ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য আয়ারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ওষুধশিল্প ও অন্যান্য খাতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সম্ভাবনাও তৈরি করে।
তবে আয়ারল্যান্ডে পড়তে যাওয়ার আগে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা কোর্স বেছে নিলেই হয় না। ভর্তি যোগ্যতা, টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বৃত্তি, ভিসার শর্ত এবং পড়াশোনা শেষে কাজ করার সুযোগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
কেন আয়ারল্যান্ড সেরা গন্তব্য হিসেবে পরিচিত
আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা: আয়ারল্যান্ডের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন, ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন, ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক ও ইউনিভার্সিটি অব গালওয়ে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে পাঠ্যক্রম, গবেষণার সুযোগ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা আলাদা।
কর্মজীবনের সম্ভাবনা: দেশটিতে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ইউরোপীয় কার্যালয় ও কার্যক্রম রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত যোগাযোগ তৈরির সুযোগ পেতে পারেন। তবে এসব সুযোগ নিশ্চিত নয় বরং বিষয়, দক্ষতা ও নিয়োগকর্তার শর্তের ওপর তা নির্ভর করে।
ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা: আয়ারল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জন্য ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। ফলে নতুন ভাষা শেখার অতিরিক্ত চাপ ছাড়াই ক্লাস, গবেষণা ও দৈনন্দিন যোগাযোগে অংশ নেওয়া তুলনামূলক সহজ হয়।
আয়ারল্যান্ডের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়
- ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন
- ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন
- ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি
- ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক
- ইউনিভার্সিটি অব গালওয়ে
- ইউনিভার্সিটি অব লিমেরিক
- মায়নুথ ইউনিভার্সিটি
বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের সময় শুধু র্যাঙ্কিং নয়, নির্দিষ্ট কোর্সের মান, টিউশন ফি, বৃত্তির সুযোগ, অবস্থান ও স্নাতক শেষে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা উচিত। র্যাঙ্কিং প্রতিবছর পরিবর্তিত হয়। তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট বছরের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে তথ্য যাচাই করতে হবে।
বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্যবিজ্ঞান, ব্যবসায়িক বিশ্লেষণ, অর্থনীতি ও অর্থায়ন, ব্যবসায় প্রশাসন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান এবং আতিথেয়তা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা। তবে কোনো বিষয়ে চাকরির চাহিদা থাকলেই সব স্নাতকের চাকরি নিশ্চিত হয় না।
ভর্তির যোগ্যতাসমূহ
ভর্তির শর্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাস্তর ও কোর্স অনুযায়ী ভিন্ন হয়। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামগুলোর জন্য উচ্চমাধ্যমিক সনদ পরীক্ষায় সাধারণত কমপক্ষে ৭৫% নম্বর থাকা প্রয়োজন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ক্ষেত্রে সাধারণ শর্ত হচ্ছে, একই বিষয়ে ন্যূনতম ৬০% বা তার বেশি স্কোরের স্নাতক ডিগ্রি। মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্যও একই বা প্রাসঙ্গিক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন। পিএইচডির জন্য প্রকাশনা ও এমবিএর ক্ষেত্রে পেশাগত অভিজ্ঞতা দেখাতে হবে। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার জন্য আইইএলটিএস, টোয়েফেল বা পিটিইয়ের মতো ভাষা যাচাই পরীক্ষার স্কোরগুলো দেখা হয়।
তবে প্রয়োজনীয় স্কোর কোর্সভেদে আলাদা হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্ত দেখে নিতে হবে।
আবেদন করবেন যেভাবে
আয়ারল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদনের পদ্ধতি এক নয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। আবার কোনো কোনো প্রোগ্রামে আলাদা আবেদনব্যবস্থা থাকতে পারে। আবেদনের আগে সাধারণত যেসব নথি প্রস্তুত রাখতে হয় -
- পূরণ করা আবেদন ফরম
- আগের শিক্ষাস্তরের সনদ ও নম্বরপত্র
- বৈধ পাসপোর্টের কপি
- ইংরেজি ভাষাদক্ষতার সনদ, যদি প্রয়োজন হয়
- ব্যক্তিগত বিবৃতি বা স্টেটমেন্ট অব পারপাস
- সুপারিশপত্র যদি চাওয়া হয়
- জীবনবৃত্তান্ত প্রযোজ্য ক্ষেত্রে
- গবেষণার প্রস্তাবনা বা লেখার নমুনা, গবেষণাভিত্তিক প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে
- আবেদন ফি পরিশোধের প্রমাণ, যদি প্রযোজ্য হয়
কিছু প্রোগ্রামে অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে। আবেদন জমা দেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় নথি যাচাই করে ভর্তির সিদ্ধান্ত জানায়। ভর্তির প্রস্তাব পাওয়ার পর শর্ত পূরণ ও প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ করে চূড়ান্ত ভর্তি নিশ্চিত করতে হতে পারে।
ভর্তির আবেদনের সময়
আয়ারল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাবর্ষ সাধারণত সেপ্টেম্বরের দিকে শুরু হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সভেদে ক্লাস, পরীক্ষা ও ছুটির সময়সূচিতে ভিন্নতা রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে দুটি সেমিস্টারে পড়াশোনা চলে। আবার কিছু স্নাতকোত্তর কোর্সে ট্রাইমেস্টার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
প্রথম সেমিস্টার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর): সাধারণত সেপ্টেম্বরে ক্লাস শুরু হয়। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্টোবরের শেষ দিকে এক সপ্তাহের বিরতি থাকে, যা ‘রিডিং উইক’ নামে পরিচিত। এ সময় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি ও পড়া পুনরালোচনা করেন। প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারিতে হতে পারে।
দ্বিতীয় সেমিস্টার (জানুয়ারি-মে): সাধারণত জানুয়ারিতে ক্লাস শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সভেদে মে মাসের দিকে ক্লাস ও পরীক্ষা শেষ হয়। এ সময় ইস্টার উপলক্ষে ছুটিও থাকে।
গ্রীষ্মকালীন সময় (মে-আগস্ট): কিছু স্নাতকোত্তর কোর্সে এ সময় থিসিস, গবেষণা বা প্রকল্পের কাজ চলে। তবে সব মাস্টার্স প্রোগ্রামের শিক্ষাসূচি এক নয়। তাই ভর্তির আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপঞ্জি দেখে নেওয়া উচিত।
শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনপদ্ধতি
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা আয়ারল্যান্ডে ৯০ দিনের বেশি সময়ের জন্য পড়তে গেলে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি টাইপ ডি ভিসার জন্য আবেদন করবেন। অনলাইনে আবেদন করতে হয় আয়ারল্যান্ডের সরকারি ভিসা আবেদনব্যবস্থা এভিএটিএসের মাধ্যমে।
অনলাইন আবেদন শেষ হলে নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনপত্র প্রিন্ট করে স্বাক্ষর করতে হয়। এরপর নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় নথি ও পাসপোর্ট জমা দিতে হবে। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য কোন আবেদনকেন্দ্র বা দূতাবাসের মাধ্যমে নথি জমা দিতে হবে, তা আবেদন করার সময় সরকারি নির্দেশনা থেকে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
সাধারণত যেসব নথি প্রয়োজন হতে পারে -
- সম্পূর্ণ পূরণ করা আবেদন ফরম
- সাম্প্রতিক ছবি
- আয়ারল্যান্ডে পৌঁছানোর তারিখের পর থেকে কমপক্ষে ১২ মাসের মেয়াদ থাকা পাসপোর্ট
- আগের পাসপোর্ট (যদি থাকে)
- আইরিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া ভর্তির অফার লেটার
- টিউশন ফি প্রদানের প্রমাণ। অভিবাসনের সময় টিউশন ফির ন্যূনতম পরিমাণটি দেখাতে হয়। তবে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ ফি দিতে হতে পারে
- আগের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও নম্বরপত্র
- ইংরেজি ভাষাদক্ষতার প্রমাণ
- স্টেটমেন্ট অব পারপাস
- আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ
- অন্য কেউ স্পনসর করলে তার সই করা চিঠি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
- ব্যক্তিগত চিকিৎসা বিমার প্রমাণ
- চাকরির অভিজ্ঞতার প্রমাণ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ
- সব নথি অবশ্যই আসল হতে হবে। কোনো নথি যদি বাংলা ভাষায় থাকে, তাহলে সেটিকে অবশ্যই ইংরেজিতে পূর্ণ অনুবাদ করে সরবরাহ করতে হবে।
সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সব নথি একইভাবে প্রযোজ্য নয়। ভিসার আবেদন করার আগে সরকারি নির্দেশনায় দেওয়া সর্বশেষ তালিকা মিলিয়ে নিতে হবে।
পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার খরচ
আয়ারল্যান্ডে পড়াশোনার খরচ নির্ভর করে বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। ‘এডুকেশন ইন আয়ারল্যান্ড’ এর ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ে ব্যবসায় শিক্ষায় বছরে টিউশন ফি ১০,৩০০ থেকে ২৯,০০০ ইউরো। প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এই ফি ১৪,৫০০ থেকে ২৮,৫০০ ইউরো। কলা ও মানবিক বিষয়ে ১৩,৫০০ থেকে ২৮,২০০ ইউরো। আর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে খরচ সবচেয়ে বেশি - বছরে ৫০,১৩৫ থেকে ৬২,৫০০ ইউরো।
অন্যদিকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ব্যবসায় শিক্ষায় বছরে ১৪,০০০ থেকে ৪০,০০০ ইউরো টিউশন ফি লাগতে পারে। প্রকৌশলে ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ১৫,০০০ থেকে ৩১,০০০ এবং কলা ও মানবিক বিষয়ে ১২,০০০ থেকে ২৩,০০০ ইউরো পর্যন্ত খরচ হতে পারে। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে এই ফি ১১,০০০ থেকে ৩০,০০০ ইউরো।
ভিসার ফি ও প্রক্রিয়াকরণের সময়
আয়ারল্যান্ডের ভিসার জন্য একবার প্রবেশের আবেদন ফি ৬০ ইউরো। একাধিকবার প্রবেশের ভিসার ক্ষেত্রে ফি ১০০ ইউরো। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট Ireland.ie অনুযায়ী, এর বাইরে আবেদনকেন্দ্রের সেবা বা নথি পাঠানোর জন্য অতিরিক্ত ফি লাগতে পারে।
ভিসার আবেদন যাচাই করে সিদ্ধান্ত দিতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে আবেদনকারীর সংখ্যা, নথিপত্র যাচাই ও অতিরিক্ত তথ্যের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে এ সময় বাড়তে পারে। তাই আয়ারল্যান্ডে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে ক্লাস শুরুর তারিখের বেশ আগেই ভিসার আবেদন করা উচিত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ অনুযায়ী, সম্ভাব্য ভ্রমণের তারিখের অন্তত ৮ থেকে ১২ সপ্তাহ আগে আবেদন করার প্রস্তুতি রাখা ভালো।
আয়ারল্যান্ডে বৃত্তির সুযোগ
টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত বৃত্তি রয়েছে। তবে বৃত্তির যোগ্যতা, অর্থের পরিমাণ ও আবেদনের সময়সীমা প্রতিবছর পরিবর্তিত হতে পারে।
গভর্নমেন্ট অব আয়ারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন স্কলারশিপ: ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য এই কর্মসূচিতে ৬০টি বৃত্তির সুযোগ ছিল। নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা এক বছরের জন্য ১০ হাজার ইউরো উপবৃত্তি পান। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ওই বছরের টিউশন ফি মওকুফ করে। এটি স্নাতকোত্তর পর্যায়ের - মাস্টার্স, স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা ও পিএইচডি পর্যায়ের নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের জন্য প্রযোজ্য।
ইরাসমাস মুন্ডাস জয়েন্ট মাস্টার্স: ইউরোপের একাধিক প্রতিষ্ঠানে যৌথ মাস্টার্স প্রোগ্রামে পড়ার জন্য যোগ্য শিক্ষার্থীরা বৃত্তির আবেদন করতে পারেন। নির্দিষ্ট বৃত্তির আওতায় টিউশন ফি, ভ্রমণ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের সহায়তা থাকতে পারে। তবে সব প্রোগ্রামে একই সুবিধা থাকে না।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নিজস্ব বৃত্তি ও টিউশন ফি ছাড় দিয়ে থাকে। আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি বিভাগে যোগ্যতা, আবেদনের সময়সীমা ও অর্থের পরিমাণ যাচাই করতে হবে।
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ
আয়ারল্যান্ডে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ রয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য। দেশটির অভিবাসন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ স্ট্যাম্প-২ অনুমতিপত্রধারী যোগ্য শিক্ষার্থীরা আলাদা কর্মানুমতি ছাড়াই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ করতে পারেন।
ক্লাস চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করা যায়। তবে নির্ধারিত ছুটির সময়ে এই সীমা বেড়ে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা হয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এ সুযোগ পাওয়া যায়। আয়ারল্যান্ডের ইমিগ্রেশন সার্ভিস ডেলিভারি’র নির্দেশনায় এ নিয়মের কথা বলে হয়েছে।
চাকরিতে যোগ দিতে ব্যক্তিগত সরকারি সেবা নম্বর বা পিপিএস নম্বরের প্রয়োজন হতে পারে। আয়ারল্যান্ডের ‘সামাজিক সুরক্ষা বিভাগ’ জানায়, এ নম্বর পেতে পরিচয়, ঠিকানা এবং আবেদনের কারণের প্রমাণ দিতে হয়। নিয়োগকর্তার কাছ থেকে এ নম্বর পাওয়া যায় না; সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হয়।
তবে খণ্ডকালীন কাজের আয়ের ওপর নির্ভর করে পড়াশোনার সব খরচ মেটানোর পরিকল্পনা করা ঠিক হবে না। কাজ পাওয়া, মজুরি এবং ক্লাসের সময়সূচি - সবকিছুই শিক্ষার্থীভেদে আলাদা হতে পারে। তাই আয়ারল্যান্ডে যাওয়ার আগে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
পড়াশোনা শেষে চাকরি ও কর্মানুমতি
আয়ারল্যান্ডে পড়াশোনা শেষে চাকরি খোঁজার সুযোগ রয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের। দেশটির স্বীকৃত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জনকারীরা থার্ড লেভেল গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের আওতায় স্ট্যাম্প-১জি পেতে পারেন। লেভেল-৮ ডিগ্রিধারীরা সাধারণত ১২ মাস এবং লেভেল-৯ বা তার বেশি যোগ্যতাধারীরা সর্বোচ্চ ২৪ মাস এ অনুমতির সুযোগ পান। তবে দ্বিতীয় বছরের অনুমতির জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়। এ সময়ে আলাদা কর্মানুমতি ছাড়াই পূর্ণকালীন চাকরি করা গেলেও নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা বা স্বনিযুক্ত হিসেবে কাজ করা যায় না।
স্ট্যাম্প-১জির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আয়ারল্যান্ডে কাজ করতে চাইলে সাধারণত উপযুক্ত চাকরি ও কর্মানুমতি প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে জেনারেল এমপ্লয়মেন্ট পারমিট এবং ক্রিটিক্যাল স্কিলস এমপ্লয়মেন্ট পারমিটের সুযোগ রয়েছে। প্রথমটি নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী বিভিন্ন পেশার কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য। আর দ্বিতীয়টি আয়ারল্যান্ডে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে - এমন নির্দিষ্ট পেশার উপযুক্ত প্রার্থীদের দেওয়া হয়। উভয় ক্ষেত্রেই চাকরির ধরন, বেতন, যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত বিবেচনা করা হয়।
২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে কার্যকর নিয়ম অনুযায়ী, জেনারেল এমপ্লয়মেন্ট পারমিটের সাধারণ ন্যূনতম বার্ষিক বেতনসীমা ৩৬,৬০৫ ইউরো। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী সাম্প্রতিক স্নাতকদের ক্ষেত্রে এ সীমা ৩৪,০০৯ ইউরো। অন্যদিকে, প্রাসঙ্গিক ডিগ্রিধারীদের জন্য ক্রিটিক্যাল স্কিলস এমপ্লয়মেন্ট পারমিটের সাধারণ ন্যূনতম বার্ষিক বেতনসীমা ৪০,৯০৯ ইউরো। পেশা ও যোগ্যতাভেদে বেতনসীমা আলাদা হতে পারে। তাই আবেদনের আগে আয়ারল্যান্ডের ‘এন্টারপ্রাইজ, পর্যটন ও কর্মসংস্থান বিভাগের’ হালনাগাদ নির্দেশনা দেখে নেওয়া উচিত।
কর্মানুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট সময় কাজ করার পর যোগ্য কর্মীরা স্ট্যাম্প-৪-এর জন্য আবেদন করতে পারেন। আয়ারল্যান্ডের অভিবাসন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, ক্রিটিক্যাল স্কিলস এমপ্লয়মেন্ট পারমিটের আওতায় ২১ মাস এবং জেনারেল এমপ্লয়মেন্ট পারমিটের আওতায় ৫৭ মাস কাজ করার পর এ অনুমতির জন্য আবেদন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্ট্যাম্প-৪ পেলে আলাদা কর্মানুমতি ছাড়াই কাজ করা যায়। তবে এসব অনুমতি পাওয়ার জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে; কোনোটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না।
নাগরিকত্ব পেতে নতুন প্রস্তাব
আয়ারল্যান্ডে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম কঠোর করার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির সরকার। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটির সংবাদমাধ্যম আরটিইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাগরিকত্বের আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় বসবাসের সময় পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবে ভাষাজ্ঞান যাচাই, দেশটির সমাজ ও নাগরিকজীবন সম্পর্কে ধারণা এবং আর্থিক স্বাবলম্বিতার শর্ত যুক্ত করার কথাও রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আবেদনকারীকে আবেদনের আগের দুই বছর একটানা আয়ারল্যান্ডে বসবাস করতে হতে পারে। এর আগে গত ১০ বছরের মধ্যে আরও ছয় বছরের গণনাযোগ্য বসবাসের প্রমাণও দিতে হতে পারে। অর্থাৎ, দেশটিতে আট বছর অবস্থান করলেই নাগরিকত্বের যোগ্যতা অর্জন করা যাবে - বিষয়টি এমন নয়; বসবাসের সময় গণনার নির্দিষ্ট শর্তও পূরণ করতে হবে।
ভাষাজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইংরেজি বা আইরিশ ভাষায় দক্ষতা প্রমাণের শর্ত যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে আবেদনকারীর ধারণা যাচাই করা হতে পারে। আর্থিক স্বাবলম্বিতার বিষয়টিও প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত। তবে এসব শর্ত কীভাবে যাচাই করা হবে, তা চূড়ান্ত আইন ও বিধিমালার ওপর নির্ভর করবে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে অভিবাসীদের সহায়তাকারী সংস্থা ডোরাস। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী জন ল্যাননের মতে, নাগরিকত্বের আবেদনপ্রক্রিয়া এমনিতেই দীর্ঘ ও জটিল। বসবাসের সময় বাড়ানো হলে আবেদনকারীদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হবে। ভাষা যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা হলে অভিবাসীদের জন্য ভাষা শেখার পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে এখনই কার্যকর আইন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন নিয়ম কার্যকরের জন্য আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলছিল। তাই নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে আয়ারল্যান্ডের অভিবাসন বিভাগের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
আয়ারল্যান্ডে পড়তে যেতে আগ্রহীদের জন্য আরেকটি বিষয় জানা জরুরি। দেশটির অভিবাসন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের স্ট্যাম্প-২ অনুমতিতে কাটানো সময় সাধারণত নাগরিকত্বের আবেদনের জন্য গণনাযোগ্য বসবাসের সময় হিসেবে বিবেচিত হয় না। ফলে পড়াশোনার জন্য কয়েক বছর আয়ারল্যান্ডে থাকলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
শেষ কথা
আয়ারল্যান্ডে পড়াশোনা, কাজ কিংবা দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের পরিকল্পনা - যেটিই হোক, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজন সঠিক তথ্য ও বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও টিউশন ফি থেকে শুরু করে ভিসা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ - প্রতিটি বিষয়ই বিবেচনায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে খণ্ডকালীন কাজের আয় দিয়ে সব খরচ মেটানো যাবে, এমন ধারণা নিয়ে যাত্রা করা ঠিক নয়। একইসঙ্গে অভিবাসন ও নাগরিকত্বের নিয়মেও পরিবর্তন আসতে পারে। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আয়ারল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এবং নিজের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী পরিকল্পনা করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।



