ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ এবং সুন্দর দেশ সুইজারল্যান্ড বরাবরই বিশ্বজুড়ে অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য এক স্বপ্নের নাম। তবে কঠোর অভিবাসন নীতি, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কোটা সিস্টেমের কারণে বাইরের দেশের নাগরিকদের জন্য সুইজারল্যান্ডের দরজা বেশ সংকুচিত। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশটি ইইউ-বহির্ভূত দেশের নাগরিকদের জন্য ওয়ার্ক পারমিটের কোটা মোট ৮,৫০০-তে অপরিবর্তিত রেখেছে। এই কঠোর শ্রমবাজারের সমীকরণে এখন সবচেয়ে কার্যকর এবং জনপ্রিয় উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘স্টাডি টু ওর্য়াক’ রুট। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে সুইজারল্যান্ডে স্থায়ী হওয়ার পথ।
সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার প্রধান তিনটি মাধ্যম
ক) কাজের উদ্দেশ্যে (Work Visa / Permit)
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সুইজারল্যান্ডের কাজের ভিসা পাওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং, কারণ সেখানে ‘কোটা সিস্টেম’ এবং ‘স্থানীয়দের অগ্রাধিকার’ নীতি কঠোরভাবে মানা হয়।
খ) উচ্চশিক্ষা (Student Visa)
এটি বাংলাদেশিদের জন্য সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। সুইজারল্যান্ডের কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় বা ইনস্টিটিউটে ভর্তির সুযোগ পেতে হবে।
গ) বিনিয়োগ বা ব্যবসা (Investment / Self-Employment)
আপনার যদি প্রচুর মূলধন থাকে, তবে ব্যবসার মাধ্যমে সেখানে থাকা সম্ভব। তবে সাধারণ কোনো ব্যবসার জন্য এই সুযোগ দেওয়া হয় না। এমন ব্যবসা হতে হবে যা সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
সুইজারল্যান্ডের রেসিডেন্স পারমিট (Residency Permits)
সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর পর আপনার স্ট্যাটাসের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ক্যাটাগরির পারমিট বা কার্ড দেওয়া হয়। প্রধান পারমিটগুলো হলো:
L Permit (Short-term) : এটি স্বল্পমেয়াদি বা নির্দিষ্ট প্রজেক্টের কাজের জন্য (সর্বোচ্চ ১ বছর) দেওয়া হয়।
B Permit (Resident Foreign Nationals) : দীর্ঘমেয়াদি বৈধ বসবাসের জন্য ব্যবহৃত একটি রেসিডেন্স পারমিট। কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা অন্যান্য অনুমোদিত উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী এটি ইস্যু করে এবং নির্দিষ্ট শর্তে নবায়ন করা যায়।
C Permit (Settlement Permit) : এটি হলো স্থায়ী নাগরিকত্ব বা PR (Permanent Residency)। এটি সুইস নাগরিকত্ব নয়। C Permit পাওয়ার পরও নাগরিকত্বের জন্য আলাদা আবেদন ও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়। নন-ইইউ নাগরিকদের ক্ষেত্রে সাধারণত সুইজারল্যান্ডে টানা ১০ বছর লিগ্যাল স্ট্যাটাসে থাকার পর এই পারমিটের জন্য আবেদন করা যায়।
চলুন এবার সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনা, চাকরি এবং স্থায়ী আবাসন বা পিআর পাওয়ার প্রতিটি ধাপের ভেতরের বাস্তব চিত্রসহ একটি সম্পূর্ণ গাইডলাইন তুলে ধরা যাক -
প্রথম ধাপ: উচ্চশিক্ষা, খরচের হিসাব ও ভাষার প্রস্ততি
সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনার মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো একটি স্বীকৃত সুইস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া।
সুইজারল্যান্ডের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়
ইটিএইচ জুরিখ, ইকোল পলিটেকনিক ফেডারেল ডি লোস্যান, ইউনিভার্সিটি অব জুরিখ, ইউনিভার্সিটি অব ব্যাসেল, ইউনিভার্সিটি অব বার্ন, ইউনিভার্সিটি অব জেনেভা, ইউনিভার্সিটি অব লোস্যান, ইউএসআই ইউনিভার্সিটি ডেলা স্ভিজ্জেরা ইতালিয়ানা, ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট গ্যালেন ও ইউনিভার্সিটি অব ফ্রিবুর্গ।
পড়ার সেরা বিষয় কোনগুলো
হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট, বিজনেস অ্যান্ড ফাইন্যান্স, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন অ্যান্ড হেলথকেয়ার, আইন, অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিকস ও সাংবাদিকতা।
আবেদনের উপায়
সুইজারল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত দুটি ভর্তি মৌসুম বা ইনটেক থাকে - ফল (Autumn/Fall Intake) এবং স্প্রিং (Spring Intake)। এর মধ্যে ফল ইনটেক সবচেয়ে জনপ্রিয়, কারণ এ সময় তুলনামূলক বেশি সংখ্যক কোর্সে ভর্তি নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে আবেদনের সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে ফল ইনটেকের জন্য আবেদন ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এবং অনেক ক্ষেত্রে মার্চ বা এপ্রিল পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে স্প্রিং ইনটেকের আবেদন সাধারণত মে থেকে সেপ্টেম্বর-এর মধ্যে সম্পন্ন হয়। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ সময়সূচি দেখে নেওয়া উচিত।
ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে প্রয়োজনীয় নথিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণত নিচের কাগজপত্র জমা দিতে হয় -
- সম্পূর্ণ পূরণকৃত অনলাইন আবেদনপত্র
- বৈধ পাসপোর্টের অনুলিপি
- সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি
- এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক বা স্নাতকোত্তরের সার্টিফিকেট ও একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- জীবনবৃত্তান্ত
- মোটিভেশন লেটার বা স্টেটমেন্ট অব পারপাস
- এক বা একাধিক সুপারিশপত্র (বিশেষ করে মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে)
- ইংরেজি বা সংশ্লিষ্ট ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ (যদি প্রোগ্রামে প্রয়োজন হয়)
- আবেদন ফি পরিশোধের রসিদ (যদি প্রযোজ্য হয়)
- পিএইচডি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে গবেষণা প্রস্তাব এবং প্রয়োজন হলে সম্ভাব্য সুপারভাইজারের সম্মতিপত্র
- ভাষাগত দক্ষতার ন্যূনতম স্কোর এবং আবেদন ফি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভর্তি নির্দেশিকা ভালোভাবে দেখে নেওয়া প্রয়োজন। ইংরেজি মাধ্যমের কোর্সের জন্য আইইএলটিএস স্কোর ন্যূনতম ৬.০ থেকে ৬.৫ প্রয়োজন হয়।
স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন
ভিসার আবেদন বাংলাদেশে সুইস দূতাবাসের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী করতে হয়। আবেদন গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ক্যান্টনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়। এ কারণে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই নির্ধারিত ক্লাস শুরুর অনেক আগেই আবেদন করা উচিত।
স্টুডেন্ট ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
সাধারণভাবে নিচের নথিগুলো প্রয়োজন হয় -
- সম্পূর্ণ পূরণকৃত ও স্বাক্ষরিত জাতীয় (Type D) ভিসা আবেদন ফরম
- বৈধ পাসপোর্ট
- সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি
- সুইস বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফার বা ভর্তি নিশ্চিতকরণপত্র
- শিক্ষাগত সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট
- জীবনবৃত্তান্ত
- মোটিভেশন লেটার বা স্টাডি প্ল্যান
- পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ (ব্যাংক স্টেটমেন্ট, স্পনসরশিপ বা অন্যান্য গ্রহণযোগ্য আর্থিক নথি)
- প্রয়োজন অনুযায়ী টিউশন ফি পরিশোধের প্রমাণ
- ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণ (যদি প্রযোজ্য হয়)
- প্রয়োজন হলে আবাসনের তথ্য, স্বাস্থ্য বীমা বা অন্যান্য অতিরিক্ত নথি
কিছু ক্ষেত্রে দূতাবাস বা ক্যান্টন কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত নথি বা সাক্ষাৎকারের জন্য আবেদনকারীকে ডেকে পাঠাতে পারে।
আর্থিক সক্ষমতা
স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদনকারীকে সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে হয়। বর্তমানে প্রতি শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ২১,০০০ সুইস ফ্রাঙ্ক বা তার বেশি অর্থের সমপরিমাণ আর্থিক সামর্থ্য দেখানো প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ ক্যান্টন ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ভিত্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে।
সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর পর যা করতে হবে
ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকআপ ও আবাসন: সুইজারল্যান্ডে টিউশন ফি তুলনামূলক কম হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় ইউরোপের অন্যতম সর্বোচ্চ। স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করার সময় সাধারণত এক শিক্ষাবর্ষের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই পরিমাণ প্রায় ২০,০০০-২৪,০০০ সুইস ফ্রাঙ্ক বা তার সমপরিমাণ অর্থ হতে পারে। রেসিডেন্স পারমিট নবায়নের সময়ও প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ চাওয়া হতে পারে।
সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো আবাসন। জুরিখ, জেনেভা ও লোজানের মতো বড় শহরগুলোতে শিক্ষার্থী আবাসনের চাহিদা বেশি থাকায় ডরমিটরি বা শেয়ার্ড অ্যাপার্টমেন্ট পেতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। অবস্থান ও আবাসনের ধরন অনুযায়ী মাসিক ভাড়া সাধারণত ৬০০ থেকে ১,২০০ সুইস ফ্রাঙ্ক পর্যন্ত হতে পারে।
স্বাস্থ্য বীমা: সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর পর সাধারণত তিন মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য বীমা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। বীমার ধরন, ক্যান্টন ও বীমা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে মাসিক প্রিমিয়ামের পরিমাণ ভিন্ন হয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষার্থী স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থাও রয়েছে।
রেসিডেন্স পারমিটের জন্য আবেদন: ভিসা নিয়ে সুইজারল্যান্ড পৌঁছার সাধারণত প্রথম ১৪ দিনের মধ্যে রেসিডেন্স পারমিটের জন্য আবেদন করতে হবে। এ পারমিটের ওপর ভিত্তি করে পরে সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, বাসস্থান নির্ধারণসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।
রেসিডেন্স পারমিট নিতে হবে শিক্ষার্থী যে শহরে থাকবেন, সেখানকার স্থানীয় ক্যান্টন অভিবাসন অফিস থেকে। বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকদের জন্য এই পারমিটের ক্যাটাগরি ভিন্ন হয়ে থাকে। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বি–টাইপের জন্য আবেদন করবেন। পারমিটের মেয়াদ থাকে সাধারণত এক বছর এবং তারপর এটি নবায়ন করা যায়।
পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার সম্ভাব্য খরচ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অধ্যয়নের বিষয় - নির্বিশেষে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য প্রতি সেমিস্টারে খরচ হতে পারে গড়ে ৭৩০ থেকে ৯৫০ ফ্রাঙ্ক। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি ১ লাখ ৩ হাজার ২৬ টাকা থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪ টাকার মতো।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়: ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের জন্য বার্ষিক অধ্যয়ন ফি ১,০০০-২,৫০০ সুইস ফ্রাঙ্ক
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়: ১০,০০০-৩০,০০০ সুইস ফ্রাঙ্ক বা তার বেশি গড়ে ১ থেকে ২ হাজার ফ্রাঙ্ক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ফি হতে পারে ১০ থেকে ২০ হাজার ফ্রাঙ্ক। পিএইচডির জন্য বাজেট রাখতে হবে (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে) ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ফ্রাঙ্ক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ব্যয় গিয়ে দাঁড়াবে ৫ থেকে ১০ হাজার ফ্রাঙ্কে।
জীবনযাত্রার খরচ
জীবনযাত্রার খরচের নিরীখে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ সুইজারল্যান্ড। অবশ্য দেশটির বিভিন্ন শহরে এই বাজেটের তারতম্য ঘটে। লিপস্কলার (ভারতীয় ওভারসিজ এডুকেশন কনসালটেন্স) এবং নাম্বিও (ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটস ডেটাবেজ) অনুসারে, প্রধান সুইস শহরগুলোতে গড়পড়তায় মাসিক জীবনযাত্রার খরচ হতে পারে-
জুরিখ: ২৮০০-৩,৮০০ সুইস ফ্রাঙ্ক
জেনেভা: ২,৮০০-৩,৭০০ সুইস ফ্রাঙ্ক
বাসেল: ২,৫০০-৩,৪০০ সুইস ফ্রাঙ্ক
বার্ন: ২,৩০০-৩,২০০ সুইস ফ্রাঙ্ক
লোজান: ২,৬০০-৩,৫০০ সুইস ফ্রাঙ্ক
সুইজারল্যান্ডে স্কলারশিপের সুবিধা
বিভিন্ন ধরনের স্কলারশিপ, অনুদান ও আর্থিক সহায়তা হিসেবে সুইস সরকার প্রতিবছর প্রায় ২০০ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঙ্ক বরাদ্দ রাখে। লিপস্কলারে তথ্যমতে, এগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধ স্কলারশিপগুলো হলো -
- সুইস গভর্নমেন্ট এক্সিলেন্স স্কলারশিপ
- ইটিএইচ জুরিখ এক্সিলেন্স স্কলারশিপ
- জেনেভা ইউনিভার্সিটি এক্সিলেন্স মাস্টার ফেলোশিপ
- ইউনিভার্সিটি অব লুসান মাস্টার্স গ্রান্ট্স
- ইপিএফএল এক্সিলেন্স ফেলোশিপ
- গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট জেনেভা স্কলারশিপ
- পিএইচডি প্রার্থীদের জন্য জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় স্কলারশিপ
- জেনেভা একাডেমি অব ইন্টার্ন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান ল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্কলারশিপ
- উন্নয়নশীল দেশের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নেসলে এমবিএ স্কলারশিপ
- ফ্র্যাঙ্কলিন অনার্স প্রোগ্রাম অ্যাওয়ার্ড
খণ্ডকালীন চাকরি
স্টুডেন্ট ভিসার আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সেমিস্টার চলার সময়ে প্রতি সপ্তাহে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করার অনুমতি পান। আর নানা উপলক্ষে ছুটির দিনগুলোতে ফুলটাইম কাজ করে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সহকারী, রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, হোটেল, খুচরা বিক্রয়, কাস্টমার সার্ভিস এবং আইটি-সংক্রান্ত খণ্ডকালীন কাজে সুযোগ পান। কাজের ধরন, শহর, নিয়োগকর্তা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ঘণ্টাপ্রতি পারিশ্রমিক পরিবর্তিত হয় এবং সাধারণভাবে প্রায় ২৫ থেকে ৪০ সুইস ফ্রাঙ্ক বা তার বেশি হতে পারে।
তবে নন-ইইউ শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা শুরুর প্রথম ৬ মাস কোনো কাজের অনুমতি নেই। ফলে প্রথম সেমিস্টারের পুরো খরচ বাংলাদেশ থেকেই নিয়ে যেতে হয়। এছাড়া সাধারণ পার্ট-টাইম কাজ (যেমন: রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ বা ক্যাফে) করতে হলে স্থানীয় ভাষা জানা বাধ্যতামূলক। ইংরেজি দিয়ে বড়জোর ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানিতে ইন্টার্নশিপ পাওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ: ‘পোস্ট-স্টাডি’ উইন্ডো ও শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ
সুইজারল্যান্ড থেকে সফলভাবে ব্যাচেলর বা মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর ইমিগ্রেশন আইনের একটি বিশেষ ধারা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে।
ছয় মাসের জব সার্চ ভিসা: গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর চাকরি খোঁজার জন্য সুইজারল্যান্ড সরকার ৬ মাসের একটি বিশেষ রেসিডেন্স পারমিট এক্সটেনশন দেয়।
কোম্পানি স্পন্সরশিপ ও লেবার মার্কেট টেস্ট: এই ৬ মাসের মধ্যে ডিগ্রির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ফুল-টাইম চাকরি খুঁজে নিতে হবে। সাধারণত বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কোনো চাকরিতে আবেদন করলেসুইস কোম্পানিকে প্রমাণ করতে হয় যে তারা পুরো সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপে কোনো যোগ্য প্রার্থী পায়নি (Labor Market Test)। কিন্তু আপনি যদি সুইজারল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে এই নিয়মে বিশেষ শিথিলতা পাওয়া যায়, যা চাকরি ও স্পন্সরশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তৃতীয় ধাপ: সরাসরি ওয়ার্ক ভিসার কঠোর নিয়ম
বাংলাদেশসহ নন-ইইউ/ইএফটিএ দেশের নাগরিকদের জন্য সুইজারল্যান্ডে সরাসরি ওয়ার্ক ভিসা পাওয়া তুলনামূলক কঠিন। সাধারণত উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন (Highly Skilled) পেশাজীবীদেরই এই সুযোগ দেওয়া হয়।
শ্রমবাজারের শর্ত: বিদেশি কর্মী নিয়োগের আগে নিয়োগকর্তাকে সুইস শ্রমবাজার-সংক্রান্ত প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এবং ইইউ/ইএফটিএ অঞ্চলে উপযুক্ত কর্মী পাওয়া না গেলে তবেই নন-ইইউ নাগরিক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বেতন ও চাকরির শর্ত: বিদেশি কর্মীর বেতন ও চাকরির শর্ত সংশ্লিষ্ট পেশা, ক্যান্টন এবং স্থানীয় শ্রমবাজারের প্রচলিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। সুইজারল্যান্ডে নন-ইইউ নাগরিকদের জন্য কোনো একক জাতীয় ন্যূনতম বেতনসীমা নির্ধারিত নেই।
বার্ষিক কোটা: প্রতি বছর সুইস সরকার নন-ইইউ/ইএফটিএ নাগরিকদের জন্য ওয়ার্ক পারমিটের কোটা নির্ধারণ করে। ২০২৬ সালে এই কোটা মোট ৮,৫০০টি, যার মধ্যে ৪,৫০০টি B Permit এবং ৪,০০০টি L Permit। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও চাকরির অফার থাকা সত্ত্বেও কোটা পূর্ণ হয়ে গেলে নতুন ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
চতুর্থ ধাপ: B পারমিট থেকে C পারমিট - স্থায়ী আবাসনের চূড়ান্ত পথ
চাকরি নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় সুইজারল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসের আইনি প্রক্রিয়া:
স্টুডেন্ট পারমিট → চাকরি → B Permit → দীর্ঘমেয়াদি বৈধ বসবাস ও শর্ত পূরণ → C Permit (Settlement Permit) → পরবর্তী সময়ে নাগরিকত্বের আবেদন (আইনি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে)
ক্যান্টন-ভিত্তিক ইমিগ্রেশন আইন: সুইজারল্যান্ডের অভিবাসনব্যবস্থা ফেডারেল আইন দ্বারা পরিচালিত হলেও পারমিট ইস্যু, নবায়ন ও কিছু প্রশাসনিক বিষয়ে ক্যান্টনভেদে পার্থক্য থাকতে পারে।সুইজারল্যান্ডে কোনো কেন্দ্রীয় একক নিয়মে ইমিগ্রেশন হয় নাইমিগ্রেশন হয় না। দেশটিতে ২৬টি ক্যান্টন (প্রদেশ) রয়েছে এবং প্রতিটি ক্যান্টনের নিয়ম আলাদা। যেমন - জুরিখ বা জেনেবার মতো বড় ক্যান্টনগুলোতে চাকরির সুযোগ বেশি হলেও ইমিগ্রেশন ও পিআর পাওয়ার নিয়ম অনেক বেশি কঠোর। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত ছোট ক্যান্টনগুলোতে প্রতিযোগিতা কিছুটা কম।
C Permit (স্থায়ী আবাসন বা PR): সুইজারল্যান্ডে একটানা ১০ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর সাধারণত 'সি পারমিট' বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি দেওয়া হয়। তবে একটি চমৎকার আপডেট হলো - আপনি যদি সুইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট হন, পেশাগতভাবে সফল হন এবং স্থানীয় ভাষায় দক্ষ হন, তবে অনেক ক্যান্টন ৫ বছর পরেই ফাস্ট-ট্র্যাক নিয়মে C Permit দিয়ে দেয়।
ভাষার পরীক্ষা: C Permit বা পিআর-এর আবেদন করার সময় অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট দেওয়া বাধ্যতামূলক। ক্যান্টন ভেদে অফিশিয়াল ভাষায় (জার্মান, ফ্রেঞ্চ বা ইতালিয়ান) স্পিকিং-এ কমপক্ষে B1 লেভেল এবং রাইটিং-এ A2 লেভেল যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন শেনজেন বর্ডার কোডের সাথে মিল রেখে সুইজারল্যান্ডও তাদের ইমিগ্রেশন ও ভিসা সিস্টেমে ডিজিটাল এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম চালু করেছে। এর ফলে এখন থেকে স্টুডেন্ট, বিজনেস বা ট্যুরিস্ট ভিসায় সুইজারল্যান্ডে প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় ডিজিটাল পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপ ও ফেসিয়াল ইমেজসহ বায়োমেট্রিক ডেটা সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মনে রাখবেন
সুইজারল্যান্ডে স্টুডেন্ট ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও রেসিডেন্স পারমিট-সংক্রান্ত নিয়ম সময়ে সময়েই পরিবর্তিত হতে পারে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, সুইস দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট ক্যান্টনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।



