Thursday, September 17, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অভিবাসন গাইড

অস্ট্রেলিয়ার ভিসায় নতুন নিয়ম: পড়াশোনা, কাজ ও ভ্রমণে আসছে যেসব পরিবর্তন

অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা, কাজ ও ভ্রমণের ভিসায় নতুন বিধিনিষেধ আনছে সরকার। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবার সঙ্গে নেওয়া, ভিসা নবায়ন, ওয়ার্কিং হলিডে ও ভিজিটর ভিসায় পরিবর্তনের পরিকল্পনা জানানো হয়েছে 

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম

অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা, কাজ নাকি ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে শুধু কোন ভিসায় আবেদন করবেন তা জানলেই হবে না। একইসঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ, কাজের অনুমতি, ভিসা নবায়ন কিংবা এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় পরিবর্তনের নিয়মগুলো সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। কারণ অস্ট্রেলিয়া সরকার অভিবাসন কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন অস্থায়ী ভিসার নিয়মেও আনছে নানা পরিবর্তন।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সঙ্গী ও সন্তানদের সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ওয়ার্কিং হলিডে ও ভিজিটর ভিসার ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলেছে সরকার।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এসব পরিবর্তনের ঘোষণা দেন অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার প্রধান পথ কোনগুলো?

অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পথ সবার জন্য এক নয়। কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য স্টুডেন্ট ভিসায় যান, কেউ চাকরি বা দক্ষতার ভিত্তিতে অভিবাসনের চেষ্টা করেন। আবার ফ্যামিলি ভিসা, ভিজিটর ভিসা কিংবা ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় যাওয়ার সুযোগও রয়েছে।

স্টুডেন্ট ভিসায় কী পরিবর্তন আসছে?

অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আসছে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার জন্য যাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীরা আর তাদের সঙ্গী ও সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন না। 

তবে নিয়মটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কিছু দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গী ও সন্তানদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যেতে পারবেন। অধিকাংশ স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় আবেদনকারী হিসেবে সঙ্গী বা সন্তানকে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে না।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বামী-স্ত্রী ও সঙ্গীরা অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করতে পারেন। তবে শিক্ষার্থীর পড়াশোনার কোর্স অনুযায়ী তাদের কাজের সময়সীমা ভিন্ন হয়ে থাকে।

ভিসা নবায়নেও আসছে পরিবর্তন

স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে ভিসা নবায়নের নিয়মে।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কেবল উচ্চতর কোনো কোর্সে ভর্তি হলেই স্টুডেন্ট ভিসা নবায়ন করতে পারবেন। ফলে একই সমপর্যায়ের কোর্সে থেকে বারবার ভিসা বাড়ানোর সুযোগ আর থাকছে না।

তাই অস্ট্রেলিয়ায় পড়ার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য কোর্স নির্বাচন এখন আর কেবল পড়াশোনার বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের ভিসা প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ

অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সেমিস্টার চলাকালে প্রতি পাক্ষিকে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। বৈধভাবে কাজের জন্য ট্যাক্স ফাইল নম্বর (টিএফএন) নেওয়া বাধ্যতামূলক। সিডনি, মেলবোর্ন বা পার্থের মতো বড় শহরে কাজের ধরন ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে পারিশ্রমিক তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

পড়াশোনা শেষে কোন ভিসায় আবেদন করা যাবে, তা সংশ্লিষ্ট ভিসার যোগ্যতা ও শর্তের ওপর নির্ভর করবে। তাই অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগেই পড়াশোনা শেষে সম্ভাব্য ভিসার পথ এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি। 

ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় আসছে লটারি

অভিবাসন কমাতে অস্ট্রেলিয়া সরকার শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, কম খরচে ভ্রমণ ও কাজের উদ্দেশ্যে আসা ‘ব্যাকপ্যাকার’দের ভিসার নিয়মেও কড়াকড়ি আনছে।  দেশটিতে থাকা ব্যাকপ্যাকারদের ওয়ার্কিং হলিডে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদের ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন ধরনের বাছাই ব্যবস্থা যুক্ত করা হবে।

ভিজিটর ভিসাতেও কড়াকড়ি

ভ্রমণের জন্য যারা অস্ট্রেলিয়ায় যেতে চান, তাদের জন্যও আসছে নতুন বিধিনিষেধ। সরকার সব ভিজিটর ভিসায় ‘নো ফারদার স্টে’ শর্ত যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। এর অর্থ হলো, ভিজিটর ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত ব্যক্তি দেশটিতে থেকেই পার্টনার ভিসাসহ অন্য কোনো ধরনের ভিসার আবেদন করে সেখানে থাকার সুযোগ পাবেন না।

অর্থাৎ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া এবং পরে অন্য ধরনের ভিসায় থেকে যাওয়ার পথ আরও সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

‘ভিসা হপিং’ বন্ধেও নজরদারি

‘ভিসা হপিং’ হলো একটি অস্থায়ী ভিসার মেয়াদ শেষে দেশে না ফিরে বারবার নতুন ভিন্ন কোনো ভিসায় (যেমন: ট্যুরিস্ট ভিসা থেকে স্টুডেন্ট ভিসা, কিংবা এক স্টুডেন্ট ভিসা থেকে অন্য নিম্নমানের কোর্সে) আবেদন করে অবস্থান দীর্ঘায়িত করার প্রবণতা।

অস্ট্রেলিয়া সরকার অতিরিক্ত অভিবাসন কমানো ও ভিসানীতির অনিয়ম রুখতে এই ‘ভিসা হপিং’ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কিছু নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে:

ভিজিটর ও ওয়ার্ক ভিসাধারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা: ভিজিটর ভিসা (Subclass 600) কিংবা টেম্পোরারি গ্র্যাজুয়েট ভিসা (Subclass 485) নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা অবস্থায় সরাসরি নতুন স্টুডেন্ট ভিসায় (Subclass 500) আবেদনের সুযোগ আর থাকছে না। স্টুডেন্ট ভিসায় আবেদন করতে হলে আবেদনকারীকে বাধ্যতামূলকভাবে দেশ ত্যাগ করে নিজ দেশ থেকে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

অফ-শোর আবেদনের বাড়তি ঝুঁকি: অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে আবার নতুন স্টুডেন্ট ভিসায় আবেদন করলেও মিলবে না সহজে পার পাওয়ার সুযোগ। ইমিগ্রেশন বিভাগ 'জেনুইন স্টুডেন্ট' (GS) টেস্টের মাধ্যমে আবেদনটি যাচাই-বাছাই করবে। মূলত অবস্থান দীর্ঘায়িত করতেই এই আবেদন - এমন সংশয় দেখা দিলে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকবে।

কেন এত পরিবর্তন?

এর পেছনে বড় বিষয় হলো অস্ট্রেলিয়ায় নিট অভিবাসন বেড়ে যাওয়া। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন সংস্কারগুলো কার্যকর হলে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশটিতে বছরে নিট অভিবাসন কমে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজারে নামতে পারে। মহামারির আগে সংখ্যাটি প্রায় একই পর্যায়ে ছিল। বর্তমানে বছরে নিট অভিবাসন প্রায় ৩ লাখ।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় দুই বছর পর অস্ট্রেলিয়া সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর দেশটিতে অভিবাসন ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এই বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, ব্যাকপ্যাকার ও অস্থায়ী কর্মীদের বড় ভূমিকা ছিল। তবে গত দুই বছরে সেই সংখ্যা কমছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরে অস্ট্রেলিয়ায় নিট বিদেশি অভিবাসন ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিলেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে নিট বিদেশি অভিবাসন সর্বোচ্চ ৫ লাখ ১৮ হাজারে পৌঁছেছিল।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার গুরুত্ব 

অভিবাসন কমানোর উদ্যোগ সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষা অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে এই খাত থেকে দেশটির অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে ৫৩.৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। জাতীয় রপ্তানি আয়ের দিক থেকে এটি দেশটির চতুর্থ বৃহত্তম খাত। ফলে শিক্ষার্থী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এই খাতের অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনায় রাখা সরকারের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ।

আগে থেকেই কড়াকড়ির মুখে স্টুডেন্ট ভিসা

সম্প্রতি ঘোষিত নিয়মগুলো ছাড়াও বিগত চার বছরে স্টুডেন্ট ভিসার শর্তাবলি ধারাবাহিকভাবে কঠোর করা হয়েছে।

  • ফি বৃদ্ধি: আবেদন ফি প্রায় ৩০০% বাড়িয়ে ২,৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার করা হয়েছে।
  • অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা: ইংরেজি ভাষার প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গ্র্যাজুয়েট ভিসার জন্য ন্যূনতম জমার শর্ত কঠিন করা হয়েছে।
  • আর্থিক প্রস্তুতি: নতুন এই শর্তাবলির কারণে শিক্ষার্থীদের এখন উচ্চতর আর্থিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতি নিয়েই আবেদনের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি 

অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা, চাকরি, দক্ষ অভিবাসন বা পরিবারের সঙ্গে যেতে চাইলে আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট ভিসার শর্ত ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি। এছাড়া যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া উচিত -

  • পড়াশোনার পরিকল্পনা থাকলে কোর্সের ধরন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা, মোট খরচ, কাজের সুযোগ এবং পড়াশোনা শেষে সম্ভাব্য ভিসার পথ সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে নিতে হবে। পরিবারের সদস্য সঙ্গে নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়মও যাচাই করা জরুরি।
  • চাকরির উদ্দেশ্যে গেলে সংশ্লিষ্ট পেশা, কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, স্পনসরশিপের শর্ত এবং যে ভিসায় আবেদন করা হবে তার নিয়ম সম্পর্কে আগে ধারণা নিতে হবে।
  • দক্ষ অভিবাসনের ক্ষেত্রে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ও দক্ষতা মূল্যায়নের পাশাপাশি পয়েন্টভিত্তিক ব্যবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের নিয়ম এখন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ভিসার নিয়ম ও শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট ভিসার সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা দেখে যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় নথি, খরচ ও অন্যান্য শর্ত নিশ্চিত করা উচিত।

   

About

Popular Links

x