বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চাকরি কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখা মানুষের কাছে জাপান এখন অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। এক সময় মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের দিকে ঝোঁক থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে যাওয়ার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর পেছনে রয়েছে দেশটির উন্নত অর্থনীতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষ জনবলের চাহিদা, উচ্চ আয়ের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা।
বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর দেশ জাপানে জন্মহার কমে যাওয়া ও বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন বাড়ছে। ফলে দক্ষ জনশক্তির পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকায় পড়াশোনার উদ্দেশ্যেও প্রতিবছর অনেক বাংলাদেশি দেশটিতে যাচ্ছেন।
Japan Student Services Organization (JASSO)-এর সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ মে ২০২৫ পর্যন্ত জাপানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪,০৮,০৬৯ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.২% বেশি। এটি এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MHLW)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ২৫,৭১,০৩৭ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ১১.৭% বৃদ্ধি।
তবে জাপানে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেই যে যেকোনো ভিসা পাওয়া যাবে, বিষয়টি এমন নয়। জাপানে প্রায় ৩০ ধরনের ভিসা রয়েছে এবং প্রতিটি ভিসার উদ্দেশ্য, যোগ্যতা ও অনুমোদিত কার্যক্রম আলাদা। তাই আবেদন করার আগে নিজের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সঠিক ভিসা নির্বাচন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানের ভিসা ব্যবস্থা
জাপানের ভিসাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় -
ওয়ার্কিং ভিসা (Working Visa): যারা চাকরি বা পেশাগত কাজে জাপানে যেতে চান।
নন-ওয়ার্কিং ভিসা (Non-working Visa): পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ বা অন্যান্য অ-কর্মসংস্থানমূলক উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য।
পারিবারিক ভিসা (Family-related Visa): জাপানি নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দার পরিবারের সদস্যদের জন্য।
একজন ব্যক্তি একই সময়ে একটি ভিসাই ব্যবহার করতে পারেন। একাধিক ভিসার যোগ্যতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত একটি ভিসা বেছে নিতে হয়।
জাপানে ভিসা পেতে কী লাগে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জাপানের ভিসার জন্য একটি স্পনসর বা হোস্ট প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হয়। যেমন - স্টুডেন্ট ভিসার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চাকরির ভিসার জন্য নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা আমন্ত্রণকারী ব্যক্তি।
তবে শুধু স্পনসর থাকলেই ভিসা নিশ্চিত হয় না। আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট ভিসার সব যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হয়।
১. সবচেয়ে পরিচিত ওয়ার্কিং ভিসাগুলো
Engineer / Specialist in Humanities / International Services: বাংলাদেশিদের মধ্যে অফিসভিত্তিক চাকরির জন্য এটি অন্যতম জনপ্রিয় ভিসা।
এই ভিসায় কাজ করা যায়- প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), অর্থনীতি, আইন, সমাজবিজ্ঞান, অনুবাদ, দোভাষী, ভাষা শিক্ষা, জনসংযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ফ্যাশন ডিজাইন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, পণ্য উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে।
যোগ্যতা: সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অথবা নির্ধারিত সময়ের পেশাগত অভিজ্ঞতা।
Intra-company Transferee Visa: যেসব কর্মী নিজ দেশের একই প্রতিষ্ঠানের বিদেশি শাখা থেকে জাপানের শাখায় বদলি হয়ে যান, তাদের জন্য এই ভিসা।
যোগ্যতা: বিদেশের অফিসে কমপক্ষে এক বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
Skilled Labor Visa: বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের জন্য এই ভিসা।এর আওতায় রয়েছে- বিদেশি রন্ধনশিল্প, স্থাপত্য ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিশেষ দক্ষতা, মূল্যবান ধাতু ও পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ, পশু প্রশিক্ষণ, বিমান চালনা, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ। এছাড়া Specified Skilled Worker (SSW)ভিসাও দেওয়া হয়ে থাকে।
যোগ্যতা: কাজের ধরন অনুযায়ী সাধারণত ৩ থেকে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা।
Business Manager Visa: জাপানে ব্যবসা শুরু করতে বা ব্যবসা পরিচালনা করতে ইচ্ছুক বিদেশিদের জন্য। নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০ লাখ ইয়েন বিনিয়োগ এবং নবায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ব্যবসায়িক আয়ের শর্ত পূরণ করতে হয়।
Highly Skilled Professional Visa: উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করতে চালু করা হয়েছে এই ভিসা। আবেদনকারীর শিক্ষা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, আয় ও গবেষণার ভিত্তিতে পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়। ৭০ বা তার বেশি পয়েন্ট পেলে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়।
এর মধ্যে রয়েছে - পাঁচ বছরের ভিসা। দ্রুত স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার, নির্দিষ্ট শর্তে জীবনসঙ্গীর পূর্ণকালীন চাকরির সুযোগ, নির্দিষ্ট শর্তে বাবা-মাকে জাপানে আনার সুযোগ, নির্দিষ্ট শর্তে গৃহকর্মী নিয়োগের সুযোগ।
Specified Skilled Worker (SSW): জাপানে তীব্র শ্রমিক সংকট দূর করার জন্য ২০১৯ সালে এই বিশেষ ওয়ার্কিং ভিসা ক্যাটাগরিটি চালু করা হয়। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের কর্মীরা এই ভিসার অধীনে সরাসরি জাপানে ফুল-টাইম (পূর্ণকালীন) চাকরি করার সুযোগ পান।
যোগ্যতা: এই ভিসার জন্য দুটি জিনিস আবশ্যিক - জাপানি ভাষার দক্ষতা (সাধারণত JLPT N4 বা JFT-Basic পাশ)এবং সংশ্লিষ্ট কাজের ওপর একটি স্কিল বা দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা পাশ করতে হয়।
২. স্টুডেন্ট ভিসা: জাপানে উচ্চশিক্ষা, ভোকেশনাল শিক্ষা বা জাপানি ভাষা শেখার জন্য স্টুডেন্ট ভিসা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, ভোকেশনাল স্কুল, উচ্চমাধ্যমিক, মাধ্যমিক, প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা জাপানি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা এ ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন।
এই ভিসার আবেদন সাধারণত সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন সম্পন্ন করতে হয়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিলে শিক্ষার্থীরা খণ্ডকালীন কাজও করতে পারেন।
ট্রেইনি ভিসা: প্রযুক্তি, দক্ষতা বা বিশেষ জ্ঞান অর্জনের জন্য জাপানের সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুক বিদেশিদের জন্য ট্রেইনি ভিসা রয়েছে।
এই ভিসা সাধারণত তাদের দেওয়া হয়, যারা প্রশিক্ষণ শেষে নিজ দেশে ফিরে অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগাবেন।
টেকনিক্যাল ইন্টার্নশিপ ভিসা: ট্রেইনি পর্যায় শেষ করার পর প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য টেকনিক্যাল ইন্টার্নশিপ ভিসা দেওয়া হয়।
ডিপেনডেন্ট ভিসা: জাপানে ওয়ার্কিং বা নির্দিষ্ট নন-ওয়ার্কিং ভিসায় অবস্থানরত বিদেশিদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানরা ডিপেনডেন্ট ভিসা পতে পারেন।
এই ভিসায় পূর্ণকালীন চাকরি করা যায় না। তবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত খণ্ডকালীন কাজ করা সম্ভব।
টেম্পোরারি ভিজিটর ভিসা: স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণ, পর্যটন, পরিবার পরিদর্শন, খেলাধুলা, সেমিনার, সম্মেলন বা ব্যবসায়িক বৈঠকের জন্য টেম্পোরারি ভিজিটর ভিসা দেওয়া হয়।
এই ভিসায় পর্যটনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক বৈঠক, চুক্তি স্বাক্ষর, জনসংযোগ কার্যক্রম কিংবা বাজার গবেষণার মতো সীমিত কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। তবে এই ভিসায় চাকরি করার অনুমতি নেই।
ডিজিগনেটেড অ্যাক্টিভিটিজ ভিসা: কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে পৃথকভাবে নির্ধারিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই ভিসা দেওয়া হয়। এর আওতায় থাকতে পারে- ওয়ার্কিং হলিডে, দীর্ঘমেয়াদি ভ্রমণ, কূটনীতিকদের গৃহকর্মী, নির্দিষ্ট ইন্টার্নশিপসহ বিশেষ কার্যক্রম। প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে মূল্যায়ন করে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত দেয়।
৩. পারিবারিক ভিসা: জাপানি নাগরিক কিংবা স্থায়ী বাসিন্দার পরিবারের সদস্যদের জন্য রয়েছে বিশেষ পারিবারিক ভিসা। এই ভিসাগুলোতে সাধারণত কাজের ওপর আলাদা কোনো বিধিনিষেধ থাকে না এবং চাকরি পরিবর্তন বা একাধিক পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগও রয়েছে। এই শ্রেণিতে রয়েছে - জাপানি নাগরিকের স্বামী/স্ত্রী বা সন্তান, দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দা, স্থায়ী বাসিন্দা অথবা স্থায়ী বাসিন্দার স্বামী/স্ত্রী বা সন্তান।
আবেদন করার আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি
জাপানে এক সময়ে কেবল একটি ভিসা রাখা যায়। একই ব্যক্তি একাধিক ভিসার জন্য যোগ্য হলেও একটি ভিসাই বেছে নিতে হয়। অধিকাংশ ভিসার ক্ষেত্রে জাপানে কোনো প্রতিষ্ঠান, নিয়োগকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা আমন্ত্রণকারী ব্যক্তির স্পনসরশিপ প্রয়োজন হয়। ভর্তি বা চাকরি নিশ্চিত হওয়ার পর জাপানের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে Certificate of Eligibility (COE) সংগ্রহ করা হয়। এরপর আবেদনকারী নিজ দেশের জাপান দূতাবাস বা কনস্যুলেটে ভিসার জন্য আবেদন করেন।
উল্লেখ্য, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বর্তমানে সিঙ্গেল-এন্ট্রি ভিসার ফি ৩,০০০ ইয়েন থেকে বেড়ে ১৫,০০০ ইয়েন এবং মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসার ফি ৬,০০০ ইয়েন থেকে বেড়ে ৩০,০০০ ইয়েন নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ট্রানজিট ভিসার ফি ৭০০ ইয়েন করা হয়েছে।



