অমর একুশে বইমেলা সম্পর্কে আপনি কতটা জানেন

“পড়ো বই গড়ো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ”' প্রতিপাদ্যে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে শুরু  হতে যাচ্ছে “অমর একুশে বইমেলা-২০২৩”।

বুধবার (১ ফেব্রুয়ারি) বিকেল তিনটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এবারের বইমেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা সবসময়ই অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে। আর সেই কারণেই অমর একুশে বইমেলা বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। 

এই মেলা পাঠকদের জন্য তাদের প্রিয় লেখক, কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রকাশকদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা করার দুর্দান্ত সুযোগ করে দেয়। পাঠকদের বই পড়তে ও কিনতে উৎসাহিত করার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিবেশন করার পাশাপাশি বইমেলা মাসব্যাপী একটি  সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে– যা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। চলুন, অমর একুশে বইমেলার ইতিহাসের শিকড় অনুসন্ধান করা যাক-

চিত্তরঞ্জন সাহা

চিত্তরঞ্জন সাহা ১৯২৭ সালে নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বাংলাবাজারে অবস্থিত তার প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিঘর প্রকাশনী ১৯৭১ সালে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। চিত্তরঞ্জন সাহা ২৬ মার্চের পর ঢাকা ছেড়ে যান। তিনি আগরতলায় আশ্রয় নেন এবং তারপরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় চলে আসেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অনেক বিশিষ্ট লেখক, শিল্পী, সাংবাদিককে শরণার্থী হিসেবে কলকাতায় থাকতে হয়েছিল।

সেই সময়কালে চিত্তরঞ্জন কলকাতায় বসবাসরত কয়েকজন বিশিষ্ট সাহিত্যিকের সঙ্গে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। তারা বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ওপর হওয়া অন্যায় ও যুদ্ধ নিয়ে লেখার ও তা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। 

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি ভবনের সামনে গাছের নিচে একটি মাদুর বিছিয়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রায় ৩২টি (কিছু সূত্র অনুসারে ৩৩টি) বই প্রদর্শন করেন।

যদিও চিত্তরঞ্জন সাহা প্রথমদিককার উদ্যোক্তা হিসেবে বইমেলার সূচনা করেছিলেন, তবে কিছু সূত্র অনুসারে তিনিই প্রথম ব্যক্তি নন যিনি ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বই বিক্রি শুরু করেছিলেন। অনেকের মতে, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামীও রাশিয়ান বই প্রদর্শন শুরু করেন। এই বইগুলো তাদের সমৃদ্ধ বিষয়বস্তু এবং সাশ্রয়ী মূল্যের জন্য সেসময়ে খুব জনপ্রিয় ছিল।

বাংলাদেশে প্রথম বইমেলার পেছনের ইতিহাস

চিত্তরঞ্জন সাহা একুশের বইমেলার প্রবর্তক হিসেবে স্বীকৃত হলেও বইমেলার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালে। উদ্যোগটি নিয়েছিলেন সরদার জয়েনউদ্দীন। তিনি ১৯১৮ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন।১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) গ্রন্থাগারের নিচতলায় কিছু শিশুতোষ বই প্রদর্শন শুরু করেন। তখন তিনি শিশুদের বই নিয়ে ইউনেস্কোর একটি প্রকল্পে কাজ করছিলেন।

১৯৭০ সালে জয়েনউদ্দীন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি বইমেলার আয়োজন করেন।

ইউনেস্কো ১৯৭২ সালকে “আন্তর্জাতিক বই বর্ষ” ঘোষণা করায়, ডিসেম্বরে জয়েনউদ্দীন বাংলা একাডেমিতে বইমেলার আয়োজনের উদ্যোগ নেন। এরপর থেকে বাংলা একাডেমি বইমেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়।

একুশে বইমেলার যাত্রা

চিত্তরঞ্জন সাহা আরও কয়েক বছর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বই প্রদর্শন ও বিক্রি চালিয়ে যান। ১৯৭৬ সালে বই বিক্রির এই ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যান্য প্রকাশকরা একত্র হন এবং এতে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়।

আশরাফ সিদ্দিকী সে সময় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন এবং বইমেলার সঙ্গে একাডেমির যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এরপর ধীরে ধীরে বাংলা একাডেমির আয়োজক সমিতি বইমেলাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।

১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে “বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি (চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত “ এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় একটি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।

একুশে বইমেলা যেভাবে অফিসিয়াল শিরোনাম পেলো

বেশ কয়েক বছর ধরে বইমেলার আয়োজন করা হলেও এর কোনো নির্দিষ্ট শিরোনাম বা স্পষ্ট বিন্যাস ছিল না। এটি “বার্ষিক বইমেলা” বা “ঢাকা বইমেলা” নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে ২১ ফেব্রুয়ারির চেতনায় স্থায়ীভাবে বইমেলা আয়োজন করে। বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মঞ্জুরে মাওলা বইমেলা আয়োজনের চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৮৩ সালে “অমর একুশে গ্রন্থমেলা” শিরোনামে মেলা শুরু হয়। তবে অনুষ্ঠানটি পরের বছর স্থানান্তরিত হয়।

বইমেলার জন্য একটি নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৮৪ সালে প্রথম “অমর একুশে বইমেলা'”অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই বইমেলার আনুষ্ঠানিক শিরোনাম হয় “অমর একুশে বইমেলা”।

অমর একুশে বইমেলার সময়কাল ও স্থান

প্রাথমিক বছরগুলোতে খুব অল্প সময়ের জন্য বইমেলার আয়োজন করা হতো। এটি তখন ১৫ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক সপ্তাহের জন্য অনুষ্ঠিত হতো। এ সময় বাংলা একাডেমির বইয়ের ওপর ছিল বিশেষ ছাড়।

পরে ১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা ২১ দিনের জন্য অনুষ্ঠিত হতো। তবে বইমেলার সময়কাল একবার কমিয়ে ১৪ দিন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকাশকদের দাবি অনুযায়ী বইমেলার মেয়াদ আবারও বাড়িয়ে ২১ দিন করা হয়।

বইমেলা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ায় এটি ২১ দিন থেকে পুরো ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। লিপইয়ারে এটি ২৯ দিন ধরে চলে। ২০১৩ বা ২০১৪ সালে মেলার সময়সীমা ২৬ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। তবে সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি।

মেলার ভেন্যুতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। প্রথম দিকে প্রকাশক কম ছিল। বাংলা একাডেমিতে বইমেলার আয়োজন করা হতো। মেলা চলাকালীন প্রকাশকদের স্টলগুলো মাটি ও দেয়ালের পার্টিশন দিয়ে আলাদা করা হতো। ধীরে ধীরে বইমেলা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং অনেক প্রকাশক অমর একুশে বইমেলায় যোগ দেয়ার আগ্রহ দেখায়।

২০১২ সালে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের সংখ্যা ছিল ৪২৫ জন। বিপুল সংখ্যক প্রকাশক এবং জনসমাগমের কারণে ২০১৪ সালে একুশে বইমেলা বাংলা একাডেমির কাছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত প্রসারিত করা হয়।

শেষকথা

চিত্তরঞ্জন সাহা, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং অন্যান্য প্রকাশকরা যখন একুশের বই মেলার সূচনা করেছিলেন, তখন তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক লাভ নয় বরং এমন একটি সমাজকে উৎসাহিত করা; যা বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্যের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রকাশ করে।

আরেকটি লক্ষ্য ছিল, বিশ্বের অন্যান্য অংশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষকে আলোকিত করা।

একুশে বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিষয়ে আলোচনার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে এবং লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের একত্রিত হওয়ার শক্ত প্লাটফর্ম।