Wednesday, September 30, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অল্প বয়সেই কেন হঠাৎ মৃত্যু, জেনে নিন কারণ

বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও নানা রোগ নীরবে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে 

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

অল্প বয়সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যু - প্রায়ই এরকম ঘটনা শোনা যায়। বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ কিংবা ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ নীরবে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১% হচ্ছে স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদ্‌রোগ, ক্রনিক রেসপিরেটরি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ক্যান্সার ও কিডনি জটিলতার মতো রোগে। এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যুও বাড়ছে। এই ৭১% মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই আকস্মিক বা অকালমৃত্যু। 

বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। 

অসংক্রামক রোগকে সাধারণত বয়স্কদের সমস্যা মনে করা হলেও প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় ৭০ বছর বয়স হওয়ার আগেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এসব অকালমৃত্যুর প্রায় ৮২% ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এক গবেষণা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, প্রতি বছর ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী দেড় কোটি মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যান।

অল্প বয়সে আকস্মিক বা অকালমৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান পাঁচটি রোগ হলো - 

হৃদ্‌রোগ বা হার্ট অ্যাটাক

হৃদ্‌রোগের মধ্যে বিশেষ করে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বাংলাদেশে ধীরে ধীরে মহামারির রূপ নিচ্ছে বলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিউরও বাড়ছে।

হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্রম ঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য হার্টে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ প্রয়োজন। হার্টে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে রক্ত হার্টে পৌঁছাতে পারে না। ফলে হৃদ্‌পেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না এবং তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়। হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জন্য আগে থেকেই অসুস্থ থাকা জরুরি নয়। আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষেরও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের প্রথম উপসর্গ হলো বুকে ব্যথা। সাধারণত বুকের মাঝ বরাবর এ ব্যথা হয়, যাকে চিকিৎসকেরা ‘সেন্ট্রাল চেস্ট পেইন’ বলেন। এ ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং একসময় বাম হাত ও ঘাড়ের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া চোয়াল ও পিঠে ব্যথা, পেটে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব ও বমিও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

স্ট্রোক

হৃদ্‌রোগের পর স্ট্রোক মৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ। অনেকে স্ট্রোকের সঙ্গে হার্ট অ্যাটাককে গুলিয়ে ফেলেন। তবে দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কে আঘাত হানে। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলো মারা গেলে স্ট্রোক হয়। কোনো কারণে মস্তিষ্কের কোষে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হলে, রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়।

সাধারণত ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকলেও ইদানীং তরুণ এমনকি শিশুরাও স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। স্ট্রোক তিন ধরনের - মাইল্ড স্ট্রোক, ইসকেমিক স্ট্রোক ও হেমোরেজিক স্ট্রোক। স্ট্রোক মস্তিষ্কে কতটা ক্ষতি করবে, তা নির্ভর করে এটি মস্তিষ্কের কোথায় ঘটেছে এবং কতটা জায়গাজুড়ে হয়েছে তার ওপর।

তবে এখানে সবচেয়ে জরুরি হলো সময়। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে মৃত্যুর মুখ থেকে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। চিকিৎসকেরা বলছেন, রোগী যত দ্রুত চিকিৎসা পাবেন, ক্ষতির আশঙ্কা ততই কমবে।

স্ট্রোকের সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো:

  • আচমকা হাত, পা বা শরীরের কোনো একটি দিক অবশ হয়ে যাওয়া এবং হাত ওপরে তুলতে না পারা
  • চোখে ঝাপসা দেখা
  • কথা বলতে অসুবিধা হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়া
  • ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়া
  • জিহ্বা অসাড় হয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া
  • শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানো
  • বমি বমি ভাব, বমি ও খিঁচুনি হওয়া

ডায়াবেটিস

বাংলাদেশে সব বয়সী মানুষের মধ্যেই ডায়াবেটিসের হার বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা এক কোটি ৩৮ লাখেরও বেশি। ডায়াবেটিস রোগীর মোট সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে। আইডিএফের এক অনুমান অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে এই অবস্থান সাত নম্বরে চলে যাবে। তখন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেড়ে দুই কোটি ২৩ লাখে পৌঁছাতে পারে।

সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে ৪৩% মানুষই জানেন না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অর্থাৎ তারা রোগ নির্ণয়ের বাইরে রয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ ২০২২ সালে দেশের আটটি বিভাগে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রতি ১০০ তরুণ-তরুণীর মধ্যে সাতজনেরও ডায়াবেটিস রয়েছে। পুরুষদের তুলনায় তরুণ নারীরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন বলেও ওই গবেষণায় পাওয়া গেছে।

অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা এবং উচ্চ রক্তচাপ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পৃক্ত বলে জানিয়েছে আইডিএফ।

দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ

সাধারণত অ্যাজমা এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা ফুসফুসজনিত রোগে মানুষ আক্রান্ত হন। বাংলাদেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোগী জানতেই পারেন না যে তারা অনিরাময়যোগ্য ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছেন।

এ রোগের হার শহুরে মানুষের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। গোবর, ঘুঁটে, লাকড়ির মতো জ্বালানির ব্যবহার এবং ধূমপান দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আইইডিসিআরের গবেষণায় দেখা গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩০%-এর বেশি মানুষ ফুসফুসজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নারীর তুলনায় পুরুষরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন।

ক্যান্সার

বাংলাদেশে প্রতিবছরই ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, বাংলাদেশে মৃত্যুর ষষ্ঠতম কারণ ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে ভুগে এক লাখ ১৬,৫০০ জনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন ১ লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি মানুষ। যদিও বাস্তবে সংখ্যাটি আরও বেশি হবে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

শুধু ঢাকার জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেই গত বছর সাড়ে ৪২,০০০-এর মতো ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩১,০০০ হলো নতুন রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে বর্তমানে  ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১১% বেশি। একই সময়ে ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় ৮%।

পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ও মুখের এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার বেশি দেখা যায়। গত বছর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় পাওয়া গেছে, বছরে ১১.৯% মৃত্যুর কারণ ক্যান্সার। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৩৮ ধরনের ক্যান্সার থাকলেও ফুসফুসের ক্যান্সার, কণ্ঠনালীর ক্যান্সার এবং পাকস্থলীর ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ। গবেষণায় যে পাঁচটি ক্যান্সার বেশি দেখা গেছে, তার মধ্যে ছিল স্তন ক্যান্সার, ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার, পাকস্থলীর ক্যান্সার, কণ্ঠনালীর ক্যান্সার এবং সার্ভিক্স ক্যান্সার।

রোগের কারণ ও প্রতিরোধ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনযাপনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন, তামাক ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, বায়ুদূষণসহ নানা কারণ ইদানীং তুলনামূলকভাবে কম বয়সীদের মধ্যে আকস্মিক মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয় করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা - এই তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য নয়। তাই রোগ মোকাবিলায় সুস্থ থাকার জন্য ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন - 

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

আর্লি ডিটেকশন (প্রাথমিক রোগ নির্ণয়): উপসর্গ বা লক্ষণ গুরুত্ব দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব রোগ নির্ণয় করা গেলে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। এজন্য নিয়মিত রক্তচাপ, ডায়াবেটিস পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা ইত্যাদি করা দরকার।

জরুরি স্বাস্থ্যসেবা: জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কমিয়ে আনা যাবে।

   

About

Popular Links

x