ইউরোপে উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখেন -এমন শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের কাছে নেদারল্যান্ডস এখন অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণায় বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ, উচ্চ জীবনমান এবং দক্ষ কর্মীদের জন্য তুলনামূলক সহজ অভিবাসন নীতির কারণে প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী দেশটিতে পাড়ি জমান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য নেদারল্যান্ডস অর্থনীতি, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম দেশ। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান অর্জন করে। একইসঙ্গে পড়াশোনা শেষে চাকরি খোঁজার জন্য বিশেষ আবাসিক অনুমতি এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের সুযোগ থাকায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহও বাড়ছে।
তবে নেদারল্যান্ডসে পড়াশোনা বা ভবিষ্যতে সেখানে বসবাসের পরিকল্পনা থাকলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই হবে না। আবেদন প্রক্রিয়া, ভাষাগত যোগ্যতা, শিক্ষার্থী ভিসা, আর্থিক প্রস্তুতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পড়াশোনা শেষে ক্যারিয়ারের সুযোগ সম্পর্কে আগে থেকেই পূর্ণ ধারণা থাকা জরুরি।
দেশটির সুবিধাগুলো হলো -
- আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়
- দুই হাজারেরও বেশি ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত ডিগ্রি প্রোগ্রাম
- উন্নত গবেষণার সুযোগ
- পড়াশোনা শেষে চাকরি খোঁজার জন্য বিশেষ আবাসিক অনুমতি
- দক্ষ কর্মীদের জন্য কর্মভিত্তিক আবাসিক অনুমতির সুযোগ
- নিরাপদ ও উন্নত জীবনমান
উচ্চশিক্ষায় কেন এগিয়ে
নেদারল্যান্ডসের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গবেষণানির্ভর, উদ্ভাবনকেন্দ্রিক এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীবান্ধব। বর্তমানে দেশটিতে ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও গবেষণাভিত্তিক প্রোগ্রাম রয়েছে। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসায় প্রশাসন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি, পরিবেশ, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক আইনের মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়।
নেদারল্যান্ডসের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে নেদারল্যান্ডসের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত শীর্ষ অবস্থানে থাকে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-
- Delft University of Technology (TU Delft)
- University of Amsterdam
- Utrecht University
- Eindhoven University of Technology
- Wageningen University & Research
- Leiden University
- Erasmus University Rotterdam
- University of Groningen
- Vrije Universiteit Amsterdam
- Radboud University
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ করে TU Delft, University of Amsterdam, Erasmus University Rotterdam এবং Wageningen University & Research বেশ জনপ্রিয়।
ভর্তির যোগ্যতা
ব্যাচেলর প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য সাধারণত উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের যোগ্যতা থাকতে হয়। আর মাস্টার্স প্রোগ্রামে আবেদনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন।
ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার জন্য সাধারণত আইইএলটিএস বা টোফেল-এর মতো ইংরেজি ভাষা দক্ষতার সনদ জমা দিতে হয়। প্রয়োজনীয় স্কোর বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে ভিন্ন হলেও অনেক ক্ষেত্রে আইইএলটিএসে ৬.০-৭.০ বা সমমানের স্কোর গ্রহণ করা হয়।
কিছু প্রোগ্রামে জিআরই বা জিম্যাট স্কোরও প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া নির্দিষ্ট বিষয়ে পূর্ববর্তী একাডেমিক যোগ্যতা, ন্যূনতম সিজিপিএ বা অন্যান্য অতিরিক্ত শর্তও থাকতে পারে।ডাচ ভাষায় পরিচালিত প্রোগ্রামগুলোর ক্ষেত্রে ডাচ ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়।
কখন আবেদন করবেন?
অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল ভর্তি সেশন সেপ্টেম্বরে শুরু হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্দিষ্ট প্রোগ্রামে ফেব্রুয়ারি ইনটেকও রয়েছে। সাধারণত ভর্তি শুরুর কয়েক মাস আগে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। তাই কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আবেদন জমার শেষ সময় দেখে আগেভাগেই আবেদন করা উচিত।
আবেদন করতে যা লাগবে
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত যেসব নথি লাগে - শিক্ষাগত সনদ ও নম্বরপত্র, বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজন অনুযায়ী আইইএলটিএস/টোফেল এবং কিছু ক্ষেত্রে জিআরই বা জিম্যাট স্কোর, স্টেটমেন্ট অব পারপাস, জীবনবৃত্তান্ত, সুপারিশপত্র, পাসপোর্ট সাইজ ছবি, গবেষণাভিত্তিক প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে গবেষণা প্রস্তাব বা থিসিসের সারসংক্ষেপ
টিউশন ফি
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয় ও প্রোগ্রামভেদে ভিন্ন হয়। সাধারণভাবে বছরে প্রায় ৮,০০০-২০,০০০ ইউরো পর্যন্ত টিউশন ফি হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, এমবিএ বা বিশেষায়িত কিছু প্রোগ্রামে ব্যয় আরও বেশি হতে পারে।
আর্থিক প্রস্তুতি
নেদারল্যান্ডসে শিক্ষার্থী ভিসা ও আবাসিক অনুমতির জন্য আবেদন করতে হলে জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এক বছরের আনুমানিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ তাদের নির্ধারিত হিসাবে জমা দিতে বলে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা স্পনসরের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণও গ্রহণ করা হয়।
এই অর্থের পরিমাণ প্রতিবছর নেদারল্যান্ডসের অভিবাসন ও নাগরিকত্ব কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে প্রক্রিয়ায় কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়া হলে, সাধারণত শিক্ষার্থী নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানোর পর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ওই অর্থ নিজের ব্যাংক হিসাবে ফেরত পান বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য ব্যবহার করতে পারেন।
শিক্ষার্থী ভিসা
নেদারল্যান্ডসে পড়াশোনা করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর শিক্ষার্থী ভিসা এবং আবাসিক অনুমতির জন্য আবেদন করতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষার্থীর পক্ষে নেদারল্যান্ডসের অভিবাসন ও নাগরিকত্ব কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
সাধারণত আবেদনের জন্য বৈধ পাসপোর্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিমার তথ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়।
খণ্ডকালীন চাকরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়
নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করার সুযোগ পান। সাধারণত শিক্ষাবর্ষ চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৬ ঘণ্টা এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে পূর্ণকালীন কাজ করা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাকে শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় কর্ম-অনুমতি সংগ্রহ করতে হয়।
খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকলেও শুধু এই আয়ের ওপর নির্ভর করে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার পুরো ব্যয় বহন করা সহজ নয়। রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, সুপারশপ, গুদাম, পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ এবং গবেষণা প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা বা বিশেষ দক্ষতা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্টুডেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেও কাজের সুযোগ মিলতে পারে।
নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো আবাসন। বিশেষ করে আমস্টারডাম, রটারডাম, ইউট্রেখট ও আইনডহোভেনের মতো শহরে বাসা পাওয়া তুলনামূলক কঠিন এবং ভাড়াও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সুবিধা পাওয়া গেলে খরচ কিছুটা কমে, তবে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় আগেভাগেই আবেদন করা উচিত।
শহর, জীবনযাত্রার ধরন এবং আবাসনের ওপর নির্ভর করে একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর মাসিক খরচ গড়ে ১,২০০ থেকে ১,৮০০ ইউরো হতে পারে। এর মধ্যে বাসাভাড়া, খাবার, স্বাস্থ্যবিমা, যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যয় অন্তর্ভুক্ত। শেয়ার করা বাসায় থাকলে কিছুটা খরচ কমানো সম্ভব।
বৃত্তির সুযোগ
নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বৃত্তির সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে NL Scholarship, Erasmus Mundus Scholarship এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মেধাভিত্তিক বৃত্তি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফের সুবিধাও দিয়ে থাকে।
তবে বৃত্তির যোগ্যতা, আবেদন প্রক্রিয়া এবং সময়সীমা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে ভিন্ন হয়। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ তথ্য দেখে নেওয়া উচিত।
পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগ
নেদারল্যান্ডসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অন্যতম বড় সুবিধা হলো পড়াশোনা শেষ করার পর দেশটিতে থেকে চাকরি খোঁজার সুযোগ। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ওরিয়েন্টেশন ইয়ার (Orientation Year বা Zoekjaar) নামে পরিচিত এক বছরের বিশেষ আবাসিক অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারেন।
এই অনুমতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এক বছর নেদারল্যান্ডসে বৈধভাবে থেকে চাকরি খুঁজতে, পূর্ণকালীন কাজ করতে অথবা ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পান। এ সময় আলাদা ওয়ার্ক পারমিটের প্রয়োজন হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন, ইন্টারভিউ এবং কর্মজীবন শুরু করার পর্যাপ্ত সময় পান।
তবে ওরিয়েন্টেশন ইয়ারের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আবেদন করতে হয়। এ অনুমতি একবারই দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়।
কোন কোন খাতে চাকরির চাহিদা বেশি?
ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ নেদারল্যান্ডসে বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক পেশাগুলোতে আন্তর্জাতিক কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
বর্তমানে যেসব খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা তুলনামূলক বেশি- তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, প্রকৌশল (যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক, সিভিল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল), স্বাস্থ্যসেবা (চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও মেডিকেল গবেষক), কৃষি ও ফুড টেকনোলজি, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফিন্যান্স ও অ্যাকাউন্টিং, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রভৃতি।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজি ভাষায় কাজ করা সম্ভব হলেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ বাড়াতে ডাচ ভাষা শেখা বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ওয়ার্ক পারমিট ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসী
ওরিয়েন্টেশন ইয়ার চলাকালে উপযুক্ত চাকরি পেলে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে কর্মভিত্তিক আবাসিক অনুমতির জন্য আবেদন করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী/অভিবাসন কর্মসূচি।
এ কর্মসূচির আওতায় আবেদন করতে হলে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানকে নেদারল্যান্ডসের অভিবাসন ও নাগরিকত্ব কর্তৃপক্ষের স্বীকৃত স্পনসর হতে হয়। পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম বেতন এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়।
চাকরি নিশ্চিত হওয়ার পর সাধারণত নিয়োগকর্তাই কর্মীর পক্ষে প্রয়োজনীয় আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। আবেদন অনুমোদিত হলে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কর্মভিত্তিক আবাসিক অনুমতি দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে নবায়ন করা যায়।
পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ
নেদারল্যান্ডসে বৈধ কর্মভিত্তিক আবাসিক অনুমতি পাওয়ার পর নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে এক্ষেত্রে আবেদনকারীকে পর্যাপ্ত আয়, উপযুক্ত আবাসন এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়।
পরিবারের সদস্যরা নেদারল্যান্ডসে বসবাস, শিক্ষা গ্রহণ এবং অনেক ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পান। সন্তানরা স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও পায়।
স্থায়ী বসবাস
নেদারল্যান্ডসে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস করতে চাইলে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার জন্য আবেদন করা যায়।
সাধারণভাবে টানা পাঁচ বছর বৈধভাবে নেদারল্যান্ডসে বসবাসের পর এ আবেদন করা সম্ভব। তবে শুধু পাঁচ বছর পূর্ণ হলেই অনুমতি পাওয়া যায় না। আবেদনকারীকে বৈধ আবাসিক মর্যাদা বজায় রাখা, পর্যাপ্ত আয়ের প্রমাণ, সিভিক ইন্টিগ্রেশন(নাগরিক সংযুক্তি)-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ এবং অন্যান্য আইনি যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।
আবেদন অনুমোদিত হলে নির্দিষ্ট মেয়াদে নবায়নের ঝামেলা ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদে নেদারল্যান্ডসে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়।
ডাচ নাগরিকত্ব
স্থায়ীভাবে নেদারল্যান্ডসে বসবাসের পর নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে ডাচ নাগরিকত্বের জন্যও আবেদন করা যায়।
সাধারণভাবে পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর আবেদন করার সুযোগ থাকলেও আবেদনকারীকে ডাচ ভাষায় নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন, সিভিক ইন্টিগ্রেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং অন্যান্য আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়।
তবে নাগরিকত্বের নীতিমালা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে নেদারল্যান্ডসের অভিবাসন ও নাগরিকত্ব কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া উচিত।
নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানোর পর যা করবেন
- স্থানীয় পৌরসভায় গিয়ে ঠিকানা নিবন্ধন করুন।
- BSN (Burger Service Number) বা ব্যক্তিগত নাগরিক সেবা নম্বর সংগ্রহ করুন। নেদারল্যান্ডসে চাকরি, কর (ট্যাক্স) পরিশোধ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য এই নম্বর প্রয়োজন হয়।
- DigiD অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। এটি সরকারি বিভিন্ন অনলাইন সেবায় লগইন ও আবেদন করার জন্য ব্যবহৃত একটি ডিজিটাল পরিচয়।
- ডাচ ব্যাংকে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলুন। বেতন গ্রহণ, বিল পরিশোধ ও দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের জন্য এটি প্রয়োজন।
- প্রয়োজন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমা করুন। নেদারল্যান্ডসে কাজ শুরু করলে সাধারণত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্যবিমা করা বাধ্যতামূলক।
- স্থানীয় চিকিৎসক (General Practitioner বা GP)-এর কাছে নিবন্ধন করুন। অসুস্থ হলে বা সাধারণ চিকিৎসাসেবা পেতে প্রথমে জিপির কাছেই যেতে হয়; প্রয়োজনে তিনিই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠান।
নেদারল্যান্ডসে বসবাসের সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
উন্নত শিক্ষা, আধুনিক অবকাঠামো, উচ্চ জীবনমান, নিরাপদ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের কারণে নেদারল্যান্ডস বিদেশি শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় গন্তব্য। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সহজে ভ্রমণের সুযোগও দেশটির অন্যতম আকর্ষণ।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে বাসা সংকট, তুলনামূলক উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, প্রতিযোগিতাপূর্ণ চাকরির বাজার এবং অনেক ক্ষেত্রে ডাচ ভাষার প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিকদের জন্য শুরুতে কিছুটা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে যথাযথ পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং আগেভাগে প্রস্তুতি নিলে নেদারল্যান্ডসে উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার ও স্থায়ী বসবাসের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।



