ঘুরে আসুন ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম নগরীর দর্শনীয় স্থান

ঘুরতে ভালোবাসেন অথচ চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেননি এমন বাংলাদেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবশ্য অনেকে কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান চলে যাবার সময় চট্টগ্রামে নামতে ভুলে যান। কিন্তু পর্বতপ্রেমি পর্যটকদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস। ঢাকার মত এই ছিমছাম শহরটিও ইতোমধ্যে ফ্লাইওভারে ঢেকে গেছে। পাশাপাশি যানজটের দিক থেকে ঢাকার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও এর দর্শনীয় স্থানগুলো এখনো আকর্ষণ হারায়নি। আজকের ভ্রমণ করচা এই ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম নগরীর দর্শনীয় স্থান নিয়ে।

চট্টগ্রাম শহরে জনপ্রিয় ১০টি দর্শনীয় স্থান


পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত/ সংগৃহীত


পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত

পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকতটি বাংলাদেশের অত্যাশ্চর্য এবং বিখ্যাত সমুদ্র সৈকতগুলোর মধ্যে অন্যতম। কর্ণফুলী নদী ও সাগরের মোহনায় অবস্থিত পতেঙ্গায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। এছাড়া বন্দরে ছোট-বড় জাহাজের সারি এক ভিন্ন পরিবেশের ছোঁয়া দিবে। এখানে সমুদ্রে ভেসে বেড়ানোর জন্য আছে স্পিডবোট ও সি বাইক। অনেকে ঘোড়ায় চড়ে পুরো সৈকত ঘুরে বেড়ান। পতেঙ্গার আশেপাশে অন্যান্য সুন্দর জায়গার মধ্যে আছে বাংলাদেশ নৌ ঘাঁটি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বাটারফ্লাই পার্ক।

চট্টগ্রাম শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে পতেঙ্গায় গাড়ি, সিএনজি বা লোকাল বাসে করে যাওয়া যায়। সিএনজিতে গেলে ভাড়া পড়বে ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা আর লোকাল বাসে নিবে ৫০ টাকা।


বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও উপজাতি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে পথ চলা শুরু হয় দেশের একমাত্র জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের/ সংগৃহীত


জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও উপজাতি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে পথ চলা শুরু হয় দেশের একমাত্র জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরটির। চট্টগ্রাম জেলার আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় বাদামতলী মোড়ের কাছে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালে। ১.২৫ একর জমির উপর গড়ে তোলা জাদুঘরটি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দ্বারা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। জাদুঘরে ২৯টি জাতিগোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি এবং জীবন প্রবাহের জন্য নিবেদিত ১১টি প্রদর্শনী কক্ষ রয়েছে। উপরন্তু বিশ্বব্যাপী ২৫টি বাংলাদেশী জাতিগোষ্ঠী এবং পাঁচটি অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনামূলক বিশ্লেষণ জাদুঘরটিকে সমৃদ্ধ করেছে। জাতিগত জাদুঘরের প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ১০ টাকা। এটি প্রতি রবিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে।


রাঙ্গুনিয়া কোদালা চা বাগান/ সংগৃহীত


রাঙ্গুনিয়া কোদালা চা বাগান

১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কোদালা টি এস্টেট বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় চা বাগানগুলোর মধ্যে একটি। ঐতিহ্যবাহী এই চা বাগানটি চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া সদর উপজেলা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কোদালা ইউনিয়নে অবস্থিত। বাংলাদেশের মোট ১৬২টি চা বাগানের মধ্যে কোদালা চা বাগান গুণগত পরিমাণ ও আয়ের দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান হয়ে কোদালা চা বাগানের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রোডে বাসে চড়ে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান বা সরফভাটা গোডাউন এলাকায় যাওয়া যেতে পারে। তারপর সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে লিচুবাগান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে কোদালা চা বাগান।


কালুরঘাট সেতু/ সংগৃহীত


কালুরঘাট সেতু

বহদ্দারহাট থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণ পাশে একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান এই কালুরঘাট সেতু। ব্রুনিক অ্যান্ড কোম্পানি ব্রিজ বিল্ডার্স হাওর নামে একটি সংস্থা ১৯৩০ সালে সেতুটি নির্মাণ শুরু করে। সে সময় ৭০০ গজের কালুরঘাট সেতুটি শুধুমাত্র ট্রেন চলাচলের জন্য উদ্বোধন করা হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেতুটিতে অন্যান্য যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঐতিহাসিক কালুরঘাট সেতুর কারণে বহদ্দারহাটের কাছে বেত কেন্দ্র ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। আর এই বেত কেন্দ্রের নামেই হয় কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, যেটি বাংলাদেশ বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।


টাইগার পাস এলাকায় অবস্থিত বাটালী হিল/ সংগৃহীত


বাটালী পাহাড়

চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলার জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে টাইগার পাস এলাকায় অবস্থিত বাটালী হিল শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। বাটালী পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তা পাকা হওয়ায় এটি জিলাপি পাহাড় নামেও পরিচিত। পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম শতায়ু অঙ্গন। ২৮০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রায় গোটা চট্টগ্রাম শহর ও বঙ্গোপসাগর দেখা যায়।

২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাটালী পাহাড়ে জলপাই, কাঁঠাল, কালোজাম, লিচু, কমলা, আম, জাফরান, চন্দন, কফি এবং অর্জুন জাতীয় বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১২,৫০০ গাছ লাগানো হয়। পাহাড়টি বাংলাদেশ গণপূর্ত বিভাগের অন্তর্গত এবং পাহাড়ের শীর্ষে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অফিস ও বাংলো রয়েছে।


চালন্দা গিরিপথ/ সংগৃহীত


চালন্দা গিরিপথ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরকার বিভিন্ন রকমের রোমাঞ্চকর স্থানের মধ্যে এই গিরিপথ আশ্চর্যজনক এক দর্শনীয় স্থান। গিরিপথের চারিদিকে সবুজ আর স্রোতের স্বচ্ছ জলের প্রকৃতি মনকে প্রশান্ত করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের খুপরির কাছে পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত সবচেয়ে ভালো দেখা যায়।

চট্টগ্রাম শহরের যেকোনো স্থান থেকে বাস বা সিএনজিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া যায়। চট্টগ্রামের বটতলী রেলওয়ে স্টেশন থেকে শাটল ট্রেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যায়। এখান থেকে জিরো পয়েন্টে যেয়ে টমটম নিয়ে কলা অনুষদে যাওয়া যাবে। কুঁড়েঘর থেকে ৭ থেকে ৮ মিনিট হাঁটার পরে পাওয়া যাবে জলধারার সরু পথ। এই এক ঘণ্টার পায়ে হাটা পথটিই চলে গেছে চালন্দায়।


ফয়ে’স লেক/ সংগৃহীত


ফয়ে’স লেক ও বিনোদন পার্ক

প্রায় ৩২০ একর জমির উপর স্থাপিত ফয়ে’স লেক চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলি অঞ্চলে অবস্থিত। পাহাড়ে ঘেরা এই হ্রদটি ১৯২৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার মিস্টার ফয়ের নামে নামকরণ করা হয় লেকটির। বাংলাদেশের নামকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনকর্ড গ্রুপ এই পার্কটিকে বর্তমান রূপ দিয়েছে। এখন এটির নাম ফয়’স লেক কনকর্ড। এর ছোট্ট চিড়িয়াখানাটি পার্কটিকে আরও জাঁকজমক করে তুলেছে।

চট্টগ্রাম শহরের যে কোনো জায়গা থেকে ফয়ে’স লেক যাবার অটোরিকশা, সিএনজি এবং মিনিবাসে পাওয়া যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম শহর থেকে পাহাড়তলী পর্যন্ত রেলপথও আছে।


মহামুনি বৌদ্ধ বিহার/ সংগৃহীত


মহামুনি বৌদ্ধ বিহার

বৌদ্ধ বিহারটি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার পার্বত্য গ্রাম মহামুনিতে অবস্থিত। ১৮১৩ সালে ছাইঙ্গা ঠাকুর নামে একজন বৌদ্ধ ধর্মগুরু মহাপুরুষ গৌতম বুদ্ধের মূর্তি স্থাপন করে এই বৌদ্ধ বিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই কারণেই গৌতম বুদ্ধের নামে মহামুনি মন্দিরের নামকরণ করা হয়েছে। মহামুনি বৌদ্ধ বিহারের কাঠামোটি প্রায় ২০০ বছরের পুরনো একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।

১৮৪৩ সালে মং সার্কেল রাজা মহামুনি চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে বৌদ্ধ বিহার কমপ্লেক্সে একটি মেলা প্রবর্তন করেন, যা সারা দেশে মহামুনি মেলা নামে পরিচিত হয়। চট্টগ্রাম শহর থেকে কাপ্তাই সড়কের রাউজান পাহাড় দিয়ে বাস, সিএনজি বা রিকশায় মহামুনি বৌদ্ধ বিহারে যাওয়া যায়।


লাল দীঘি/ সংগৃহীত


লাল দীঘি

১৭৬১ সালে চট্টগ্রাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে অর্পিত হওয়ার পর ভূমি তফসিল অফিস (বর্তমানে যেটি মেট্রোপলিটন পুলিশ অফিস) দ্বারা লাল রঙ করা হয়েছিল। সেই সময় এটি লালকুঠি নামে পরিচিতি লাভ করে। পরে লালকুঠির পূর্ব পাশের কারাগারটিও লাল রঙ করা হয় এবং লালঘর নামে পরিচিত হয়। একই ঘটনায় লালঘর ও লালকুঠির পাশের দীঘিটি লালদীঘি নামে পরিচিতি পায়।

আবদুল জব্বার ১৯১০ সালের ১২ বৈশাখে লালদীঘির তীরে প্রথম বলি খেলার (খেলার নাম) আয়োজন করেন। এরপর থেকে প্রতি বছর ১২ই বৈশাখে একই স্থানে জব্বারের বলি অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম শহরের যেকোনো স্থান থেকে বাস, সিএনজির মতো লোকাল পরিবহনে লালদীঘি ময়দানে যাওয়া যায়।


প্রজাপতি পার্ক/ সংগৃহীত


প্রজাপতি পার্ক

চট্টগ্রাম জেলার শাহ আমানত বিমানবন্দর ও পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন পতেঙ্গা নেভাল একাডেমীর ১৫ নম্বর রোডে দেশের প্রথম বাটারফ্লাই পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও পার্কটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালের অক্টোবরে। পার্কটিতে প্রায় ২০০ প্রজাতির ১০০০টিরও বেশি প্রজাপতি রয়েছে।

এছাড়া বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এখানে প্রজাপতির কৃত্রিম প্রজনন করা হয়। সর্বাধিক প্রজাপতি দেখার জন্য যেতে হবে সকাল ৯ টা থেকে ৪ টার মধ্যে। প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের জন্য প্রজাপতি পার্কের প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ১০০ টাকা, আর শিশুদের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা। চট্টগ্রাম জিরো পয়েন্ট থেকে গাড়ি, সিএনজি বা লোকাল বাসে করে এক ঘণ্টার মধ্যে পতেঙ্গা যাওয়া যায়।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাতায়াত ব্যবস্থা

ঢাকা থেকে সড়ক, ট্রেন এবং আকাশপথে তিন মাধ্যমেই চট্টগ্রাম যাওয়া যায়। ঢাকার যাত্রাবাড়ী সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে এসি-নন এসি বিভিন্ন পরিবহন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মানের ভিত্তিতে এগুলোতে ভাড়া পড়তে পারে সিট প্রতি ৯০০ থেকে ২৫০০ টাকা।

কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে গেলে ভাড়া পড়তে পারে ২৮৫ থেকে ১,১৭৯ টাকা। আর সবচেয়ে কম সময়ের চট্টগ্রাম পৌছনোর জন্য চট্টগ্রামগামী ফ্লাইট ব্যবহার করা যেতে পারে। এখানে সাধারণত শুধু যেতে একজনের খরচ পড়ে ৩,৩০০ থেকে ৯,০০০ টাকা।

শেষাংশ

চট্টগ্রামের দর্শনীয় স্থানগুলো ঐতিহাসিক বন্দর নগরীকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। শহরটির অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি এই জায়গাগুলোরও প্রতি নজর দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই শহরটিকে অচিরেই পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তাই এর পরিবেশ রক্ষার্থে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে জনসাধারণকেও। ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটি মনোরম পর্যটন শহর উপহার দেওয়ার জন্য চট্টগ্রামের দর্শনীয় স্থানগুলোর সৌন্দর্য্য ধরে রাখা প্রয়োজন।