একটি নতুন পরিবারে পা রাখা মানে শুধু নতুন ঠিকানায় বসবাস শুরু করা নয়; বরং নতুন কিছু সম্পর্কের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, ভিন্ন অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং ধীরে ধীরে একগুচ্ছ মানুষকে আপন করে নেওয়া। এই নতুন সম্পর্কগুলোর মধ্যে শাশুড়ির সঙ্গে সম্পর্কটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কখনো তিনি মায়ের মতো স্নেহশীল, কখনো বন্ধুর মতো কাছের মানুষ, আবার কখনো প্রত্যাশার অমিল, ভুল-বোঝাবুঝি ও অভিমানের কারণে তৈরি হয় দূরত্ব। তবে আন্তরিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া থাকলে এই সম্পর্কও হয়ে উঠতে পারে ভালোবাসার এক সুন্দর আশ্রয়।
আজ ২৫ অক্টোবর, জাতীয় শাশুড়ি দিবস। প্রতি বছর অক্টোবরের চতুর্থ রবিবার দিবসটি পালিত হয়। পরিবারের এই গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়াই দিবসটির মূল ভাবনা।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক জিন হাও ১৯৩৪ সালে টেক্সাসের আমেরিলো শহরে শাশুড়িদের সম্মানে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে অক্টোবরের শেষ রোববারে দিবসটি পালনের রীতি প্রচলিত হয়। তবে এটি মূলত একটি অনানুষ্ঠানিক দিবস, সরকারি জাতীয় দিবস হিসেবে এর স্বীকৃতির বিষয়টি এক নয়।
সম্পর্কের গল্পে থাকুক মমতা ও সম্মান
শাশুড়ি ও পুত্রবধূ কিংবা জামাই ও শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে সমাজে নানা ধরনের ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কোথাও এই সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক, কোথাও আবার পারিবারিক সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সংসারের দায়িত্ব কিংবা প্রজন্মগত চিন্তাভাবনার পার্থক্য থেকে তৈরি হয় জটিলতা। তবে সব সম্পর্ককে একই ছাঁচে বিচার করার সুযোগ নেই। অনেক শাশুড়ি নতুন পরিবারের সদস্যকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন, বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ান, অসুস্থতায় যত্ন নেন কিংবা অভিজ্ঞতা দিয়ে পথ দেখান। একইভাবে অনেক পুত্রবধূ ও জামাইও শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি দায়িত্বশীল ও যত্নশীল ভূমিকা পালন করেন।
একটি সম্পর্ক সুন্দর হয়ে ওঠার জন্য শুধু ভালোবাসা থাকলেই হয় না, প্রয়োজন একে অপরের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা। শাশুড়ির কাছে সংসার চালানোর অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক রীতিনীতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, নতুন দম্পতি নিজেদের পছন্দ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসার গুছিয়ে নিতে চাইতে পারেন। দুই পক্ষের এই চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে, তবে সেই পরামর্শ গ্রহণের স্বাধীনতাও থাকতে হবে। একইভাবে নতুন প্রজন্মেরও উচিত প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে অবহেলা না করা।
গবেষণায় সম্পর্কের জটিলতা ও সম্ভাবনা
শাশুড়ি-পুত্রবধূর সম্পর্ক নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায়ও ইতিবাচক ও নেতিবাচক, দুই ধরনের অভিজ্ঞতার চিত্র উঠে এসেছে।
সমাজবিজ্ঞানী কীরা অ্যালেনডর্ফের “লাইক হার ওন: আইডিয়াল্স অ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্সেস অভ দ্য মাদার-ইন-ল’ / ডটার-ইন-ল’ রিলেশনশিপ” শীর্ষক গবেষণায় ভারতের একটি গ্রামের ২২টি পরিবারের ৪৬ জন সদস্যের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, কিছু নারীর মধ্যে শাশুড়ি-পুত্রবধূর সম্পর্ক ছিল স্নেহপূর্ণ ও ঘনিষ্ঠ; আবার অন্যদের অভিজ্ঞতায় ছিল কষ্টদায়ক কথাবার্তা, দূরত্ব ও যোগাযোগের অভাব। গবেষণাটি দেখায়, সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক ধারণা অনেক সময় নেতিবাচক হলেও বাস্তবে অভিজ্ঞতা একরকম নয়।
২০১৯ সালে ‘সোশ্যাল ওয়ার্ক রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ৩৫১ জন নারীর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শাশুড়ির সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে পারিবারিক সম্পর্কের সীমারেখা, পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা কীভাবে শাশুড়ি-পুত্রবধূর সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে, তা তুলে ধরা হয়।
গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হওয়ায় এর ফল বাংলাদেশের সব পরিবারের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। তবে গবেষণাগুলো থেকে বোঝা যায়, পারস্পরিক যোগাযোগ, প্রত্যাশার স্বচ্ছতা এবং পরিবারের সদস্যদের অবস্থান বোঝার চেষ্টা সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানের বিয়ের পর বদলায় মায়ের ভূমিকা
সন্তানের বিয়ের পর মায়ের জীবনেও পরিবর্তন আসে। এত দিন যে সন্তানকে ঘিরে তাঁর দৈনন্দিন জীবন, যত্ন ও সিদ্ধান্তের বড় অংশ আবর্তিত হয়েছে, বিয়ের পর সেই সন্তানের জীবনে নতুন একজন মানুষের উপস্থিতি তৈরি হয়। এতে আনন্দের পাশাপাশি কখনো নিজের গুরুত্ব কমে যাওয়ার ভয়, একাকিত্ব কিংবা আগের মতো সময় না পাওয়ার আক্ষেপও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, নতুন দম্পতিও নিজেদের সংসার গুছিয়ে নেওয়া, ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করা এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এই পরিবর্তনকে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে সম্পর্কের জটিলতা বাড়তে পারে। মা ও জীবনসঙ্গীর ভালোবাসা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; সম্পর্ক দুটির ধরন আলাদা। সন্তানের জীবনে নতুন মানুষ আসার অর্থ মায়ের প্রতি ভালোবাসা কমে যাওয়া নয়। আবার মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করার অর্থও এই নয় যে দম্পতির প্রতিটি সিদ্ধান্তে অন্য কাউকে যুক্ত থাকতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সন্তানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের অনুভূতি ও অবদানকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জীবনসঙ্গীর মতামত, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। কোনো মতবিরোধ দেখা দিলে এক পক্ষের কথা শুনে অন্য পক্ষকে দোষারোপ না করে উভয়ের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। স্পষ্ট ও শান্তভাবে কথা বলার অভ্যাস অনেক ভুল-বোঝাবুঝি দূর করতে পারে।
ভালোবাসা প্রকাশে বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই
শাশুড়ির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দামি উপহার কিংবা জমকালো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। একটি ফোনকল, আন্তরিকভাবে খোঁজ নেওয়া, একসঙ্গে বসে চা খাওয়া কিংবা তার পছন্দের খাবার তৈরি করাও আনন্দের উপলক্ষ হতে পারে। তিনি পরিবারের জন্য যে কাজগুলো করেন, সেগুলোর স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁর অভিজ্ঞতা ও পরামর্শের মূল্য বোঝানোও গুরুত্বপূর্ণ।
শাশুড়ি দিবসে তার পছন্দের কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। তিনি যে রান্নাটি ভালো করেন, সেটি তাঁর কাছ থেকে শিখতে চাওয়া কিংবা পুরোনো পারিবারিক স্মৃতি নিয়ে গল্প করাও হতে পারে সুন্দর উদ্যোগ। পরিবারের সবাই মিলে ছবি তোলা, একসঙ্গে সময় কাটানো অথবা ছোট্ট একটি উপহার দেওয়ার মধ্য দিয়েও দিনটিকে স্মরণীয় করে তোলা সম্ভব।
তবে সম্পর্ক সুন্দর রাখার দায়িত্ব শুধু একটি বিশেষ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভুল হলে তা স্বীকার করার মধ্য দিয়েই সম্পর্কের ভিত মজবুত হয়।