বিপ্লবী শহীদ কর্নেল তাহেরের হত্যাবার্ষিকী আজ ২১ জুলাই। ১৯৭৬ সালের এ দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত এক রায়ে এই ফাঁসিকে “ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড” আখ্যায়িত করেন।
আমি কোনো বই থেকে প্রথম কর্নেল তাহেরের নাম জানিনি। আমাদের মহল্লায় মোক্তার চাচার চায়ের দোকান। সবাই একে ডাকেন “মুক্তিযোদ্ধার দোকান” নামে। চাচা জীবিত। অসুস্থ হয়ে জীবনের অন্তিমতায়। তিনি এখন দোকান চালান না। অন্যরা বসে। কিন্তু দোকানের সাইনবোর্ড এখনও আছে। তাতে নতুন চালু হয়েছে সমসময়ের বাণিজ্যের প্রাণ ভোমরা বিকাশ, নগদ ও ফ্লেক্সিলোড মতো ব্যাপার। দোকানের সাইনবোর্ডে চাচার মুক্তি বার্তা সনদ নম্বর দেওয়া আছে। সে লেখা মোছেনি আজও।
মোক্তার চাচার দোকানে বেশি বসতেন মহল্লার বড় ভাইয়েরা। আমরা অ্যাভোয়েড করতাম। ধূমপানজনিত সিনিয়রিটির বিষয় পাড়ায় থাকে। চাচার দোকানে পত্রিকা থাকত। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, রাজনীতি নিয়ে অনেক আলাপ হতো।
মোক্তার চাচা খান বিড়ি। মুখে তা গুজে তিনি কাস্টমারদের সঙ্গে আলাপে জড়াতেন। কখনও দোকানে বড় কেউ না থাকলে বা অন্য দোকান বন্ধ থাকলে আমরাও বসতাম। সেখানেই মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে কৈশোরে কামালপুর যুদ্ধের কথা প্রথম শুনি। তখন চাচা তার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহের প্রসঙ্গে বলতেন, “হ্যার ছিল কলিজা। পা’ ডা তো ঐ দিনই গ্যালো মর্টার শেলে।”
“কলিজা”র এই কর্নেলকে আরও একটু চিনি কলেজে পড়ার সময় বাম ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে। শ্লোগানে তখন ধারাবাহিকভাবে আসতো “যেই রক্ত কখনও বেঈমানী করেনা”। পাল্টাভাবে তখন উচ্চারিত হতো সূর্যসেন, প্রীতিলতা, সালাম, রফিক, জব্বার, আসাদ, রুমী থেকে কর্নেল তাহেরের নাম। তবে বিপ্লবীকে সবচেয়ে ভালো চেনান বরেণ্য লেখক শাহাদুজ্জামান স্যার। তার অসামান্য উপন্যাস “ক্রাচের কর্নেল”-এ। জনপদের রাজনীতির টালমাটাল সেই সময় নিয়ে এক আঁকড় এই বই।
১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই পত্রিকায় নিজের মৃত্যু সংবাদ “তাহের টু ডাই” পড়েন কর্নেল তাহের। সেদিন কারাগারের ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্ধারিত ৮ নং সেল থেকে পরিবারের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেন তিনি। সেখানে বলেন,“ছোট্ট সেলটি বেশ ভালোই, বেশ পরিষ্কার। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন জীবনের দিকে তাকাই তাতে লজ্জার কিছু দেখি না। আমার জীবনের নানা ঘটনা আমাকে আমার জাতির সাথে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এর মতো বড় সুখ আর আনন্দ আর কী হতে পারে। নীতু, যীশু, মিশুর কথা, সবার কথা মনে পড়ে। তাদের জন্য অর্থ সম্পদ কিছুই রেখে যাইনি। কিন্তু আমার সমগ্র জাতি রয়েছে তাদের জন্য। আমাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। আমি আমার সমগ্র জাতির মধ্যে প্রকাশিত। আমাকে হত্যা করতে হলে পুরো জাতিকে হত্যা করতে হবে। কোনো শক্তি তা পারে, কেউ পারবে না।”
জীবনের শেষ চিঠিতে কর্নেল তাহের আরও লেখেন, “আমরা দেখেছি শত-সহস্র উলঙ্গ, মায়া ভালোবাসা বঞ্চিত শিশু। তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় আমরা গড়তে চেয়েছি।”
১৯৭৬ সালে ২১ জুলাই ভোর রাত ৪ টা ১ মিনিটে বীর উত্তম কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর হয়। কবি পাবলো নেরুদার মতো তার মৃতদেহকেও ভয় পেয়েছিল প্রতিপক্ষ ডিক্টেটর। পরিবার চায় ঢাকায় দাফন। তা অগ্রাহ্য হয়। সেনা সদস্য ভর্তি ৫টি ট্রাক তার মৃতদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সামনে পেছনে ছিল। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে ময়মনসিংহের কাজলায় নেওয়া হয় তার মরদেহ। দাফনের পর এক সপ্তাহের বেশি সময় আর্মি ক্যাম্প মোতায়েন ছিল গোরস্তানের পাশে।
শেষ চিঠিতে তাহের লিখেছিলেন, “বাঙালি জাতির জন্য উদ্ভাসিত সূর্যের আর কত দেরি। না, আর দেরি নাই। সূর্য উঠলো বলে।”
আসলেই কি এত বছরে উদ্ভাসিত সূর্য উঠেছে বাংলায়? শত-সহস্র উলঙ্গ, মায়া ভালোবাসা বঞ্চিত শিশুরা কি তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে?
কারা ধারণ করেন সেই বীর তাহেরের শক্তি এখন? আমাদের সহ্যক্ষমতা অতিক্রম করে মন্ত্রী, উপাচার্য, এমপিসহ নানা পদ, পদবীর লোভে ক্ষমতার নির্লজ্জ চাটুকাররা এখন তাহের বন্দনা করে দিবস এলে।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র কবিতার ভাষায় -
“হাজার সিরাজ মরে
হাজার মুজিব মরে
হাজার তাহের মরে
বেঁচে থাকে চাটুকার, পা-চাটা কুকুর
বেঁচে থাকে ঘুনপোকা, বেঁচে থাকে সাপ। ”
বাংলার সমাজ বদলের লড়াইয়ে অমীমাংসিত চরিত্র তাহের কাজলার কবরে শুয়ে তা দেখছেন। অবিনাশী তাহেরের কাছেই তাই প্রশ্ন, আজও কি আপনি বাংলার উদ্ভাসিত সূর্য দেখেন?