একসময় বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় ড্রয়িংরুমে হিন্দি সিরিয়াল বা দূরদর্শনের নাটক দেখার চল ছিল। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। টেলিভিশনের বদলে জেনারেশন জি ও জেনারেশন আলফার বিনোদনের বড় অংশ এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন স্ট্রিমিংয়ে। সেখানে ক্রমেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার কে-ড্রামা ও কে-পপ।
দক্ষিণ কোরিয়ার এই সাংস্কৃতিক বিস্তার বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘হালিউ’ বা ‘কোরিয়ান ঢেউ’ নামে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব এখন শুধু বিনোদনে সীমাবদ্ধ নেই। শহুরে তরুণদের পোশাক, খাবার, রূপচর্চা এবং পুরুষের সৌন্দর্য ও গ্রুমিংয়ের ধারণাতেও দেখা যাচ্ছে কোরিয়ান সংস্কৃতির ছাপ।
করোনাকালে শুরু, বন্ধুদের আড্ডায় বিস্তার
বাংলাদেশে কে-ড্রামার জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে ২০২০ সালের করোনাকালে। অনলাইন ক্লাসের কারণে শিক্ষার্থীদের হাতে ট্যাব, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ে। পাশাপাশি বন্ধুদের আলোচনায় কে-ড্রামা ও কে-পপ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। কৌতূহল থেকে শুরু করে অনেকের কাছে তা পরে নিয়মিত দেখার অভ্যাসে পরিণত হয়।
হিন্দি সিরিয়াল বা বাংলা নাটকের বদলে কে-ড্রামার প্রতি তরুণদের আগ্রহের কারণও ভিন্ন ভিন্ন। ২২ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ফারজানা শুচি বলেন, হিন্দি নাটকের অতিনাটকীয়তা এখন আর তাকে টানে না। তার কাছে কে-ড্রামার গল্প তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত এবং নিজের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষ করে পুরুষ চরিত্রগুলোর কোমল আচরণ, আবেগ প্রকাশে স্বচ্ছন্দতা এবং নারীদের প্রতি যত্নশীল দৃষ্টিভঙ্গি তাকে আকর্ষণ করে।
তবে কে-ড্রামার দর্শক শুধু তরুণীরা নন। থ্রিলার, মেডিকেল ড্রামা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা পারিবারিক গল্পের মতো নানা বিষয়ের কারণে তরুণ পুরুষ ও মিলেনিয়াল দর্শকদের মধ্যেও এর জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে।
পর্দা ছাড়িয়ে পোশাক ও খাবারের টেবিলে
কে-ড্রামার প্রভাব এখন শুধু পর্দায় নেই। নাটকের চরিত্রগুলোর পোশাক ও জীবনযাপনের ধরনও তরুণদের রুচিতে প্রভাব ফেলছে। হাই-ওয়েস্ট প্যান্ট, ক্রপ টপ, বড় সাইজের ওভারকোট, ঢিলেঢালা টি-শার্ট ও ওভারসাইজড জ্যাকেট তরুণদের ফ্যাশনে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
খাবারের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে একই প্রবণতা। ঢাকার রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন ফুড ফেস্টিভ্যালে কিমচি, বিবিম্বাপ ও রামেনের উপস্থিতি বেড়েছে। এর মধ্যে কিমচির ঝাঁঝালো স্বাদ বাঙালি খাবারের সঙ্গে কিছুটা মিল থাকায় তরুণদের মধ্যে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে।
কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে রূপচর্চাতেও। সিরাম, শিট মাস্কসহ বিভিন্ন কে-বিউটি পণ্য তরুণীদের রূপচর্চার নিত্যব্যবহারের অংশ হয়ে উঠেছে।
বদলাচ্ছে পুরুষের সৌন্দর্যের ধারণা
কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রভাব শুধু নারীদের ফ্যাশন বা রূপচর্চায় সীমাবদ্ধ নয়। বদলাচ্ছে পুরুষের সৌন্দর্য ও গ্রুমিংয়ের ধারণাও। একসময় পুরুষালি সৌন্দর্যের সঙ্গে পেশিবহুল শরীর কিংবা দাড়ি-গোঁফকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। কে-পপ আইডল ও কে-ড্রামার অভিনেতাদের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সেই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। ত্বকের যত্ন, চুলের পরিচর্যা ও পরিপাটি পোশাক এখন পুরুষদের মধ্যেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ফেসওয়াশ, সিরাম কিংবা সানস্ক্রিন ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো আর শুধু নারীদের রূপচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
কোরিয়ান ঢেউয়ের নেপথ্যে দীর্ঘ পরিকল্পনা
কে-ড্রামা ও কে-পপের বিশ্বব্যাপী বিস্তারে ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১২ সালে সাইয়ের ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ ইউটিউবে এক বিলিয়ন ভিউ পাওয়া প্রথম ভিডিও হয়ে যে বৈশ্বিক আলোড়ন তৈরি করেছিল, সেটি কোরিয়ান পপসংগীতের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনাও সামনে আনে। পরে বিটিএস, ব্ল্যাকপিংক ও এক্সোর মতো ব্যান্ড সেই পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি হালিউ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে, অনলাইন ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কোরিয়ান কনটেন্ট ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তবে হালিউয়ের বিস্তারকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক নীতি ও পরিকল্পিত শিল্পায়ন।
নব্বইয়ের দশক থেকেই দক্ষিণ কোরিয়া সংস্কৃতিকে রপ্তানিযোগ্য শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ভাষা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো কার্যক্রমে ধারাবাহিক বিনিয়োগের পাশাপাশি ২০২৪ সালে হালিউ শিল্প ও সংশ্লিষ্ট খাতকে টেকসই করার জন্য দেশটি আলাদা আইনি কাঠামোও তৈরি করে।
অন্যদিকে সহজলভ্য সাবটাইটেল ও অনুবাদ কোরিয়ান কনটেন্টের ভাষাগত বাধা কমিয়েছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমও দর্শকের আগ্রহ অনুযায়ী একই ধরনের আরও কনটেন্ট সামনে আনছে। একটি ড্রামা দেখার পর কাছাকাছি ধরনের আরও কনটেন্ট দর্শকের সামনে হাজির হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়তো কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি প্রথম কৌতূহল তৈরি করেছে, কিন্তু দর্শকদের ধরে রাখার পেছনে গল্প, নির্মাণ ও বিষয়বৈচিত্র্যের ভূমিকা কম নয়।
ফলে বাংলাদেশের তরুণদের কাছে হালিউ এখন আর শুধু একটি বিনোদনধারা নয়। কে-ড্রামা ও কে-পপের মধ্য দিয়ে কোরিয়ান সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে পোশাক, খাবার, রূপচর্চা ও দৈনন্দিন যাপনে। টেলিভিশন ও অনলাইন পর্দা পেরিয়ে এই সাংস্কৃতিক ঢেউ এখন তরুণদের রুচি ও জীবনযাপনেরও অংশ হয়ে উঠছে।