ময়মনসিংহের পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে একটি আকর্ষণীয় স্থান নগরীর প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর বাড়ি “শশী লজ”।
অনন্য স্থাপনা ও গঠনশৈলীর কারণে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় প্রাসাদটিকে পুরাকীর্তি পর্যটন স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে। অপরূপ ও অনিন্দ্যসুন্দর প্রাসাদটি দেখতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী এখানে ভিড় করেন।
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাড়া জাগানো নাটক “অয়োময়”-এর শুটিং এই বাড়িতেই করা হয়েছিল। সেই থেকে স্থানীয়ভাবে বাড়িটি “শশী লজ” হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে।
অর্ধবৃত্তাকার প্রবেশ তোরণের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে ১৬ গম্বুজবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদটির প্রধান ফটক। মাথার ওপর ছায়া দিচ্ছে বহুদিনের পুরনো বিশাল বিশাল গাছ। প্রাসাদের দিকে যেতে চোখে পড়বে সবুজ ঘাসের বাগান। যেখানে অলংকৃত শ্বেতপাথরে তৈরি ফোয়ারা আর তার মাঝখানে গ্রিক দেবী ভেনাসের একটি শ্বেতশুভ্র মূর্তি।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো ভ্রমণপিয়াসী মানুষ শশী লজে বেড়াতে আসেন সংগৃহীতবাড়ির পেছন দিকে টলটলে শান্ত জলের পুকুরে মার্বেল পাথরে বাঁধাই করা ঘাট। ঘাট ঘেঁষে নির্মিত দোতলা স্নানঘরটি পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। এখানে বসেই রানি পাশের পুকুরে ভেসে বেড়ানো হাঁসেদের খেলা দেখতেন।
প্রাসাদের অভ্যন্তরে রয়েছে মার্বেল পাথরের অলংকরণে তৈরি চমৎকার ঝর্ণা এবং কাঠের মেঝে দ্বারা নির্মিত হলরুম। দরজা ও জানালায় রয়েছে রঙিন কাঁচের পাতের ওপর চমৎকার কারুকাজ।
দৃষ্টিনন্দন এই প্রাসাদটি দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো ভ্রমণপ্রেমি মানুষ। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রাসাদে প্রবেশ মূল্য ১৫ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাড়ির ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, মুক্তাগাছা জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর তৃতীয় উত্তর পুরুষ রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরী নিঃসন্তান ছিলেন। অথচ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, সম্পত্তি সংরক্ষণে সক্ষম একটি পুত্রসন্তান ভীষণভাবে প্রয়োজন। তাই গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দত্তক নিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে দত্তক পুত্রের হাতে জমিদারির ভার অর্পণ করেন রঘুনন্দন আচার্য।
প্রাসাদের পেছনে রয়েছে বাঁধাই করা টলটলে জলের পুকুর ঘাট ঢাকা ট্রিবিউনকিন্তু, জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীর প্রতিও সদয় ছিল না নিয়তি। সন্তানহীন অবস্থায় অকালপ্রয়াণ ঘটে তার। তার মৃত্যুর পর গৌরীকান্তের বিধবা স্ত্রী বিমলা দেবী দত্তক নেন কাশীকান্তকে। তবে, কপাল মন্দ কাশীকান্তরও। দীর্ঘ রোগযন্ত্রণায় ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় পরলোকগমন করেন তিনি। তার বিধবা পত্নী লক্ষ্মী দেবী আচার্য চৌধুরানী পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করেই দত্তক নিয়েছিলেন চন্দ্রকান্তকে। ভাগ্যের বিরুদ্ধচারণ চন্দ্রকান্তও অতিদ্রুত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। পালিত পুত্রের মৃত্যুর পরও হাল ছাড়েননি লক্ষ্মী দেবী। পুনরায় দত্তক নেন পূর্ণচন্দ্র মজুমদারকে। লক্ষ্মী দেবী পূর্ণচন্দ্রের নতুন নাম রাখলেন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী।
ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী জনপদে সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর শাসনামলে যুক্ত হলো সোনালি মাত্রা। প্রায় ৪১ বছর জমিদারি পরিচালনাকালে বহু জনহিতকর কাজের পাশাপাশি গড়ে তুলেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। ১৯০৫ সালে জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী শহরের প্রাণ কেন্দ্রে নয় একর ভূমির ওপর নির্মাণ করেন দৃষ্টিনন্দন এই দ্বিতল ভবনটি। কিন্তু, সূর্যকান্তও ছিলেন নিঃসন্তান। তাই, দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে বাড়ির নাম দেন “শশী লজ”।
বাড়ির প্রবেশপথে রয়েছে গ্রীক দেবী ভেনাসের মূর্তি ঢাকা ট্রিবিউনঅট্টালিকার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয় নানা উপকরণ। ১৮৯৭ সালে গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয় প্রাসাদটি। পরে শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী পুনরায় ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালে নির্মাণ করেন একতলা দৃষ্টিনন্দন বর্তমান প্রাসাদটি। নবীন জমিদারের প্রাণান্ত প্রয়াসে শশী লজ হয়ে ওঠে অপরূপ ও অনিন্দ্যসুন্দর।
অতঃপর, জমিদারি প্রথা শেষ হলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার জমিদারদের সকল ভবন ও সম্পত্তি সরকারের খাস জমি ও ভবন হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালে শশী লজে মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাড়িটির মূল অংশ মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয় ও দপ্তর হিসেবেই এতদিন ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। পরে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার হেরিটেজ ভবন হিসেবে মূল ভবনটিকে “মহিলা শিক্ষিকা প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়” থেকে আলাদা করে প্রত্নতাত্ত্বিক ও যাদুঘর অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করেন। বর্তমানে ভবনটি ময়মনসিংহ জাদুঘর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।