Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত হয়েছে যেসব বই

কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, ইতিহাস বিকৃতি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা অশ্লীলতা

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৪৯ পিএম

অবসরে বই হতে পারে আপনার শ্রেষ্ঠ সময় কাটানোর উপায়। বই অজানাকে জানার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। বই মানুষকে সমৃদ্ধ করে। শাণিত করে ভাবনা। বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ বই পড়তে পছন্দ করেন। আর তাদের এই পছন্দ এতোটাই বেশি যে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের অমর একুশে বইমেলা হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রাণের উৎসব।

তবে বইয়ের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে কোনো কোনো বই নিয়ে। ইতিহাস বিকৃতি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, রাজনৈতিক বিতর্ক বা অশ্লীলতা; এরকম বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বিভিন্ন বইয়ের মুদ্রণ, প্রকাশনা, বিতরণ ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো বই প্রকাশের পর করা হয়েছে বাজেয়াপ্ত। এসব বইয়ের মধ্যে ফিকশন, নন-ফিকশন - উভয় ধরনের বই রয়েছে।

যদিও সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি কিংবা প্রকাশকদের কাছ থেকে নিষিদ্ধ এবং বাজেয়াপ্ত বইয়ের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে প্রকাশনা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নিষিদ্ধ বইয়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এর মধ্যে একাধিক বই নিষিদ্ধ হওয়ার পর মামলা করে আদালতের রায়ে পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে।

অবিভক্ত ভারতে একসময় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কয়েকটি বই নিষিদ্ধ হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বই নিষিদ্ধ হয় নব্বইয়ের দশকে।

স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই কবিতা লিখে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়ে একপর্যায়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন কবি দাউদ হায়দার। তখন তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে একটি মামলাও করা হয়। তার আলোচিত “কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়” নামে কবিতাটি ১৯৭৪ সালে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়েছিল।

চলুন, জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশে নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত হওয়া কয়েকটি বই সম্পর্কে-

নারী

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যেসব বই নিষিদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম আলোচিত হুমায়ুন আজাদের লেখা নন-ফিকশন “নারী”। বইটি ১৯৯২ সালে একুশে বইমেলায় প্রথম প্রকাশিত হয়। নারীবাদ নিয়ে লেখা ৪০৮ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর পরই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ইসলাম ধর্ম এবং ধর্মবিদ্বেষীতার অভিযোগ তুলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা বইটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করার জন্য আবেদন করেন। ১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর বইটি নিষিদ্ধ করে তৎকালীন সরকার। সাড়ে চার বছরের আইনি লড়াই শেষে ২০০০ সালের সাতই মার্চ বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ অবৈধ বলে রায় দেয় আদালত।

অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ তার বহুমাত্রিক লেখালেখির জন্য সুপরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে তার আরও কয়েকটি বই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে “পাক সার জমিন সাদ বাদ” উপন্যাস প্রকাশের পর ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন তার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।

লজ্জা

ভারতে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের বেশ কয়েকটি বই নিষিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশে। তার লেখা “লজ্জা” উপন্যাসটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়, তবে প্রকাশনার ছয় মাসের মাথায় বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। উপন্যাসটি ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিল।

১৯৯৩ সালের ১১ জুলাই এক সরকারি তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “জনমনে বিভ্রান্তি ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিঘ্ন ঘটানো এবং রাষ্ট্রবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রকাশের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো তসলিমা নাসরিনের লজ্জা উপন্যাসটি।”

নিষিদ্ধ হওয়ার আগে বইটি প্রায় ৫০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায় বলে জানা গেছে। সেই সময় তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ইসলামপন্থী বেশ কয়েকটি দল তার তীব্র সমালোচনা করে রাজপথে মিটিং-মিছিল করে লেখকের ফাঁসি দাবি করে। একপর্যায়ে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তবে ভারতেও শুরুর দিকে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছিল। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের কয়েকটি রাজ্য, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং ভুটানেও এই বইটি নিষিদ্ধ হয়।

২০০৩ সালে প্রকাশিত তসলিমা নাসরিনের লেখা আরেকটি বই “ক” সে বছরই নিষিদ্ধ হয়। লেখক বইটিকে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বলে বর্ণনা করেছেন। বইয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে তার নিজের ওপর ঘটা যৌন নিপীড়নের কথা তুলে ধরেছেন। এতে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন পরিচিত লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তবে অভিযুক্তরা সবাই যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের মধ্যে একজন তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার একটি মানহানির মামলা করেছিলেন, এবং মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বই বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। এরপর, ২০১৫ সালে সে মামলাটি আদালত খারিজ করে দেয়। মামলা খারিজ হওয়ায় এখন বইটি ছাপতে বা বিক্রিতে বাধা নেই বলে জানান এর প্রকাশক।

এছাড়াও বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে বিভিন্ন বই বাজেয়াপ্ত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।  বিভিন্ন সময় অমর একুশে বইমেলা থেকেও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে কিছু কিছু বই।

তবে বই নিষিদ্ধের ঘটনা যে শুধু বাংলাদেশেই ঘটে, তেমনটা নয়। পৃথিবীর অনেকে দেশে অনেক নামী লেখকের কিংবা পাঠকপ্রিয় বই নিষিদ্ধ হওয়ার উদাহরণ আছে। বর্তমানে উত্তর কোরিয়া এবং সৌদি আরবে খ্রিস্টান ধর্মের প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেল নিষিদ্ধ।

সূত্র: বিবিসি বাংলা অবলম্বনে

About

Popular Links