আম জনতার শহর পাড়ি

যাচ্ছি রিকশায়। পেছনে ডাক শুনলাম, “ঐ চাঁপাই পাঁচশ! চাঁপাই পাঁচশ!!” ভাবি আম। মৌসুমের আগেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম? ৫০০ তো অনেক বেশি। তবু মামাকে বলি, থামেন। পেছনে ফিরে দেখি একটা ট্রাক। তাতে গিজগিজ করছে মানুষ। টেনে হিঁচড়ে উঠছে আরও বহু। আম না। এটা মানুষ বোঝাই ট্রাক। ঈদের আগ দিকে এমন হয়। বাস কুলায় না যাদের, তারা এভাবে ঘরে ফেরেন। ট্রাকে পা মেলবার জায়গা পর্যন্ত থাকেনা। কেউ ঝোলেন পাদানিতে। কেউ পা গুঁজে ট্রাকের ছাদে। গাদাগাদি গুমোটে কারও কোলের শিশু কেঁদেই চলে।  

জীবন শঙ্কাহীন এমন ঈদযাত্রা স্বাভাবিক দৃশ্য। নিম্ন আয়ের মানুষের এছাড়া পথ কী? শহর থেকে যে টুকু মেলে তা কুড়িয়ে এভাবে গ্রামে ফেরা। উন্নয়নের বিরামহীন আলাপ চলে যাদের বাদ রেখে। সড়কে দুর্ভাগ্যের শিকার হলেও তারা সংবাদমাধ্যমে হয়ে থাকবেন কেবল সংখ্যা। তখন আবার ঘোষিত হবে ক্ষতিপূরণের টাকার সংখ্যা। প্রাণহীনতার ক্ষতি কখনোই পূরণের নয় এ নির্মম সত্য যেন অবোধগম্য। তাই শঙ্কা নিয়ে সংখ্যা হয়ে বাঁচা মরা যেন এঁদের নিয়তি।

কোনো সংখ্যা আবার গুরুত্বপূর্ণ। যার সাথে লেনদেন জড়িত। যেমন উল্লেখ হচ্ছে, গত কয়েক দিনে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়া যানবাহন থেকে টোল আদায় হয়েছে মোট ২ কোটি ৭৭ লাখ ২৯ হাজার ৫০০ টাকা। গত বছর ১৩ এপ্রিল রোজার ঈদের সময় রেকর্ড ৫২ হাজার ৭৩০টি যানবাহন বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়েছিল। তখন টোল আদায় হয়েছিল ২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।     

এসব টাকা জনগণেরই টাকা। সিটবেল্ট না বাঁধলেও জরিমানার বিধান আছে। আর এমন ঝুঁকিপূর্ণভাবে মহাসড়কে চলা নিয়ে যেন দেখার কেউ নেই।

বরাবরের মতো এবার ঈদের সময়টায়ও সড়ক নিরাপদ নয়। সংবাদমাধ্যমে দেখতে পাই এ চিত্র।

‍“ঢাকার সাভারে বাসচাপায় রহিমা বেগম (৪৫) নামে এক নারীর নিহত হয়েছেন।

শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার আমিন বাজার এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

রহিমার বাড়ি আমিন বাজার ইউনিয়নের বড়দেশী পূর্বপাড়া গ্রামে। তার বাবা মৃত নাসের উদ্দিন। সূত্র : ডেইলি স্টার অনলাইন, ২৯ এপ্রিল ২০২২

একই সাইটে দেখি আর প্রাণহানীর বার্তা।

রংপুরের কাউনিয়ায় বাস ও গরুবোঝাই পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে পিকআপ চালক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩ জন। মারা গেছে ৮টি গরুও।

শুক্রবার দুপুরে উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের মীরবাগ বুড়ালের ব্রিজ এলাকায় রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে।

তখন মনে হয় চাঁপাইয়ের আম ভেবে তাকানো ট্রাকটিই মূলত আম জনতার বাংলাদেশ। তারা যেন এ শহরের ঝড়ে যাওয়া ফুল। পড়ে থাকেন কারও কুড়িয়ে নেয়ার অপেক্ষায়। ৫০০ টাকায় যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়া যাচ্ছে এই তাদের জন্য অনেক। উৎসবে এমন দশা পর্দার আড়াল থেকে টেনে বাস্তবতা দেখায়। কিন্তু আমরা কি আসলেই দেখি? হয়তো না দেখার ভান করি। অথবা দেখা না দেখায় কিছু আসে যায় না। তবু দিনলিপিতে দিনের সাক্ষ্য থাক।