বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আকাশে উড়তে পারাটাই ছিল বড় অর্জন। তখন বিমান নিরাপদে মাটিতে ফিরিয়ে আনাও ছিল পাইলটদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সময় থেকেই আকাশে নানা কসরত দেখিয়ে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়। পরে উড়ন্ত বিমানের ডানায় হাঁটা ও এক বিমান থেকে অন্য বিমানে যাওয়ার মতো দুঃসাহসিক কসরতের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয়তা পায় উইং ওয়াকিং।
ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান অ্যারোসুপারব্যাটিকসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইতিহাসবিষয়ক এক নিবন্ধে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান নির্মাণ প্রযুক্তি ও পাইলটদের দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। যুদ্ধ শেষে অব্যবহৃত শত শত বিমান তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছিল। এসব বিমান কিনে তরুণ দুঃসাহসীরা আকাশে নানা কসরত দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ নেন। এভাবেই গড়ে ওঠে আকাশে উড্ডয়ন ও কসরত প্রদর্শনকারী দল, যা ‘ফ্লাইং সার্কাস’ নামে পরিচিতি পায়।
এসব প্রদর্শনীতে দর্শকেরা কয়েক শিলিং বা ডলারের বিনিময়ে বিমানে চড়ার সুযোগ পেতেন। পাশাপাশি পাইলটেরা আকাশে বিপজ্জনক লুপ, রোল ও উল্টো হয়ে ওড়ার মতো কসরত দেখাতেন। দর্শকদের আকর্ষণ ধরে রাখতে ক্রমেই আরও ব্যতিক্রমী ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল যুক্ত হতে থাকে।
১৯১৮ সালে অর্মার লকলিয়ার নামের এক মার্কিন বৈমানিক উড়ন্ত বিমানের ডানায় হাঁটার কৌশল দেখিয়ে দর্শকদের চমকে দেন। তিনি বিমানের ককপিট থেকে বেরিয়ে ডানায় হাঁটতেন। এমনকি এক বিমান থেকে অন্য বিমানেও উঠে যেতেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষণের মধ্যে বিমানের কারিগরি সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে লকলিয়ার প্রথম ককপিটের বাইরে বের হয়েছিলেন বলে জানা যায়। পরে সেই অভিজ্ঞতাকেই তিনি দর্শকদের সামনে দুঃসাহসিক প্রদর্শনী হিসেবে তুলে ধরেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই উইং ওয়াকিং ফ্লাইং সার্কাসের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়। লকলিয়ারের পাশাপাশি আরও অনেকে এ ধরনের কসরত দেখাতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইথেল ডেয়ার্স, যিনি বিশ্বের প্রথম নারী উইং ওয়াকার হিসেবে পরিচিত। লকলিয়ারের মতো তিনিও এক বিমান থেকে অন্য বিমানে যাওয়ার কসরত দেখাতেন।
নিরাপত্তা ছাড়াই চলত ঝুঁকিপূর্ণ প্রদর্শনী
শুরুর দিকে উইং ওয়াকিংয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত। অংশগ্রহণকারীদের শরীরে প্যারাস্যুট থাকত না, এমনকি বিমানের সঙ্গে আটকে রাখার জন্য নিরাপত্তা তারও ব্যবহার করা হতো না। ফলে সামান্য পা পিছলে গেলেই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল।
এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাননি অর্মার লকলিয়ারও। একটি চলচ্চিত্রের কাজে অংশ নেওয়ার সময় তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন।
১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ উইং ওয়াকারদের জন্য প্যারাস্যুট পরা বাধ্যতামূলক করে। তবে তত দিনে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং ফ্লাইং সার্কাসের স্বর্ণযুগও শেষের দিকে চলে আসে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিমান চলাচলের লক্ষ্য ও প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন আসে। শব্দের গতিসীমা অতিক্রম, মহাকাশ অনুসন্ধান এবং দ্রুত ও আরামদায়ক যাত্রীবিমান তৈরির দিকে মনোযোগ বাড়ে। সাধারণ মানুষের কাছেও বিমান ভ্রমণ ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে।
তবে আকাশে দুঃসাহসিক কসরত দেখানোর ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিমান চলাচলের ইতিহাস ও পুরোনো দিনের প্রদর্শনী ধরে রাখতে আগ্রহী কিছু দল উইং ওয়াকিং চালু রাখে। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি দল এ ধরনের প্রদর্শনী শুরু করে।
১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে ভিক নরম্যানের প্রতিষ্ঠিত অ্যারোসুপারব্যাটিকস উইং ওয়াকিং দল ইউরোপে এ প্রদর্শনীকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তোলে। উড়ন্ত বিমানের ডানায় দাঁড়িয়ে হাতের ওপর ভর দিয়ে শরীর উল্টো করা কিংবা বিমান উল্টোভাবে ওড়ার সময় ডানায় অবস্থান করার মতো কসরত দর্শকদের আকর্ষণ করতে থাকে।
বর্তমানে উইং ওয়াকাররা বোয়িং স্টিয়ারম্যান বাইপ্লেনের সঙ্গে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত থাকেন। এতে আগের তুলনায় ঝুঁকি কমেছে। তবে বিমানের ডানায় দাঁড়িয়ে বাতাসের প্রবল চাপের মধ্যে কসরত দেখানোর রোমাঞ্চ, শব্দ ও দর্শনীয় পরিবেশ এখনো প্রায় এক শতাব্দী আগের ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।