শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় সবার খাদ্যতালিকাতেই পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ডিম রাখার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। তবে ডিম নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনও নানা ধরনের ভুল ধারণা ও প্রশ্ন রয়েছে।
ডিম খেলে কি কোলেস্টেরল বাড়ে? দিনে কতটি ডিম খাওয়া নিরাপদ? উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগির ডিম ভালো, নাকি ব্রয়লার মুরগির ডিম? কাঁচা ডিম খাওয়া উচিত কি না, কিংবা ডিমের কুসুম খেলে হার্টের সমস্যা বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে কি না - এমন নানা প্রশ্নও রয়েছে।
এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে ডায়েটারি কনসালট্যান্ট ও পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ কুমারের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি।
বিবিসির প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ডিমে কী কী পুষ্টি রয়েছে?
ডা. অরুণ কুমার জানান, একটি ডিমে প্রায় ৬০ ক্যালোরি এবং প্রায় ৬ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। তার ভাষ্য, ডিমের প্রোটিনকে উচ্চমানের বলা হয়, কারণ এর শরীরে শোষিত হওয়ার ক্ষমতা ১০০%। ডিমে থাকা পুষ্টি উপাদানগুলোও সহজেই শরীর হজম করে তা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে।
এ কারণেই প্রোটিনের কার্যকারিতা যাচাইয়ের সময় ডিমের প্রোটিনকে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। একই কারণে ডিমের প্রোটিনকে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা শ্রেষ্ঠ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ডিমের কুসুম কি ক্ষতিকর?
ডিম নিয়ে প্রচলিত একটি ধারণা হলো, শুধু ডিমের সাদা অংশই শরীরের জন্য ভালো। তবে ডা. অরুণ কুমার বলছেন, ডিমের সাদা অংশের পাশাপাশি কুসুমেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন রয়েছে। তাই শুধু সাদা অংশেই প্রোটিন থাকে - এ ধারণা ঠিক নয়।
ডিমের কুসুমে কোলিন নামের একটি পুষ্টি উপাদান থাকে, যা স্নায়ুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভবতী নারী ও গর্ভে থাকা ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধির জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন নামের প্রাকৃতিক হলুদ বা কমলা রঙের উদ্ভিদ রঞ্জক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এগুলো স্নায়ু শক্তিশালী করা এবং চোখ ভালো রাখার জন্য প্রয়োজনীয়। এছাড়া ডিম থেকে ভিটামিন ডিসহ আরও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
‘দ্য ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন’ (এনসিবিআই)-এর একটি গবেষণায়ও বলা হয়েছে, ডিমে কোলিন, ফোলেট, ভিটামিন ডি, আয়োডিন, বি ভিটামিন এবং উৎকৃষ্ট মানের প্রোটিন রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থাও এখন ডিম খাওয়াকে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি বা হৃদরোগের কারণ হিসেবে বিবেচনা করে না।
দিনে কতটি ডিম খাওয়া যায়?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিশুর বয়স ছয় মাস হলে তাকে অল্প পরিমাণে ডিম খাওয়ানো যেতে পারে। তবে দিনে কতটি ডিম খাওয়া যাবে, তা ব্যক্তির বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী -
- শিশুদের প্রতিদিন একটি থেকে দুটি ডিম দেওয়া যেতে পারে।
- গর্ভবতী নারীরা সর্বোচ্চ দুটি ডিম খেতে পারেন।
- কোলিনের উপস্থিতির কারণে বয়স্কদের স্নায়ুতন্ত্রের জন্য প্রায় দুটি ডিম উপকারী।
- যারা ব্যায়াম করেন এবং অতিরিক্ত প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, তারা দিনে তিন থেকে চারটি ডিম খেতে পারেন।
- বেশিরভাগ মানুষ প্রতিদিন একটি থেকে দুটি ডিম খেতে পারেন। এক্ষেত্রে দুটি ডিম বলতে কুসুমসহ পুরো ডিম খাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ডিমের কুসুমে কি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে?
অনেকের ধারণা, ডিমের কুসুমে বেশি পরিমাণ কোলেস্টেরল থাকে। ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডা. অরুণ কুমার বলেন, “একটি ডিমের কুসুমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। তবে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রক্তে থাকা সব কোলেস্টেরল খাবার থেকেই আসে - এ ধারণা ঠিক নয়।”
তার মতে, শরীরের স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রতিদিন প্রায় ২,০০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল প্রয়োজন হয়, যা প্রায় ১০টি ডিমের সমান। শরীরের প্রয়োজনীয় এই কোলেস্টেরল যকৃতেই তৈরি হয়। ফলে কেউ দিনে দুটি ডিম খেলে এবং সেখান থেকে ৪০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল শরীরে গেলে যকৃত নিজে থেকেই ৪০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল উৎপাদন কমিয়ে দেয়। তবে শুধু ডিমেই কোলেস্টেরল থাকে না; দুধ, দুগ্ধজাত খাবার ও মাংসেও কোলেস্টেরল রয়েছে।
রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল থাকলে এলডিএল বা লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে - এমনটা বলা হলেও বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে বলে জানান তিনি।
তার মতে, বিষয়টি কিছুটা সত্যি ধরে নিলেও ডিম থেকে পাকস্থলীতে যাওয়া কোলেস্টেরল রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি বাড়ায় না। এ কারণেই ডিমের কুসুম না খাওয়ার বিষয়ে আগের কড়াকড়ি এখন আর নেই বা নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। হৃদরোগীরাও প্রতিদিন একটি থেকে দুটি ডিম খেতে পারেন।
কোলেস্টেরল মূলত দুই ধরনের - লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল এবং হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এইচডিএল। কোষে চর্বি বহন করে এলডিএল। রক্তে এর মাত্রা বেশি থাকলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণে এলডিএলকে ‘ব্যাড কোলেস্টেরল’ বলা হয়।
এলডিএলের মাত্রা বেশি হলে ধমনিতে ‘প্লাক’ বা চর্বি জমতে থাকে। এতে রক্ত চলাচলের পথ সরু হয়ে যায় এবং ধমনির নমনীয়তা কমে। ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, এইচডিএল ‘গুড কোলেস্টেরল’ নামে পরিচিত। এটি এমন একটি স্বাস্থ্যকর মাত্রা তৈরি করে, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করতে পারে।
ডা. অরুণ কুমার বলেন, “ফ্যামিলিয়াল হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া নামের অত্যন্ত বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে কোলেস্টেরল হজম বা প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে। ফলে তাদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।”
এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডিমের কুসুম খাওয়া কমিয়ে দেওয়া বা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত। তবে অন্যরা সাধারণত নির্ভয়ে ডিমের কুসুম খেতে পারেন।
ডিমের কুসুম খেলে জন্ডিস বা কিডনির ক্ষতি হয় - এমন ধারণাকেও ভ্রান্ত বলে জানিয়েছেন ডা. কুমার।
এনসিবিআইয়ের ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ডিমে কোলেস্টেরল বেশি থাকায় রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি ঠেকাতে বহু বছর ধরে কম ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি বাড়ায় না এবং রক্তনালিতে চর্বি জমার ঝুঁকিও কমায়।
ব্রয়লার মুরগির ডিম কি কম ভালো?
উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগির ডিম ভালো, নাকি ব্রয়লার মুরগির ডিম - এ নিয়েও অনেকের প্রশ্ন রয়েছে। ডা. অরুণ কুমারের মতে, দুই ধরনের ডিমেই প্রায় একই পরিমাণ প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগি সাধারণত প্রাকৃতিক খাবার খেয়ে বড় হয়। ফলে তাদের ডিমে ক্যারোটিনয়েডের পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকতে পারে। এ কারণে এসব ডিমের কুসুম তুলনামূলক গাঢ় হলুদ ও ঘন দেখায়। অন্যদিকে, পোল্ট্রি ফিড খাওয়ানো ব্রয়লার মুরগির ডিমের কুসুমের রং তুলনামূলক হালকা হয়। পোকামাকড় ও ঘাসের মতো প্রাকৃতিক খাবারের কারণে উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগির ডিমে ওমেগা-৩-এর পরিমাণও কিছুটা বেশি থাকতে পারে।
তবে এই সামান্য পার্থক্য ছাড়া দুই ধরনের ডিমের মধ্যে বড় কোনো পার্থক্য নেই। দুটিতেই প্রোটিনের পরিমাণ একই।
ক্যারোটিনয়েড এক ধরনের প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ, যার কারণে ডিমের কুসুম হলুদ-কমলা রঙের হয়। এই রঙের সঙ্গে মুরগি কী ধরনের খাবার খাচ্ছে, তার সম্পর্ক রয়েছে।
ডা. কুমার বলেন, “শুধু প্রোটিনের জন্য ডিম খেলে ব্রয়লার মুরগির ডিম খাওয়ায় কোনো ক্ষতি নেই। এক্ষেত্রে দুই থেকে তিন গুণ বেশি টাকা খরচ করে ফ্রি-রেঞ্জ ডিম কেনার প্রয়োজন নেই।”
মুরগিকে কি হরমোন দেওয়া হয়?
মুরগিকে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয় - এমন ধারণাও অনেক দিন ধরে প্রচলিত।
ডা. অরুণ কুমার জানান, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটি একটি ভুল ধারণা। হরমোন দিয়ে মুরগি পালন করা যায় না। তার মতে, এমনটা করতে গেলে খরচও অনেক বেশি হবে। বাস্তবে মুরগির রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়। অনেকেই এই টিকাকে হরমোন ইনজেকশন বলে ভুল করেন।
ডিম বা মুরগির মাংস খাওয়ার কারণে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি বা পিউবার্টি আগে হয় - এমন ধারণার পক্ষেও কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলে জানান তিনি।
ডা. কুমার বলেন, “বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে গত ১০০ বছরে সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী পরিবারগুলোর মেয়েদেরও বয়ঃসন্ধির গড় বয়স কমেছে। তাই বাছুরের মাংস বা ব্রয়লার মুরগির ডিম খাওয়ার সঙ্গে মেয়েদের অকাল বয়ঃসন্ধির কোনো সম্পর্ক নেই।”
ডিম খেলে কি গ্যাস হয়?
ডা. অরুণ কুমারের মতে, ডিমের কুসুম খাওয়ার পর শুরুতে কারও কারও সামান্য অস্বস্তি হতে পারে। তবে একবার ডিম খাওয়ার সঙ্গে শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেলে এ সমস্যা ধীরে ধীরে পুরোপুরি দূর হয়ে যায়।
কাঁচা ডিম খাওয়া কি নিরাপদ?
কাঁচা ডিম খাওয়া সবসময় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. অরুণ কুমার। কারণ কাঁচা ডিমে ‘সালমোনেলা’ নামের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা ডায়রিয়ার মতো গুরুতর পেটের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া কাঁচা ডিমে ‘অ্যাভিডিন’ নামের একটি প্রাকৃতিক প্রোটিন থাকে। এটি শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘বায়োটিন’ শোষণে বাধা দেয়। এর ফলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই কাঁচা ডিম পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তবে ডিম সেদ্ধ, হাফ বয়েল বা ভাজা - যেভাবেই খাওয়া হোক, তাতে খুব একটা পার্থক্য হয় না বলেও জানিয়েছেন ডা. কুমার।
সব মিলিয়ে ডিম নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা বা সংশয়ের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। অতিরিক্ত ওজন বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্যও ডিম উপকারী। তাই কোনো দ্বিধা ছাড়াই সবার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ডিম রাখা উচিত বলে জানিয়েছেন তিনি।