Wednesday, August 12, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

উচ্চশিক্ষা

দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়তে যাওয়ার আগে যে তথ্যগুলো জানা জরুরি

বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও বৃত্তির সুযোগ থাকায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে আবেদন থেকে ভিসা, খরচ ও বৃত্তি - প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

কে-পপ, কে-ড্রামা কিংবা প্রযুক্তির জন্য দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে বিনোদন ও প্রযুক্তির বাইরেও দেশটি উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, বৃত্তি এবং পড়াশোনা শেষে ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনার কারণে দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়, ভাষা, টিউশন ফি, জীবনযাত্রার খরচ, বৃত্তি, ভিসা, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা - সবকিছু বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা জরুরি।

কেন দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনা?

দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চশিক্ষার অন্যতম শক্তি হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় দেশটির অবস্থান। দেশটির বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইয়োনসেই ইউনিভার্সিটি, কোরিয়া ইউনিভার্সিটি, কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং পোহাং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।

প্রযুক্তিনির্ভর ও গবেষণামুখী শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবসা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মিডিয়া, ডিজাইন, বায়োটেকনোলজি, হসপিটালিটি ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়েও পড়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়তে চাইলে কোরিয়ান ভাষা শেখাকে শুধু বিষয় হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ জীবনের একটি দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা ভালো। বিশেষ করে স্থানীয় পরিবেশে কাজ, যোগাযোগ ও চাকরির ক্ষেত্রে কোরিয়ান ভাষা জানা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

চাহিদাসম্পন্ন বিষয়সমূহ

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। জনপ্রিয় বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে - কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি ও ফাইন্যান্স, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মিডিয়া ও যোগাযোগ, ডিজাইন ও ফ্যাশন, হসপিটালিটি ও ট্যুরিজম, বায়োটেকনোলজি।

দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে -

তবে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করার সময় শুধু র‌্যাঙ্কিং নয়; পছন্দের বিষয়, কোর্সের ভাষা, টিউশন ফি, বৃত্তি, গবেষণার সুযোগ, আবাসন এবং ভবিষ্যৎ চাকরির সম্ভাবনাও বিবেচনা করা উচিত।

ভর্তির যোগ্যতা

দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে আলাদা। তাই সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই জিপিএ বা ভাষার স্কোর নির্ধারিত - এমন ধারণা ঠিক নয়।

স্নাতক: সাধারণত বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করার প্রমাণ, শিক্ষাগত সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট, পাসপোর্ট, ব্যক্তিগত বিবৃতি বা স্টাডি প্ল্যান এবং প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়। 

মাস্টার্স: সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন। অনেক প্রোগ্রামে স্টাডি প্ল্যান, স্টেটমেন্ট অব পারপাস, সুপারিশপত্র, ভাষার স্কোর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষণা প্রস্তাব বা পোর্টফোলিও চাওয়া হতে পারে।

পিএইচডি: সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি প্রয়োজন। গবেষণা প্রস্তাব, থিসিস, একাডেমিক রেকর্ড এবং সম্ভাব্য সুপারভাইজারের সঙ্গে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ইংরেজি-মাধ্যমের প্রোগ্রামে IELTS বা TOEFL এবং কোরিয়ান-মাধ্যমের প্রোগ্রামে TOPIK প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় স্কোর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগভেদে পরিবর্তিত হয়।

যেভাবে আবেদন করবেন

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব অনলাইন পোর্টাল বা নির্ধারিত পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ করে। আবেদনের সময়সূচি ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতাও প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা হতে পারে। তাই চূড়ান্ত আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট অবশ্যই দেখতে হবে।

সাধারণভাবে আবেদন প্রক্রিয়াটি এমন -

বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচন: নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আগ্রহ, বাজেট ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করতে হবে।

যোগ্যতা যাচাই: বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে একাডেমিক যোগ্যতা, ভাষার স্কোর, আবেদন ফি এবং অন্যান্য শর্ত দেখতে হবে।

কাগজপত্র প্রস্তুত: শিক্ষাগত সনদ, ট্রান্সক্রিপ্ট, পাসপোর্ট, ভাষার সনদ, স্টাডি প্ল্যান, সুপারিশপত্রসহ প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করতে হবে।

অনলাইনে আবেদন: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পোর্টালে আবেদন করতে হবে।

ভর্তি নিশ্চিত করা: ভর্তি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ফি ও নথি জমা দিতে হবে।

ভিসার প্রস্তুতি: ভর্তির প্রয়োজনীয় নথি পাওয়ার পর স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।

আবেদনের সময়

দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত বছরে দুটি প্রধান সেমিস্টার থাকে - স্প্রিং ও ফল। তবে আবেদন গ্রহণের নির্দিষ্ট সময় বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে পরিবর্তিত হয়। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন কয়েক মাস আগে নেওয়া হতে পারে, আবার কোথাও সময়সূচি ভিন্ন হতে পারে।

আবেদনের জন্য যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে

বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রাম অনুযায়ী নথির তালিকা আলাদা হতে পারে। সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে -

* পূরণ করা আবেদনপত্র

* বৈধ পাসপোর্ট

* পাসপোর্ট সাইজের ছবি

* শিক্ষাগত সনদ

* একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট

* ভাষা দক্ষতার সনদ

* পার্সোনাল স্টেটমেন্ট বা স্টাডি প্ল্যান 

* সুপারিশপত্র

* সিভি

* ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ

* প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষণা প্রস্তাব

* পোর্টফোলিও - প্রযোজ্য ক্ষেত্রে

মাস্টার্সে সাধারণত ব্যাচেলর ডিগ্রির সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট এবং পিএইচডিতে মাস্টার্স ডিগ্রির নথির পাশাপাশি গবেষণা-সংক্রান্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে ভিসার প্রস্তুতি

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ভিসা। ডিগ্রি প্রোগ্রামে পড়তে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণত ডি-২ (D-2) স্টুডেন্ট স্ট্যাটাস প্রযোজ্য।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভিসা আবেদন করার সময় দূতাবাসের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করতে হবে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-সংক্রান্ত নথি, পাসপোর্ট, ছবি, শিক্ষাগত কাগজপত্র, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণসহ বিভিন্ন নথি থাকতে পারে।

দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী কিছু নথির সত্যায়ন, অনুবাদ বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইস্যু করা কপি প্রয়োজন হতে পারে। তাই পুরোনো কোনো প্রতিবেদনের তালিকা হুবহু অনুসরণ না করে আবেদন করার সময় দূতাবাসের সর্বশেষ নির্দেশনাই চূড়ান্ত হিসেবে ধরা উচিত।

D-2 স্টুডেন্ট ভিসা

দক্ষিণ কোরিয়ায় ডিগ্রি প্রোগ্রামে ভর্তি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য D-2 স্ট্যাটাসের বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে। স্নাতক, মাস্টার্স, ডক্টরাল বা অন্য ধরনের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট D-2 শ্রেণি নির্ধারিত হয়।

বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী স্টাডি ভিসাসহ ভিসা আবেদনকারীদের কোরিয়া ভিসা পোর্টাল-এর ই-ফর্ম পূরণ করতে হয়। ই-ফর্ম পূরণের পর বারকোডসহ ফর্ম প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় নথির সঙ্গে জমা দিতে হয়। 

ভিসার ফি, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রক্রিয়াকরণের সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে বাংলাদেশে অবস্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখা জরুরি।

টিউশন ফি কত?

দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনার খরচ বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয় ও ডিগ্রির স্তরের ওপর নির্ভর করে। জাতীয় ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন তুলনামূলক কম হতে পারে, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি হতে পারে। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, মেডিকেল বা বিশেষায়িত প্রোগ্রামের ফিও আলাদা হতে পারে। তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট অঙ্ককে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।

আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ টিউশন ফি, আবেদন ফি, ল্যাব বা অন্যান্য একাডেমিক চার্জ সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত।

জীবনযাত্রার খরচ

শিক্ষার্থীর মোট বাজেটের বড় অংশ হতে পারে আবাসন, খাবার, যাতায়াত, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যবিমা ও ব্যক্তিগত খরচ। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর গড় মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয় আনুমানিক ৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ কোরিয়ান ওন। তবে শহর ও জীবনযাত্রার ধরন অনুযায়ী এই ব্যয় কম-বেশি হতে পারে। রাজধানী সিউলে সাধারণত ব্যয় বেশি হতে পারে। সিউলের বাইরে পড়াশোনা করলে কিছু ক্ষেত্রে আবাসন ও দৈনন্দিন খরচ কম হতে পারে।

কোথায় থাকবেন?

দক্ষিণ কোরিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের থাকার কয়েকটি ব্যবস্থা রয়েছে -

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরি: ক্যাম্পাসের কাছাকাছি থাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম খরচের জন্য এটি জনপ্রিয়।

শেয়ারড বাসা: একাধিক শিক্ষার্থী একসঙ্গে থাকলে ভাড়া ভাগ করে নেওয়া যায়।

গশিওন (Goshiwon): শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচিত ছোট কক্ষের আবাসন ব্যবস্থা।

ওয়ান-রুম: ব্যক্তিগত থাকার সুবিধা থাকলেও খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

বাসা নেওয়ার আগে শুধু মাসিক ভাড়া নয়, অগ্রিম টাকা প্রদান, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য চার্জ সম্পর্কেও জেনে নিতে হবে।

কোরিয়ান ভাষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ

কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি-মাধ্যমের ডিগ্রি প্রোগ্রাম থাকায় কোরিয়ান ভাষা না জানলেও পড়াশোনা শুরু করা সম্ভব। তবে কোরিয়ান ভাষা জানা দৈনন্দিন জীবন ও স্থানীয় পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে পার্টটাইম কাজ, স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভবিষ্যতে দক্ষিণ কোরিয়ায় চাকরি করার পরিকল্পনা থাকলে কোরিয়ান ভাষার দক্ষতা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। কোরিয়ান-মাধ্যমের প্রোগ্রামে সাধারণত TOPIK স্কোর প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে ইংরেজি-মাধ্যমের প্রোগ্রামে IELTS বা TOEFL-এর মতো পরীক্ষার ফল চাওয়া হতে পারে।

বৃত্তির সুযোগ

দক্ষণ কোরিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন বৃত্তি রয়েছে।

গ্লোবাল কোরিয়া স্কলারশিপ

গ্লোবাল কোরিয়া স্কলারশিপ বা GKS আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য দেশটির অন্যতম প্রধান সরকারি বৃত্তি। স্নাতক, মাস্টার্স ও ডক্টরাল পর্যায়ে এর বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।

বৃত্তির সুবিধা প্রোগ্রামভেদে ভিন্ন হলেও টিউশন, ভাষা প্রশিক্ষণ, বিমানভাড়া ও বিভিন্ন ভাতার সহায়তা থাকতে পারে।

GKS-G কর্মসূচিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এম্বাসি ও ইউনিভার্সিটি ট্র্যাক - দুই পথেই নির্দিষ্ট কোটা ছিল। তবে কোটা, যোগ্যতা ও আবেদনপদ্ধতি প্রতিবছর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যে বছর আবেদন করবেন, সেই বছরের বিজ্ঞপ্তিই অনুসরণ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বৃত্তি

অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ফলাফল বা অন্যান্য যোগ্যতার ভিত্তিতে টিউশন ফি আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করে।

ইয়োনসেই, কোরিয়া ইউনিভার্সিটি, হ্যানিয়াংসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নিজস্ব বৃত্তি রয়েছে। তবে কোন বৃত্তিতে কত শতাংশ ফি মওকুফ হবে, সেটি প্রোগ্রাম ও শিক্ষার্থীর যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে।

পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ

D-2 স্টুডেন্ট স্ট্যাটাসে থাকা শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে খণ্ডকালীন কাজ করতে পারেন। তবে ভিসা থাকলেই ইচ্ছামতো কাজ করা যায় না; কাজ শুরুর আগে প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হয়।

অনুমোদিত কাজের সময় শিক্ষার্থীর ডিগ্রি, ভাষাগত দক্ষতা ও অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই পুরোনো কোনো তথ্য অনুযায়ী সবার জন্য সপ্তাহে ২০ বা ৩০ ঘণ্টা কাজের নিয়ম ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রেস্তোরাঁ, দোকান, সাধারণ অফিস সহায়তা বা নির্দিষ্ট শিক্ষার্থী-উপযোগী কাজে সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। তবে অনুমতি ছাড়া কাজ করলে ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - পার্টটাইম কাজকে পড়াশোনার পুরো খরচের প্রধান উৎস হিসেবে ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়া উচিত নয়।

স্বাস্থ্যবিমা

দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। বিদেশিদের অবস্থানের ধরন ও নিবন্ধনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যবিমায় অন্তর্ভুক্তির নিয়ম রয়েছে। তাই দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার আগে স্বাস্থ্যবিমায় নিবন্ধন, মাসিক প্রিমিয়াম ও চিকিৎসা ব্যয়ের কাভারেজ সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া উচিত।

পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগ

দক্ষিণ কোরিয়ায় ডিগ্রি শেষ করার পর যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট শর্তে চাকরি খোঁজার জন্য D-10 স্ট্যাটাসে পরিবর্তনের আবেদন করতে পারেন। চাকরি পাওয়ার পর পেশা, যোগ্যতা ও নিয়োগের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানভিত্তিক স্ট্যাটাসে পরিবর্তনের সুযোগ থাকতে পারে। E-7-সহ বিভিন্ন কর্মসংস্থানভিত্তিক স্ট্যাটাসের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হয়।

প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গবেষণা ও অন্যান্য উচ্চদক্ষতার পেশায় একাডেমিক ডিগ্রির পাশাপাশি বাস্তব দক্ষতা ও কোরিয়ান ভাষাজ্ঞান থাকলে ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা হতে পারে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনা শেষ করলেই চাকরি বা ভিসা পরিবর্তন নিশ্চিত নয়।

দীর্ঘমেয়াদে থাকার সুযোগ

পড়াশোনা শেষ করেই সরাসরি স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া যায় না। তবে যোগ্যতা ও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে পড়াশোনা থেকে কর্মসংস্থান এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের দিকে এগোনোর সুযোগ থাকতে পারে।

সম্ভাব্য একটি পথ হতে পারে - 

D-2 → D-10 → চাকরি → উপযুক্ত কর্মসংস্থানভিত্তিক স্ট্যাটাস → নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করলে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ

প্রতিটি পর্যায়ের নিয়ম আলাদা এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।

সিউল নাকি অন্য শহর?

বিশ্ববিদ্যালয় বাছাইয়ের সময় শুধু রাজধানী সিউলকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সিউলে বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক পরিবেশ, চাকরি ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ বেশি হলেও জীবনযাত্রার খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। অন্যদিকে সিউলের বাইরে বিভিন্ন শহরেও ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের পাশাপাশি শহরের আবাসন খরচ, যাতায়াত, জীবনযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ চাকরির সুযোগ বিবেচনা করা উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয় বাছাইয়ের আগে যা দেখবেন

শুধু র‌্যাঙ্কিং নয়, বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করার সময় দেখে নিন - 

* পছন্দের বিষয়টি আছে কি না

* কোর্সটি ইংরেজি নাকি কোরিয়ান ভাষায়

* প্রয়োজনীয় IELTS/TOEFL বা TOPIK স্কোর

* টিউশন ও অন্যান্য ফি

* বৃত্তির সুযোগ

* ডরমিটরি বা আবাসনের ব্যবস্থা

* গবেষণার সুযোগ

* বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান

* জীবনযাত্রার সম্ভাব্য ব্যয়

* পড়াশোনা শেষে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ

কাদের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া উপযুক্ত?  

দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জন্য ভালো একটি বিকল্প হতে পারে, যারা - 

  • বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল বা গবেষণায় আগ্রহী
  • প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়তে চান
  • ইংরেজি বা কোরিয়ান ভাষার একাডেমিক পরিবেশে মানিয়ে নিতে প্রস্তুত
  • বৃত্তির জন্য প্রতিযোগিতামূলক আবেদন করতে পারবেন
  • নতুন সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রস্তুত
  • পড়াশোনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়েও পরিকল্পনা করতে চান

শেষ কথা

দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভাবনাময় একটি পথ। শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি ও গবেষণার পরিবেশ, সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বৃত্তি এবং পড়াশোনা শেষে চাকরি খোঁজার সুযোগ দেশটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তবে শুধু ‘কম খরচে বিদেশে পড়াশোনা’ কিংবা ‘পড়াশোনা শেষে সহজেই চাকরি’ - এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কোন বিষয়ে পড়বেন, কোথায় পড়বেন, কত টাকা প্রয়োজন, বৃত্তির সুযোগ আছে কি না, কোরিয়ান ভাষা কতটা জানেন এবং ডিগ্রি শেষে কী করতে চান - এসব প্রশ্নের উত্তর আগে ঠিক করা জরুরি।

ভর্তি, ভিসা, বৃত্তি ও কাজের নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাস এবং কোরিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট সরকারি পোর্টালের সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

   

About

Popular Links

x