অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলে বিষাক্ত সীসা, কী ব্যবহার করবেন স্বাস্থ্যসম্মত রান্নায়

সম্প্রতি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না করা খাবারে পাওয়া গেছে অতিমাত্রায় বিষাক্ত সীসা। 

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এক যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)।

বিশেষ করে অ্যালুমিনিয়ামের নতুন হাঁড়িতে রান্নায় এ ঝুঁকি আরও বেশি বলেও উঠে এসেছে ওই গবেষণায়। 

তাহলে রান্নার জন্য কোন ধরনের হাঁড়ি-পাতিল সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত?

রান্নার পাত্র বেছে নেওয়ার সময় শুধু দাম, নকশা কিংবা ব্যবহারের সুবিধা দেখলেই চলে না। পাত্রটি কী উপাদান দিয়ে তৈরি, উচ্চ তাপে কতটা নিরাপদ এবং রান্নার সময় এর কোনো উপাদান খাবারে মিশতে পারে কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনা করা জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রান্নার সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান “মেড ইন কুকওয়্যার” তাদের ওয়েবসাইটে রান্নার জন্য চার ধরনের পাত্রকে স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছে। 

এদের তথ্য অনুযায়ী, রান্নার জন্য উপযোগী চার ধরনের পাত্র হলো স্টেইনলেস ক্ল্যাড, সিরামিক প্রলেপযুক্ত ননস্টিক, এনামেলযুক্ত কাস্ট আয়রন এবং সিজনিং করা কার্বন স্টিলের পাত্র।

১. স্টেইনলেস ক্ল্যাড: প্রতিদিনের রান্নায় বহুমুখী ব্যবহার

স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি হাঁড়ি-পাতিল দীর্ঘস্থায়িত্ব ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে জনপ্রিয়। বিশেষ করে পেশাদার রাঁধুনিদের কাছে এ ধরনের পাত্রের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। ভালো মানের স্টেইনলেস স্টিলে সহজে মরিচা ধরে না এবং সাধারণ রান্নার পরিবেশে ক্ষয় প্রতিরোধ করতে পারে।

স্টেইনলেস ক্ল্যাড পাত্রে সাধারণত একাধিক ধাতব স্তর থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যালুমিনিয়ামের একটি স্তর স্টেইনলেস স্টিলের দুই স্তরের মাঝখানে আবদ্ধ থাকে। অ্যালুমিনিয়াম দ্রুত তাপ পরিবহন করে, আর স্টেইনলেস স্টিলের স্তর খাবারের সংস্পর্শে থাকে। ফলে তাপ তুলনামূলক সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং রান্না সহজ হয়।1

এই পাত্রে মাছ-মাংস ভাজা, সবজি রান্না, স্যুপ তৈরি, খাবার সেদ্ধ কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে সস রান্না করা যায়। ভালো মানের স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রে টমেটো, লেবু বা অন্যান্য টক উপাদানযুক্ত খাবারও রান্না করা সম্ভব।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের স্টেইনলেস ক্ল্যাড পাত্রের নমুনা তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষাগারে ৩০ ধরনের পিএফএএসের উপস্থিতি যাচাইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। পরীক্ষিত নমুনায় এসব রাসায়নিক নির্ধারিত শনাক্তকরণসীমার ওপরে পাওয়া যায়নি।

তবে স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র থেকে কোনো ধাতুই কখনো খাবারে মিশবে না-এমন দাবি সঠিক নয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে সামান্য পরিমাণ নিকেল বা ক্রোমিয়াম খাবারে মিশতে পারে। বিশেষ করে নিকেলে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পাত্র নির্বাচনে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে।

২. সিরামিক প্রলেপযুক্ত ননস্টিক প্যান: অল্প তেলে রান্নার সুবিধা

ননস্টিক প্যানের প্রধান সুবিধা হলো, এতে খাবার সহজে আটকে যায় না। ফলে অল্প তেলে ডিম, প্যানকেক, মাছ কিংবা অন্যান্য খাবার রান্না করা যায়।

সিরামিক প্রলেপযুক্ত ননস্টিক প্যান সাধারণত ধাতব পাত্রের ওপর বিশেষ ধরনের আবরণ দিয়ে তৈরি করা হয়। এই আবরণ খাবার আটকে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে।2

প্রচলিত কিছু ননস্টিক প্যানে পিটিএফই (PTFE) ব্যবহার করা হয়, যা পিএফএএস রাসায়নিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে অনেক সিরামিক প্রলেপযুক্ত প্যান পিটিএফই ছাড়াই তৈরি করা হয়। তবে শুধু ‘সিরামিক’ লেখা থাকলেই পাত্রটি সব ধরনের ক্ষতিকর উপাদানমুক্ত, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

তবে সিরামিক প্রলেপের একটি সীমাবদ্ধতা হলো, দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর ননস্টিক কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। নিম্নমানের পাত্রে প্রলেপ তুলনামূলক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অনেক সিরামিক প্যানের মূল কাঠামো অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি। কিন্তু অ্যালুমিনিয়ামের ওপর সিরামিক প্রলেপ থাকলেই পাত্রটি বিপজ্জনক, এমন প্রমাণ নেই। পাত্রের নিরাপত্তা নির্ভর করে ব্যবহৃত উপাদান, প্রলেপের মান এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ার ওপর।

সিরামিক ননস্টিক প্যান দীর্ঘদিন ভালো রাখতে অতিরিক্ত তাপে রান্না না করা, ধাতব খুন্তির পরিবর্তে কাঠ বা সিলিকনের খুন্তি ব্যবহার করা এবং শক্ত জালি দিয়ে না ঘষার পরামর্শ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

৩. এনামেলযুক্ত কাস্ট আয়রন: দীর্ঘ সময়ের রান্নায় উপযোগী

কাস্ট আয়রন বা ঢালাই লোহার পাত্র দীর্ঘ সময় তাপ ধরে রাখতে পারে। তবে সাধারণ কাস্ট আয়রনের পাত্রে মরিচা পড়ার আশঙ্কা থাকে এবং নিয়মিত যত্ন ও প্রয়োজন অনুযায়ী সিজনিং করতে হয়।

এনামেলযুক্ত কাস্ট আয়রনের পাত্রে লোহার ওপর কাচজাতীয় বিশেষ আবরণ দেওয়া হয়। এই আবরণকে এনামেল বলা হয়। এটি পাত্রের লোহাকে খাবার ও আর্দ্রতার সরাসরি সংস্পর্শ থেকে আলাদা রাখতে সাহায্য করে।

এনামেলযুক্ত কাস্ট আয়রনের বড় সুবিধা হলো, সাধারণ কাস্ট আয়রনের মতো নিয়মিত সিজনিং করার প্রয়োজন হয় না। অক্ষত ও খাবারের উপযোগী এনামেল প্রলেপ থাকলে টমেটো বা অন্যান্য টক উপাদানযুক্ত খাবারও রান্না করা যায়।

মাংসের ঝোল, স্ট্যু, স্যুপ, বিরিয়ানি কিংবা কম আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে রান্নার জন্য এ ধরনের পাত্র বেশ উপযোগী। এর মোটা দেয়াল ও ভারী ঢাকনা তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

মেড ইনের মতে, এনামেলযুক্ত কাস্ট আয়রনের পাত্রের পরীক্ষিত নমুনায় ৩০ ধরনের পিএফএএস নির্ধারিত শনাক্তকরণসীমার ওপরে পাওয়া যায়নি।

তবে এনামেল প্রলেপ কখনো নষ্ট হয় না, এমন ধারণা ভুল। পাত্র পড়ে গেলে, জোরে আঘাত লাগলে কিংবা ভুলভাবে ব্যবহার করলে প্রলেপে চিড় ধরতে বা অংশবিশেষ উঠে যেতে পারে। বিশেষ করে ভেতরের প্রলেপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পাত্রটি ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।

এ ছাড়া নিম্নমানের এনামেল বা গ্লেজে সীসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ধাতুর উপস্থিতির ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই নির্ভরযোগ্য প্রস্তুতকারকের খাবার রান্নার উপযোগী পাত্র বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

৪. সিজনিং করা কার্বন স্টিল: উচ্চ তাপে ভাজাভুজির জন্য কার্যকর

কার্বন স্টিলের পাত্র দেখতে অনেকটা লোহার কড়াইয়ের মতো। এতে প্রধানত লোহা ও অল্প পরিমাণ কার্বন থাকে। উচ্চ তাপ সহ্য করার ক্ষমতা এবং দ্রুত গরম হওয়ার কারণে এ ধরনের পাত্র ভাজাভুজির জন্য বেশ কার্যকর।

কার্বন স্টিলের পাত্রে সাধারণত কৃত্রিম ননস্টিক আবরণ থাকে না। এর পরিবর্তে তেলের সাহায্যে পাত্রের গায়ে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে সিজনিং বলা হয়।

সিজনিংয়ের সময় পাত্রের গায়ে লাগানো তেল তাপের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে শক্ত আবরণ তৈরি করে। এই আবরণ খাবার আটকে যাওয়া কমায় এবং মরিচা প্রতিরোধে সাহায্য করে।4

তাদের দাবি, তাদের সিজনিং করা কার্বন স্টিলের পাত্র কারখানাতেই প্রাকৃতিক তেল দিয়ে দুই দফা সিজনিং করা হয়। ফলে কেনার পর থেকেই পাত্রে তুলনামূলক সহজে রান্না করা যায়।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, তাদের কার্বন স্টিলের পাত্রও পিএফএএস পরীক্ষায় নির্ধারিত মান পূরণ করেছে।

কার্বন স্টিলের কড়াইয়ে সবজি ভাজা, মাংস কষানো, নুডলস তৈরি এবং উচ্চ তাপে দ্রুত রান্না করা যায়। তবে সাধারণ কাস্ট আয়রনের মতো এই পাত্রেও দীর্ঘ সময় টকজাতীয় খাবার রান্না করলে সিজনিংয়ের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ ধরনের পাত্র ব্যবহারের পর ভালোভাবে পরিষ্কার ও শুকিয়ে রাখতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প তেল মাখিয়ে রাখলে মরিচা পড়ার ঝুঁকি কমে।

তবে কোনো পাত্রকে পুরোপুরি রাসায়নিকমুক্ত বলা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। পাত্রের উপাদান ও মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করা।