরির ধরন, শহর, নিয়োগদাতা ও স্থানীয় শ্রমচুক্তি অনুযায়ী মজুরি পরিবর্তিত হয়। ইতালির পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষেত্রভেদে গড় ঘণ্টাপ্রতি আয়ে পার্থক্য দেখা যায় - বিশেষ করে আবাসন ও খাদ্যসেবা খাতে এই হার তুলনামূলক ভিন্ন হয়।

তাই বাস্তবসম্মতভাবে বলা যায়, ইতালিতে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকলেও শিক্ষার্থী কোন শহরে আছেন, কাজের ধরন কেমন এবং তার ইতালীয় ভাষার দক্ষতা কতটুকু, তার ওপরই মূলত চাকরি পাওয়া এবং আয়ের পরিমাণ নির্ভর করে।