উন্নত জীবনযাপন, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় ইউরোপের দেশগুলোর প্রতি মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সেই তালিকায় ফ্রান্সও রয়েছে সামনের সারিতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী, দক্ষ পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও কর্মজীবীদের জন্য দেশটিতে রয়েছে নানা ধরনের সুযোগ। বাংলাদেশের অনেকে প্রতিবছর পড়াশোনা, চাকরি কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে পাড়ি জমান এই দেশটিতে।
তবে ফ্রান্সে যাওয়ার পথ সবার জন্য এক নয়। কেউ উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে শুরু করছেন নতুন অধ্যায়, আবার কেউ চাকরি, ব্যবসা কিংবা পরিবারের সঙ্গে বসবাসের জন্য বেছে নিচ্ছেন দেশটিকে। তবে কোন পথে ফ্রান্সে যাওয়ার সুযোগ বেশি, আবেদন করতে কী প্রয়োজন, কত খরচ হতে পারে এবং সেখানে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে থাকার সুযোগই বা কতটা - ফ্রান্সে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসব বিষয় জানা জরুরি।
ফ্রান্সে যেসব ভিসায় যাওয়া যায়
ফ্রান্সে যাওয়ার ভিসা মূলত দুই ধরনের - স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। দেশটির সরকারি ভিসা পোর্টাল ফ্রান্স-ভিসা’র তথ্যমতে, ৯০ দিনের বেশি সময় ফ্রান্সে থাকতে হলে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ভিসা নিতে হয়। আর ফ্রান্সে যাওয়ার উদ্দেশ্য ও অবস্থানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ভিসার ধরন নির্ভর করে।
স্বল্পমেয়াদি ভিসার মধ্যে রয়েছে পর্যটন, ব্যবসায়িক ও ভিজিট ভিসা। আর দীর্ঘমেয়াদি ভিসার মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থী, কাজের, পাসপোর্ট ত্যালঁ বিশেষ দক্ষতাভিত্তিক ভিসা ও ফ্যামিলি রিইউনিয়ন ভিসা।
ফ্রান্সে অভিবাসনের নানা পথ থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা হতে পারে স্থায়ী ক্যারিয়ার গড়ার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী খরচ আর পড়াশোনাকালীন কাজের সুবিধার পাশাপাশি স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষে ফরাসি শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে এখানে। ফলে কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং ফ্রান্সে দীর্ঘমেয়াদে থাকা এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের (পিআর) শক্ত ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষাকেই বেছে নিচ্ছেন সিংহভাগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী।
ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ৯৯% শিক্ষার হার নিয়ে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে ইউরোপের অন্যতম শৈল্পিক দেশ ফ্রান্স। বিশ্বের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীদের মতো বাংলাদেশের মেধাবীদেরও প্রতিবছর স্বাগত জানাচ্ছে দেশটি। পড়াশোনার জন্য ফ্রান্সে যেতে চাইলে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের পদ্ধতি, খরচসহ প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো প্রথমে জেনে নেওয়া যাক –
ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার যোগ্যতা
ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রয়োজনীয়তা মূলত শিক্ষার স্তর, নির্ধারিত বিষয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা: স্নাতক পর্যায়ে আবেদনের জন্য সাধারণত উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষা শেষ করতে হয়। স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্সে ভর্তির জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি। আর পিএইচডির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একাডেমিক প্রস্তুতি আবশ্যক। তবে প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ভেদে এসব শর্তে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে।
এমবিএ প্রোগ্রাম: এমবিএতে ভর্তির শর্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাক্রমভেদে আলাদা। ফ্রান্সের বিজনেস স্কুলগুলোতে সাধারণত পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানে জিআরই বা জিম্যাটের ফল চাওয়া হতে পারে। তাই আবেদনের আগেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শর্ত জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার গুরুত্ব: ফ্রান্সে ইংরেজি মাধ্যমেও উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। ‘ক্যাম্পাস ফ্রান্স’এর তথ্যমতে, ১,৬০০টির বেশি শিক্ষাক্রম ইংরেজিতে পরিচালিত হয়, যেখানে ফরাসি জানা বাধ্যতামূলক নয়; শুধু ইংরেজি দক্ষতার সনদ (আইইএলটিএস/টোফেল) দেখালেই চলে। তবে ফরাসি মাধ্যমের ক্ষেত্রে সাধারণত বি১ বা বি২ স্তরের দক্ষতা প্রয়োজন হয়, যা প্রমাণের জন্য ডেলফ, ডালফ, টিসিএফ বা টিইএফের মতো স্বীকৃত সনদ লাগে।
পড়াশোনা যে মাধ্যমেই হোক না কেন, ফরাসি ভাষায় দখল থাকলে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং পড়াশোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে কাজের সুযোগ পাওয়া সহজ হয়।
ফ্রান্সের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়
PSL University, Paris-Saclay University, Sorbonne University, Institut Polytechnique de Paris, Paris Cité University, Grenoble Alpes University, University of Strasbourg, Aix-Marseille University
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয়গুলো হচ্ছে পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায় প্রশাসন, অর্থায়ন, কৃষিবিদ্যা, জীববিদ্যা, কলা, সংস্কৃতি, নকশা ও ফ্যাশন।
ফ্রান্সে পড়াশোনার খরচ
ফ্রান্সের সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার খরচের সিংহভাগই বহন করে দেশটির সরকার। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ নিবন্ধন ফি প্রযোজ্য। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের তথ্যমতে, নন-ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক পর্যায়ে বার্ষিক ফি ২,৯০২ ইউরো এবং স্নাতকোত্তরে ৩,৯৫০ ইউরো। অবশ্য ডক্টরাল (পিএইচডি) পর্যায়ে এই বাড়তি ফি দিতে হয় না; সেখানে বার্ষিক ফি মাত্র ৩৯৮ ইউরো।
তবে সব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে একই হারে ফি দিতে হয় না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ডক্টরাল শিক্ষার্থী, নির্দিষ্ট চিকিৎসা-ফার্মেসির উচ্চতর স্তরের শিক্ষার্থী এবং গ্রঁদ একোলের (Grandes Écoles) প্রস্তুতিমূলক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা ফরাসি শিক্ষার্থীদের সমপরিমাণ ফি দেওয়ার সুযোগ পান। এছাড়া বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষার্থী ফি মওকুফের সুবিধাও পেয়ে থাকেন।
সাধারণভাবে ফরাসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের জন্য ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বার্ষিক ফি স্নাতকে ১৭৮ ইউরো, স্নাতকোত্তরে ২৫৫ ইউরো এবং প্রকৌশলে ৬৩০ ইউরো। তবে কিছু বিশেষায়িত প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে ফি আলাদা হতে পারে।
অন্যদের তুলনায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ার খরচ বেশি। বিশেষ করে বিজনেস ও ম্যানেজমেন্ট স্কুলগুলোতে প্রতিষ্ঠানভেদে বার্ষিক ফি ৩,০০০ থেকে ১০,০০০ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।
জরুরি তথ্য: ফি পরিশোধের পদ্ধতি কিংবা অগ্রিম অর্থ দেওয়ার নিয়মটি সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। তাই ভর্তির আবেদন ও অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিকাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
আবেদনের প্রক্রিয়া ও সময়সূচি
আবেদনের মাধ্যম
স্নাতকের প্রথম বর্ষে ভর্তির জন্য প্রাক-আবেদন হিসেবে ‘ডিমান্ড দাদমিশিওঁ প্রিয়েলাব্ল’ (DAP) প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এর জন্য ‘এত্যুদ অঁ ফ্রঁস’ (Études en France) প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করতে হয়, যা বাংলাদেশিদের জন্য প্রযোজ্য। স্নাতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ এবং স্নাতকোত্তরে (মাস্টার্স) আবেদনের ক্ষেত্রেও এই পোর্টাল ব্যবহার করতে হয়। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান এই অনলাইন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত না থাকলে সরাসরি তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হয়।
অন্যদিকে, ডক্টরাল (পিএইচডি) পর্যায়ে ‘এত্যুদ অঁ ফ্রঁস’ প্রক্রিয়া প্রযোজ্য নয়; এ ক্ষেত্রে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ডক্টরাল স্কুল বা গবেষণাগারে আবেদন করতে হয়। এছাড়া শিল্প, নকশা, ফ্যাশন ও স্থাপত্যের মতো বিশেষায়িত বিষয়গুলোর জন্য ‘ক্যাম্পাস আর্ট’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আবেদনের সুযোগ রয়েছে।
আবেদনের সময়সূচি
ডিএপি প্রক্রিয়ার আবেদন প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়। যেমন: ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ডিএপি আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল ১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর শেষ সময় ছিল ৩০ এপ্রিল ২০২৬ এবং আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার সময় ছিল ৩১ মে ২০২৬। পরবর্তী শিক্ষাবর্ষগুলোর সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ‘ক্যাম্পাস ফ্রান্স’-এর অফিশিয়াল মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
ফ্রান্সের স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিবাচক ফলাফল লাভের পর সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন। এ সময় যে কাগজপত্র দরকার, তা হলো-
- সম্পূর্ণরূপে পূরণ করা ভিসা আবেদন
- পাসপোর্ট কপি
- সাদা পটভূমিতে তোলা ২×২ ইঞ্চি সাইজের ছবি
- পূর্ববর্তী সব একাডেমিক সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও মার্কশিট
- ফরাসি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ভর্তির অফার লেটার। এখানে অধ্যয়নের প্রোগ্রাম, অধ্যয়নের শুরু ও শেষ তারিখ উল্লেখপূর্বক বিশদ বিবরণ থাকবে।
- ফ্রান্সে থাকার অর্থের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সংস্থানের প্রমাণ। ফ্রান্সের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী এই ব্যয় প্রতি মাসে ৬১৫ ইউরো বা ৭৮ হাজার ৪৪৩ টাকার সমতূল্য। এটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট, গ্যারান্টারের চিঠি, বৃত্তি বা অনুদান থেকে অর্থায়নের স্বীকৃতির একটি শংসাপত্রের সঙ্গে দেখাতে হবে।
- চিকিৎসা বীমার প্রমাণ (সর্বনিম্ন ৩০ হাজার ইউরো বা ৩৮ লাখ ২৬ হাজার ৪৪৮ টাকা)
- বাসস্থানের প্রমাণ। এটি হতে পারে স্টুডেন্ট হাউজিং কনফার্মেশন, বোর্ড ও লজিংয়ের সার্টিফিকেট অথবা বন্ধু বা আত্মীয়দের সাথে থাকলে তার একটি প্রত্যয়ন পত্র
- ভাষা দক্ষতার সনদ (ফরাসি কোর্স হলে ফরাসি ভাষার সনদ, অন্যথায় টিওইএফএল বা আইইএলটিএসের নথিপত্র)
- এখানে পাসপোর্ট ও ছবি ছাড়া প্রতিটি নথির সঙ্গে মূল কপি দিতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষার্থী ভিসা ব্যতীত অন্য যেকোনো ভিসা (যেমন: সাধারণ জব ভিসা, ব্যবসা বা পারিবারিক ভিসা)-এর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে। ভিসার ধরন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কাগজপত্রের তালিকার জন্য ফ্রান্সের অফিশিয়াল ভিসা পোর্টাল অনুসরণ করাই শ্রেয়।
স্কলারশিপের সুবিধা
প্রতি বছর ফ্রান্স সরকার বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুল সংখ্যক বৃত্তি দিয়ে থাকে। তাছাড়া ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় সব কোর্সে টিউশন ফিগুলোর জন্য বৃত্তি বা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ ছাড় দিয়ে থাকে।
অবশ্য সব বৃত্তি প্রধানত মাস্টার্স ও পিএইচডির জন্য দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের দেয়া সবচেয়ে সাধারণ বৃত্তিগুলো হলো ইরাস্মাস মান্ডাস স্কলারশীপ, আইফেল এক্সিলেন্স স্কলারশিপ, ইউনিভার্সিটি ডি লিয়ন মাস্টার্স স্কলারশিপ এবং ইউনিভার্সিটি প্যারিস-স্যাক্লে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার্স স্কলারশিপ।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনা
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রান্সে প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা চাকরি করার অনুমতি আছে। দেশটির চাকরির বাজারে খণ্ডকালীন কর্মীদের অধিক চাহিদার কারণে চাকরি খুঁজতে তেমন বেগ পেতে হয় না। সপ্তাহে কাজের সময় বেশ সীমিত হলেও তা থেকে মাসে যে আয় আসে তা দিয়ে থাকা-খাওয়া ও চলাফেরার জন্য যথেষ্ট। এ ছাড়া সপ্তাহান্তে বা ছুটির দিনগুলোতে কর্ম ঘণ্টার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এ সময়গুলোতে কাজ করা হলে ফ্রান্সের জীবনযাত্রা বেশ সহজ হয়ে ওঠে। এই কাজগুলো শুধুমাত্র আর্থিকভাবে উপকৃত করবে না, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নেটওয়ার্ক তৈরিতেও সাহায্য করবে।
পড়াশোনা শেষে চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ
ফ্রান্সের সরকারি প্রশাসনিক তথ্যভান্ডার ‘সার্ভিস-পাবলিক’ (Service-Public.fr)-এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ডিগ্রির সঙ্গে সম্পর্কিত চাকরি খোঁজা বা ব্যবসা শুরু করার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের আবাসিক অনুমতিপত্র পেয়ে থাকেন। বিশেষ করে ফরাসি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) বা সমমানের ডিগ্রি সম্পন্নকারীরা এ সুযোগের আওতায় সাধারণত এক বছরের রেসিডেন্স পারমিট পান, যার মাধ্যমে নিজ নিজ পড়ালেখা বা গবেষণার ক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো চাকরিতে যুক্ত হওয়া সম্ভব।
তবে ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বা দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের সুবিধার বিষয়ে সার্ভিস-পাবলিকের তথ্যে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কেবল চাকরি করা বা নিয়মিত আয়কর দিলেই সরাসরি স্থায়ী বসবাসের সুযোগ মেলে না। এক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মে অন্তত পাঁচ বছর ফ্রান্সে বৈধ ও ধারাবাহিকভাবে বসবাস করার আইনি শর্ত রয়েছে। এর পাশাপাশি আবেদনকারীর পর্যাপ্ত ও নিয়মিত আয়, উপযুক্ত স্বাস্থ্যবিমা এবং অন্যান্য নির্ধারিত শর্তাবলি পূরণ করা বাধ্যতামূলক।
সরকারি তথ্য মতে, নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করে কোনো শিক্ষার্থী বা পেশাজীবী যদি ‘দীর্ঘমেয়াদি-ইইউ আবাসিক কার্ড’ লাভ করেন, তবে তিনি ফ্রান্সে স্থায়ী বসবাস ও কাজের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশে তিন মাসের বেশি সময় অবস্থান করার বিশেষ সুবিধা পান। তবে ইইউভুক্ত অন্য কোনো দেশে গিয়ে সরাসরি বসবাস বা চাকরি শুরু করা যায় না; সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশটির নিজস্ব আইনি নিয়ম মেনে আলাদাভাবে নতুন রেসিডেন্স পারমিটের জন্য আবেদন করতে হয়।
ফ্রান্সে যাওয়ার বিকল্প পথ
শিক্ষার্থীদের জন্য এটিই ফ্রান্সে পড়ালেখা থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে যারা ফ্রান্সে পড়াশোনা না করেও সরাসরি চাকরি নিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন কর্মভিত্তিক আবাসনপত্র।
চাকরির মাধ্যমে ফ্রান্সে যাওয়ার সুযোগ
ফ্রান্সের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে নন-ইউরোপীয় নাগরিকরা কর্মভিত্তিক ভিসা ও আবাসনপত্রের জন্য আবেদন করতে পারেন। এক্ষেত্রে চাকরির ধরন, চুক্তির মেয়াদ, নির্ধারিত বেতন, পেশাগত যোগ্যতা এবং নিয়োগকর্তার ফরাসি কর্তৃপক্ষের থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়।
উচ্চদক্ষ কর্মীদের জন্য ফ্রান্সে ‘পাসপোর্ট ত্যালঁ’ (Talent Passport) নামে বিশেষ আবাসন ব্যবস্থার সুবিধা রয়েছে। এর আওতায় বিশেষ পেশাজীবী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করলে এই আবাসনপত্রের মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত হতে পারে।
উচ্চদক্ষদের জন্য ‘ইউরোপীয় নীল কার্ড’
উচ্চশিক্ষিত ও তুলনামূলক উচ্চবেতনের পেশাজীবীদের জন্য ‘ইউরোপীয় নীল কার্ড’ (EU Blue Card) অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি অভিবাসন পথ। আবেদনকারীর অন্তত তিন বছরের উচ্চশিক্ষা অথবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সমমানের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি ফ্রান্সের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কমপক্ষে ছয় মাসের চাকরির চুক্তি এবং নির্ধারিত বেতনসীমা পূরণের শর্ত থাকে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, নীল কার্ডের আবেদনের জন্য প্রার্থীর বার্ষিক মোট বেতন কমপক্ষে ৫৯ হাজার ৩৭৩ ইউরো হতে হয়। প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও ব্যবস্থাপনার মতো উচ্চদক্ষ খাতে এটি অন্যতম মাধ্যম।
গবেষক ও বিজ্ঞানীদের বিশেষ সুযোগ
অনুমোদিত কোনো গবেষণা বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা চুক্তি থাকলে বিদেশি গবেষকরা সহজেই ফ্রান্সে অবস্থান করতে পারেন। ‘পাসপোর্ট ত্যালঁ-গবেষক’ আবাসনপত্রের মাধ্যমে তারা গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুবিধা পান। এ আবাসনপত্রের মেয়াদ চুক্তির মেয়াদের ওপর নির্ভর করে এবং এটি সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত হতে পারে।
উদ্যোক্তা হিসেবে ফ্রান্সে ব্যবসা শুরু
চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও ফ্রান্সে স্থায়ী ভিত্তি গড়া সম্ভব। ‘পাসপোর্ট ত্যালঁ-ব্যবসা প্রতিষ্ঠাতা’ ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে হলে নিছক পুঁজি থাকা যথেষ্ট নয়; একটি বাস্তবমুখী ও জোরালো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হয়।
সরকারি শর্তানুযায়ী, আবেদনকারীর স্নাতকোত্তর সমমানের ডিগ্রি অথবা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অন্তত পাঁচ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। এর পাশাপাশি ব্যবসায়িক প্রকল্পে কমপক্ষে ৩০ হাজার ইউরোর বিনিয়োগ বা অর্থায়ন দেখানো বাধ্যতামূলক।
পরিবারকে সঙ্গে নেওয়ার নিয়ম
ফ্রান্সে দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের পরিকল্পনা থাকলে পরিবারকে সঙ্গে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ শিক্ষার্থী আবাসনপত্রের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের নেওয়ার সুযোগ স্বয়ংক্রিয় নয় এবং এর নিয়মও আলাদা। তবে ‘পাসপোর্ট ত্যালঁ’ এবং নীল কার্ডধারীরা তাদের জীবনসঙ্গী ও নির্দিষ্ট বয়সের সন্তানদের সরাসরি সঙ্গে নেওয়ার অধিকার পান। পরিবারে অন্তর্ভুক্ত সদস্যগণ কাজ করার আইনি অনুমতিও পেয়ে থাকেন।
পাঁচ বছর পর দীর্ঘমেয়াদি আবাসন
ফ্রান্সে স্থায়ী ভিত্তির একটি প্রধান ধাপ হলো ‘দীর্ঘমেয়াদি-ইইউ আবাসনপত্র’। সাধারণ নিয়মে ফ্রান্সে অন্তত পাঁচ বছর বৈধ ও ধারাবাহিকভাবে বসবাস করলে নির্দিষ্ট শর্তে এ কার্ডের জন্য আবেদন করা যায়।
তবে এ জন্য কেবল পাঁচ বছর বসবাসই যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি নিয়মিত ও পর্যাপ্ত আয়ের প্রমাণ, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিমা এবং অন্যান্য আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়। একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি-শুধু শিক্ষার্থী হিসেবে টানা পাঁচ বছর ফ্রান্সে অবস্থান করলেই এই দীর্ঘমেয়াদি কার্ডের যোগ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না। তাই পড়ালেখা শেষেই কর্মভিত্তিক রেসিডেন্স পারমিটে রূপান্তর করে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফরাসি নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ
স্থায়ী আবাসন এবং ফরাসি নাগরিকত্ব সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। নাগরিকত্বের জন্য স্বতন্ত্র আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। সাধারণত ফ্রান্সে নির্দিষ্ট সময় বৈধ বসবাসের পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতা, ফরাসি সমাজে একীভূত হওয়ার প্রমাণ এবং ভাষার দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নাগরিকত্ব আবেদন প্রক্রিয়ায় একটি বিশেষ ‘নাগরিকত্ব পরীক্ষা’ যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে ফরাসি ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আবেদনকারীর জ্ঞান যাচাই করা হয়। পাশাপাশি ফরাসি ভাষায় ন্যূনতম বি২ স্তরের দক্ষতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ফ্রান্সে অভিবাসনের একটিমাত্র নির্দিষ্ট পথ নেই। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গবেষক, উচ্চদক্ষ পেশাজীবী কিংবা উদ্যোক্তা-প্রত্যেকের জন্যই সুনির্দিষ্ট মাধ্যম রয়েছে। তাই নিজের শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা ও আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সঠিক আইনি পথটি নির্বাচন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।



