হুমায়ূন আহমেদকে আমি প্রথম চিনেছি লেখক হিসেবে। পরে তাকে দেখেছি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে। কিন্তু তারও আগে তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের এক পরিচিত মুখ-যার সঙ্গে আব্বুর সম্পর্ক ছিল বই, সাহিত্য আর দীর্ঘ আড্ডার।
আমার জন্মেরও আগে সেই গল্পের শুরু।
মা প্রায়ই মজা করে বলতেন, আমি নাকি একুশের বইমেলায় যাওয়া শুরু করেছি পৃথিবীর আলো দেখার আগেই। তিনি যখন আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, তখনও বইমেলায় যেতেন। তাই আমাদের পরিবারে এই গল্পটা অনেকবার শুনেছি-আমার প্রথম বইমেলা নাকি জন্মেরও আগে।
হয়তো সে কারণেই বইমেলার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অন্যরকম।
আমার কাছে বইমেলা কখনো শুধু একটি মেলা ছিল না। সেটা ছিল পরিবারের একটি ঋতু।
সারা বছরের অপেক্ষা যেন গিয়ে জমা হতো ফেব্রুয়ারির সেই কদিনে। বাসার সবাইকে ঘিরে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত। বই গুছিয়ে রাখা, নতুন প্রকাশনার হিসাব, স্টলের পরিকল্পনা-সবকিছুই আমাদের পরিবারের অংশ হয়ে উঠত।
আমাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সুবর্ণ প্রকাশনীর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বইয়ের গন্ধ, লেখকদের আনাগোনা আর অবিরাম সাহিত্য আলোচনা। ছোটবেলা থেকেই এসব দেখে বড় হয়েছি। তখনো বুঝতাম না কে কত বড় লেখক। শুধু দেখতাম, বিকেলের দিকে একজন একজন করে মানুষ আসছেন, বসছেন, চা খাচ্ছেন, গল্প করছেন। আব্বুও তাদের সঙ্গে গল্পে যোগ দিচ্ছেন। আলোচনার বিষয় একটাই-বই, লেখা আর সাহিত্য। সেই আড্ডাগুলোর অন্যতম নিয়মিত মুখ ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।
তাকে আমি প্রথম দেখি ১৯৮৯ সালে। তখন আমি এতটাই ছোট যে, তার জনপ্রিয়তার বিশালতা বোঝার বয়স হয়নি। আমার কাছে তিনি ছিলেন "হুমায়ূন চাচা"। তিনি এলেই বাসার পরিবেশ যেন একটু বদলে যেত। আব্বুর মুখে হাসি ফুটত। গল্প জমে উঠত। আমরা ছোটরা কখনো এদিক-ওদিক খেলতাম, কখনো আবার বড়দের কথোপকথন শুনতাম। আমাদের সরিয়ে দেওয়া হতো না। বরং আমরা সবাই সেই পরিবেশেরই অংশ ছিলাম। আজ ভাবি, কী অসাধারণ একটা সৌভাগ্যের মধ্যে বড় হয়েছি!
তখন বুঝিনি, বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের একজনকে এত কাছ থেকে দেখছি।
১৯৯০ সালে আমি প্রথম তার বই পড়া শুরু করি। শিশুদের মতো করে নয়, সত্যিকারের পাঠক হয়ে। একটার পর একটা বই পড়তে পড়তে মনে হতে লাগল, এই মানুষটা যেন মানুষের মনের ভেতরে ঢুকে গল্প লেখেন। তার চরিত্রগুলো আমার পরিচিত মানুষের মতো লাগত। তাদের আনন্দ, দুঃখ, অভিমান-সবকিছু যেন খুব বাস্তব।
“নন্দিত নরকে” পড়ার পর আমি কেঁদেছিলাম। অনেক পরে “কৃষ্ণপক্ষ” পড়েও একই অনুভূতি হয়েছিল। তখনও জানতাম না, যার বই পড়ে আমি কাঁদছি, কয়েকদিন পর হয়তো তিনিই আবার আমাদের বাসায় এসে আব্বুর সঙ্গে চা খেতে খেতে সাহিত্য নিয়ে গল্প করবেন।
১৯৯২ সাল। সেই বছরের একুশের বইমেলা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইমেলাগুলোর একটি। কারণ, আব্বু তখন হুমায়ূন আহমেদের প্রথম একক লেখকের স্টল পরিচালনা করছেন।
আজকের দিনে হয়তো বিষয়টি খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু তখন একজন লেখকের জন্য আলাদা স্টল-এটাই ছিল এক বিরাট ঘটনা। পাঠকদের উন্মাদনা এতটাই ছিল যে, স্টলে দাঁড়িয়ে কখন সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেত, টেরই পেতাম না। মানুষ আসছেন। বই কিনছেন। আবার অন্য মানুষ আসছেন। লাইন আরো বড় হচ্ছে।
আমি তখন ছোট। তবু নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। কারণ, আমিও কাজ করছি। বইয়ের দাম আমার মুখস্থ ছিল। কে কোন বই চাইছেন, কোন বইয়ের কত দাম-সব প্রায় বলে দিতে পারতাম। কখনো বিক্রির মেমো লিখতাম। কখনো বই গুছিয়ে রাখতাম। কখনো আবার পাঠকদের হাতে বই তুলে দিতাম। অনেকেই আমাকে দেখে ভাবতেন, আমি বুঝি হুমায়ূন আহমেদের মেয়ে। ছোটবেলায় ব্যাপারটা শুনে অবাক লাগত। পরে মজা লাগতে শুরু করেছিল। স্টলের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় হতো, যখন হুমায়ূন চাচা অটোগ্রাফ দিতে বসতেন। আজও চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখতে পাই। টেবিলের এক পাশে তিনি। সামনে লম্বা লাইন।
একজন একজন করে পাঠক বই এগিয়ে দিচ্ছেন। আমি বইটা তার হাতে তুলে দিচ্ছি।
তিনি বই খুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করছেন,-"কার নামে হবে?" আমি পাঠকের কাছে গিয়ে নাম জেনে আসছি। তিনি আবার বলছেন, "বানানটা জিজ্ঞেস করো।" আমি আবার ফিরে গিয়ে নামের বানান জেনে আসছি। তারপর তিনি খুব মন দিয়ে নামটা লিখছেন।
কখনো তাড়াহুড়ো করতে দেখিনি।
পাঠক যতই অপেক্ষা করুন, তিনি বানান নিশ্চিত না হয়ে কোনোদিন নাম লিখতেন না। তারপর বইটা আমার হাতে তুলে দিতেন।
আমি আবার পাঠকের হাতে ফিরিয়ে দিতাম। তখন এসবকে খুব স্বাভাবিক মনে হতো।
আজ এত বছর পরে বুঝি, একজন লেখকের প্রকৃত বড়ত্ব শুধু তার লেখায় নয়, তার পাঠকের প্রতি সম্মানেও প্রকাশ পায়। একটি নামের বানান ঠিকভাবে লেখা হয়তো খুব ছোট একটি ব্যাপার। কিন্তু সেই ছোট ব্যাপারটাকেও তিনি গুরুত্ব দিতেন। হয়তো সেই কারণেই লক্ষ লক্ষ মানুষ তাকে শুধু একজন লেখক হিসেবে ভালোবাসেননি; একজন মানুষ হিসেবেও আপন করে নিয়েছিলেন। আর আমি?
আমি তখনও বুঝিনি, আমি ইতিহাসের এক টুকরোর ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি।
আমার কাছে তখন সেটি ছিল শুধু আরেকটি বইমেলার দিন। যেখানে আব্বু ব্যস্ত। হুমায়ূন চাচা অটোগ্রাফ দিচ্ছেন।
আর আমি ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছি-একজন পাঠকের নামের বানান আরেকজন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে।
একদিনের কথা আজও খুব স্পষ্ট মনে আছে। হুমায়ূন চাচা আমাদের বাসায় এসেছেন। নতুন কোনো সিনেমার শুটিং দেখতে নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকও নয়। যেমন প্রায়ই আসতেন, সেদিনও এসেছিলেন আব্বুর সঙ্গে গল্প করতে। সাহিত্য, বই আর নানা বিষয় নিয়ে তাদের কথা চলছিল। আম্মু চা বানাচ্ছিলেন। আমি চা নিয়ে গেলাম।
চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে তিনি আমার দিকে তাকালেন।
তারপর আব্বুকে বললেন,- "তিথিই বদির ছোট বোন হবে।" আমি তখনও বুঝিনি, ওই একটি বাক্য আমার জীবনের কত বড় একটি স্মৃতির শুরু হয়ে থাকবে। পরে জানতে পারলাম, আগুনের পরশমণি ছবির বদির ছোট বোনের চরিত্রের জন্য আলাদা করে কাউকে খুঁজতে হয়নি। সেই এক কাপ চায়ের আড্ডাতেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেল।
আমাদের বাড়িটাও তার খুব পছন্দ হয়েছিল। একসময় সেই বাড়িই হয়ে উঠল আগুনের পরশমণি ছবির শুটিং লোকেশন। পরে হিসাব করে দেখেছি, ছবির প্রায় ঊনষাট শতাংশ দৃশ্যই আমাদের বাড়িতে ধারণ করা হয়েছিল। ছোটবেলায় নিজের বাড়িকে হঠাৎ সিনেমার সেটে পরিণত হতে দেখা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি, বাড়িটা যেন আর আমাদের নেই। বড় বড় লাইট বসানো হচ্ছে। ক্যাবল টানা হচ্ছে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। ক্যামেরা এদিক-ওদিক সরানো হচ্ছে। শিল্পীরা নিজেদের সংলাপ ঝালিয়ে নিচ্ছেন। মেকআপ আর্টিস্টরা ব্যস্ত। কেউ সেট সাজাচ্ছেন, কেউ আলো মাপছেন, কেউ আবার পরের দৃশ্যের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমাদের খুব চেনা বাড়িটা যেন কয়েক দিনের জন্য অন্য এক জগতে চলে গিয়েছিল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখতাম। কী আশ্চর্য মনোযোগ নিয়ে সবাই কাজ করছে!
তখনই প্রথম বুঝেছিলাম, একটা সিনেমা তৈরি হয় শুধু পরিচালক বা অভিনেতাকে নিয়ে নয়। তার পেছনে কত শত মানুষের শ্রম, অপেক্ষা আর ধৈর্য লুকিয়ে থাকে। আর এই পুরো ব্যস্ততার মাঝেও হুমায়ূন চাচাকে কখনো অস্থির লাগেনি। তিনি যেন নিজের ছন্দেই থাকতেন। চা তাঁর খুব প্রিয় ছিল। দিনে কত কাপ চা খেতেন, এখন আর মনে নেই। তবে মনে আছে, বারবার চা আসত, আর গল্পও চলত সমানতালে। শটের ফাঁকে, আলো বদলানোর অপেক্ষায়, কিংবা ক্যামেরা প্রস্তুত হওয়ার সময়-হাতে এক কাপ চা যেন তার নিত্যসঙ্গী। শুটিং চলছিল, আর আমরা সবাই ধীরে ধীরে সেই ব্যস্ততার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছিলাম। বাড়ির প্রতিটি ঘর, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি সিঁড়ি যেন নতুন অর্থ পাচ্ছিল।
আমারও কয়েকটি দৃশ্যে অভিনয় করার কথা। একদিন একটি আবেগঘন দৃশ্যের শুটিং।
আমি প্রস্তুত। ক্যামেরা প্রস্তুত। সবাই চুপ। হুমায়ূন চাচা আমার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন, "চোখে পানি আনবে। কিন্তু পানি ফেলবে না।" বাক্যটা শুনে তখন হয়তো পুরো অর্থ বুঝিনি। কিন্তু আজ এত বছর পরে মনে হয়, অভিনয় নিয়ে যত কথা শুনেছি, যত বই পড়েছি, তার সবকিছুর সারমর্ম যেন ওই একটি বাক্যের মধ্যেই ছিল।
কাঁদতে হবে। কিন্তু কান্না দেখিয়ে নয়।অনুভূতিটা থাকবে চোখে। ভেতরে। হয়তো সেই কারণেই, এত বছর পরও সংলাপ নয়, আমার সবচেয়ে বেশি মনে আছে ওই একটি নির্দেশ। "চোখে পানি আনবে। কিন্তু পানি ফেলবে না।"
...শুটিং চলছিল বেশ কয়েক দিন ধরে। ধীরে ধীরে ইউনিটের সবাইও আমাদের পরিবারের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তখন তো বুঝতাম না, সিনেমার সেটে মানুষগুলো কয়েক দিনের জন্য একসঙ্গে থাকলেও, সেই সময়টুকুর মধ্যে এক ধরনের পরিবার তৈরি হয়ে যায়। এখন বুঝি, সেটারই অংশ হয়ে গিয়েছিলাম আমরাও।
একদিন একটি ছোট্ট ঘটনা ঘটল, যেটা আজও মনে পড়লে অবাক লাগে। একটি দৃশ্যে আমাদের বাড়ির গেটে লিখতে হবে—"ইহা মুসলমানের বাড়ি।" প্রোডাকশন ম্যানেজারের হাতে একটি চক ছিল। আমি ভেবেছিলাম, তিনি নিজেই লিখবেন। কিন্তু হুমায়ূন চাচা আমাকে ডাকলেন। বললেন, "আগে উঠোনে লিখে দেখাও আমাকে।" আমি উঠোনে লিখলাম। তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর হেসে বললেন, "এবার গেটের ওপর লেখো।"আমি গেটে লিখলাম। লেখা শেষ হওয়ার পর তিনি আব্বুর দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, "এই মেয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করবে। ওর হাতের লেখা খুব সুন্দর।"তখন মাত্র ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ করেছি আমি।
কথাটা শুনে সবাই হেসেছিল। আমিও।
আজ ভাবি, একজন মানুষের পর্যবেক্ষণশক্তি কত সূক্ষ্ম হলে, একটি শিশুর হাতের লেখা দেখেও সে এত আন্তরিকভাবে প্রশংসা করতে পারে! এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই আমার স্মৃতিতে হুমায়ূন চাচাকে আলাদা করে রেখেছে।
তিনি কখনো আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করেননি, যাতে মনে হয় তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন সহজ। অদ্ভুত রকম সহজ। হয়তো সেই কারণেই তার চারপাশের মানুষও সহজ হয়ে উঠত।
অনেক বছর পরে ময়মনসিংহ বইমেলায় আবার তার সঙ্গে দেখা।
আমি তখন আর সেই ছোট্ট মেয়ে নই।
তিনি আমাকে দেখেই হেসে উঠলেন। বললেন, "তিথির নীল তোয়ালে তো আমি এই তিথিকে নিয়েই লিখেছি!" আমি লজ্জা পেয়ে কী বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তিনি সেখানেই থামলেন না। মঞ্চে উঠে কথা বলছিলেন।
হঠাৎ আমাকে ডাকলেন। বললেন, আমিও যেন কিছু বলি। আজও ভাবি, এত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহসটা হয়তো সেদিনই একটু করে জন্মেছিল। তার এই স্বাভাবিক আচরণটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করত। মানুষকে খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার।
শুটিংয়ের দিনগুলো শেষ হয়ে গেল। বাড়ি আবার আগের মতো হয়ে উঠল।
লাইট খুলে নেওয়া হলো। ক্যামেরা চলে গেল। ইউনিটের মানুষগুলোও একদিন বিদায় নিলেন।
আমাদের ঘরগুলো আবার আমাদের হয়ে গেল। কিন্তু কিছু জিনিস আর আগের মতো থাকল না।
যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুটিং দেখেছি, সেখানে দাঁড়ালেই কোনো না কোনো দৃশ্য মনে পড়ে যেত।
যে গেটে নিজের হাতে লিখেছিলাম "ইহা মুসলমানের বাড়ি", সেটার দিকে তাকালেই সেই দুপুরটার কথা মনে হতো। আর যখনই আগুনের পরশমণি টেলিভিশনে দেখানো হতো, সিনেমা দেখার চেয়ে আমি বেশি খুঁজতাম-কোথায় আমাদের বাড়ি, কোন ঘরটা, কোন বারান্দাটা, কোন জানালাটা। তারও পরে আবার আমি পুরোপুরি পাঠক হয়ে উঠলাম। হুমায়ূন আহমেদের বই পড়া তখন আর শুধু পরিচিত একজন মানুষের লেখা পড়া ছিল না। আমি তখন তার পাঠক। “নন্দিত নরকে” পড়ে চোখ ভিজে গিয়েছিল।
কী আশ্চর্য ক্ষমতা একজন মানুষের! এতো সহজ ভাষায় লিখেও মানুষের ভেতরের গভীরতম অনুভূতিগুলো ছুঁয়ে যেতে পারেন! পরে “কৃষ্ণপক্ষ” পড়েও একই রকম আবেগে ভেসেছি, পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, ভালো গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি বোধহয় এটাই-পড়া শেষ হওয়ার পরও চরিত্রগুলো আমাদের ভেতরেই থেকে যায়। হয়তো এ কারণেই, আমার কাছে হুমায়ূন আহমেদ কখনো শুধু একজন লেখক নন। তিনি একই সঙ্গে আমার শৈশব, আমার বইমেলা, আমাদের বাড়ি, এক কাপ চা, একটি চলচ্চিত্রের সেট, আর একজন পাঠক হয়ে ওঠার গল্প।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলে যায়। বাড়ি বদলে যায়। শহর বদলে যায়। একুশের বইমেলাও বদলে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, কিছু স্মৃতি যেন কোনো পরিবর্তন মানতে চায় না।
আজও একুশের বইমেলায় ঢুকলে ভিড়ের মধ্যে কোথাও যেন সেই পুরোনো স্টলটাকে খুঁজে ফিরি। মনে হয়, একটু পরই আব্বু ব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক হাঁটবেন। হুমায়ূন চাচা এসে বসবেন।
পাঠকেরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকবেন। আমি বইগুলো গুছিয়ে রাখব। কেউ একজন বই এগিয়ে দেবেন। তিনি মাথা তুলে জিজ্ঞেস করবেন, -"কার নামে হবে?" আমি দৌড়ে গিয়ে নাম জেনে আসব। তিনি আবার বলবেন,- "বানানটা জিজ্ঞেস করো।" তারপর খুব যত্ন করে নামটা লিখবেন। স্মৃতিরও বোধহয় নিজস্ব একটা সময় থাকে। সেখানে মানুষ বুড়িয়ে যায় না। কেউ চলে যায় না।
সবাই ঠিক সেই বয়সেই থেকে যায়, যেভাবে আমরা তাদের শেষবার দেখেছিলাম। আমার স্মৃতিতে আব্বুও তেমনই আছেন। হুমায়ূন চাচাও। দুজন পাশাপাশি বসে আছেন। টেবিলের ওপর কয়েক কাপ চা। চারদিকে বইয়ের স্তূপ। আলোচনার বিষয় সাহিত্য।
আমরা-আমি, তার তিন মেয়ে-কখনো গল্প শুনছি, কখনো নিজেদের মধ্যে কথা বলছি, কখনো আবার বড়দের আলোচনায় কান দিচ্ছি।
কেউ তখন ভাবছে না, এই মুহূর্তগুলো একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে। কেউ জানে না, একদিন এই মানুষগুলোকে নিয়েই স্মৃতিচারণ লিখতে হবে। সবকিছুই তখন খুব স্বাভাবিক ছিল। হয়তো এ কারণেই এত মূল্যবান।
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, হুমায়ূন আহমেদকে কাছ থেকে কেমন দেখেছি। আমি কখনো খুব বড় কোনো উত্তর খুঁজে পাই না। আমার মনে পড়ে ছোট ছোট কিছু দৃশ্য। একজন মানুষ, যিনি অটোগ্রাফ দেওয়ার আগে নামের বানান নিশ্চিত করতেন। একজন মানুষ, যিনি শুটিংয়ের আগে একটি শিশুকে বলেছিলেন, "চোখে পানি আনবে। কিন্তু পানি ফেলবে না।"
একজন মানুষ, যিনি আমার হাতের লেখা দেখে খুশি হয়েছিলেন। একজন মানুষ, যিনি বছরের পর বছর পরেও আমাকে দেখে চিনতে পেরেছিলেন। হয়তো মানুষকে মনে রাখার এটাই সবচেয়ে সুন্দর উপায়।
তার খ্যাতির জন্য নয়। তার মানবিকতার জন্য।
আজ আব্বু নেই।
হুমায়ূন চাচাও নেই।
এই পৃথিবীতে তাদের সেই আড্ডা আর কখনো বসবে না। কিন্তু আমার ভেতরে সেই বিকেলগুলো এখনও রয়ে গেছে।সেখানে এখনও চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে। বইয়ের নতুন কাগজের গন্ধ ভেসে আসে। কথার পর কথা জন্ম নেয়। হাসির শব্দ শোনা যায়। আর আমি এখনও সেই ছোট্ট মেয়েটাই।
বই হাতে দাঁড়িয়ে আছি। অপেক্ষা করছি, কখন তিনি আবার মাথা তুলে মৃদু হেসে বলবেন-"কার নামে হবে?"
এই লেখাটা লিখতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, আমি একজন কিংবদন্তি লেখককে নিয়ে লিখছি না। লিখছি আমার শৈশবের একজন মানুষকে নিয়ে। আর সেই কারণেই, এই স্মৃতিগুলো আমার কাছে শুধু হুমায়ূন আহমেদকে মনে করার নয়; আব্বুকেও আরেকবার ফিরে পাওয়ার।



