প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা বড় সময় কাটে অনলাইনে। বিশেষ করে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটে সবচেয়ে বেশি সময়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অন্য যেকোনো সোশ্যাল হ্যান্ডেলের চেয়ে ফেসবুক ব্যবহারকারী সংখ্যাই বেশি। চ্যাটিং, লাইক, কমেন্টের পাশাপাশি ফেসবুকে আমরা যে কাজটি বেশি করি, সেটি হলো “শেয়ার”। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, প্রয়োজনীয় টিপস, নিছক বিনোদন কিংবা আবেগতাড়িত হয়ে আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জিনিস ফেসবুকে শেয়ার করে থাকি।
তবে এই শেয়ার করার প্রবণতা যে সবসময় ইতিবাচক কিংবা অন্যের জন্য উপকারী বিষয়টি তেমন নয়, বরং কখনো কখনো আপনার একটি শেয়ার হয়ে উঠতে পারে অন্যের জন্য ক্ষতিকারক। তাই ফেসবুকে যেকোনো কিছু শেয়ার করার আগে অন্তত একটিবার ভেবে দেখার প্রতি আহ্বান বিশেষজ্ঞদের।
যেসব বিষয় সোশ্যাল হ্যান্ডেলে শেয়ার করার আগে বেশি করে সতর্ক থাকার প্রতি বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো আত্মহত্যা বিষয়ক পোস্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে আত্মহত্যার নীরব মহামারি চলছে। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর কমপক্ষে ১৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। বিশ্বে বছরে আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন। অর্থাৎ আত্মহত্যাকে সাধারণ কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে কমবয়সীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আত্মহত্যাকে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত বাংলাদেশি গবেষকদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অন্তত প্রতি দশ জনে একজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা রয়েছে।
তবে শুধু অল্পবয়সীরাই নন, সকল বয়সীদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। এক্ষেত্রে আশার কথা হলো, আত্মহত্যাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ, পরিবার, স্বজন, বন্ধু কিংবা আশেপাশের মানুষ একটু সচেতন, একটু যত্নশীল হলেই বেশিরভাগ আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আত্মহত্যার পেছনে বিভিন্ন ধরনের কারণ থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকেই আত্মহত্যার অন্যতম প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানসিক অসুস্থতার পাশাপাশি, বাংলাদেশে যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন, প্রেমে ব্যর্থতা, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল, বুলিং, ইভটিজিং, মাদকাসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি, দারিদ্র্য ও বেকারত্বসহ বিভিন্ন কারণ আত্মহত্যার প্রভাবক হিসেবে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে দুই ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। একটি হলো, আগে থেকে পরিকল্পনা করে, যেটাকে বলা হয় ডিসিসিভ সুইসাইড। এক্ষেত্রে অনেকেই সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন অনেকে। অন্যটি হলো, রাগ, ক্ষোভ কিংবা আবেগের বশবর্তী হয়ে হুট করে আত্মহত্যা করা। যেটাকে বলা হয় ইমপালসিভ সুইসাইড।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আশেপাশের মানুষ একটু সচেতন হলেই ডিসিসিভ সুইসাইডের প্রায় বেশিরভাগই প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাদের মতে, ডিসিসিভ সুইসাইড প্রবণতা থাকা ব্যক্তিরা আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের আচরণের মাধ্যমে আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন। এসব ইঙ্গিতের মধ্যে রয়েছে-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যু আর আত্মহত্যা নিয়ে নিজের ইচ্ছার প্রকাশ। আত্মহত্যা বা মৃত্যুবিষয়ক গান, কবিতা কিংবা বিভিন্ন পোস্ট। এই ধরনের ব্যক্তিরা প্রায়ই হাত-পা কাটা বা অন্য কোনোভাবে নিজের ক্ষতি করেন।
এরা বেশিরভাগ সময় একাকী মনমরা হয়ে থাকেন। পড়ালেখা, খেলাধুলা, শখের বিষয়সহ সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। এসব ক্ষেত্রে আশেপাশের মানুষ যদি তাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেশার চেষ্টা করেন, তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করেন, তার ভেতরে ইতিবাচক ভাবনা সঞ্চার করতে পারেন কিংবা তাকে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে পারেন তাহলে আত্মহত্যাজনিত জীবনের অপচয় অনেকটাই রোধ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রিয়জনের সান্নিধ্য আত্মহত্যার ঝুঁকি হ্রাস করে।
এ বিষয়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেজবাউল খাঁন ফরহাদ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “একজন মানুষ কেন আত্মহত্যা করেন তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা অনেক ক্ষেত্রেই খুব জটিল। তবে কাজটা একেবারে অসম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে এই আত্মহত্যার তদন্ত করতে হয়, যাকে বলা হয় সাইকোলজিক্যাল অটোপসি। এতে তার মৃত্যুর আগের ডিটেইলস হিস্ট্রি নেওয়া হয়। তিনি কোনো মানসিক রোগে ভুগতেন কি-না, আগে কখনো সুইসাইডাল আচরণ করছেন কি-না, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, অ্যাকাডেমিক, সামাজিক কোনো জটিলতা বা চাপ ছিল কি-না, মাদকাসক্ত ছিল কি-না ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের পাশাপাশি শেষ কয়েক দিন তার আচরণে সামাজিকতা বা আবেগের বড় কোনো পরিবর্তন ছিল কি-না সে তথ্য নেওয়া হয়। আর সুইসাইডাল নোট পাওয়া গেলে তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটা এভিডেন্স। এরপর সকল কিছু বিবেচনা করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ বের করেন।”
তিনি আরও বলেন, “বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে আত্মহত্যার সম্ভাব্য যে কারণগুলো পেয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে- বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন; যা ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারে হতে পারে, আবার বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার ও সিজো-এফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের ডিপ্রেসিভ এপিসোডও হতে পারে। এতে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষ সুইসাইড করে। দ্বিতীয়ত, মাদকাসক্তি; যেখানে নিয়মিত মাদক সেবনে ধীরে ধীরে বা কিছু ক্ষেত্রে হঠাৎ সাইকোটিক বা অস্বাভাবিক অনুভূতি, বিশ্বাস তৈরি হয়ে সুইসাইডের দিকে ধাবিত হয়। তৃতীয়ত, সিজোফ্রেনিয়া এবং চতুর্থ হচ্ছে পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। এছাড়া হঠাৎ পারিপার্শ্বিক যেকোনো ঘটনায় সৃষ্ট মানসিক চাপে কেউ কেউ হঠাৎ আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে।”
আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, তারা অন্যের আত্মহত্যার খবরে নিজেরাও প্রভাবিত হতে পারেন। তাই বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
আরও পড়ুন: অনলাইনে অনুমতি ছাড়া নারীর ছবি ব্যবহার, বাড়ছে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সুইসাইডাল নোট ফেসবুকে অনেকেই শেয়ার করছেন উল্লেখ করে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেজবাউল খাঁন ফরহাদ বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রটি ঠিক কেন সুইসাইড করছে, তা সঠিক জানি না, বা অনেকটা জানলেও ইথিক্যাল কারণে তা বলা সম্ভব না। কিন্তু এটা মাথায় রাখতে হবে, তিনি কোনো আধ্যাত্মিক কারণে সুইসাইড করেননি। এটা অবশ্যই কোনো মানসিক অসুস্থতার একটা পরিণতি। কিন্তু অনেকেই তার সুইসাইড নোটের মধ্যে অতিরিক্ত আধ্যাত্মিক কিছু খুঁজতে গিয়ে তা বেশি বেশি প্রচার করে অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ চিন্তার মানুষদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আত্মহত্যার দায় আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির নিজের না, প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই এর দায় আমাদের, তার চারপাশের মানুষের, সমাজের। এটা প্রতিরোধযোগ্য। সেজন্য আত্মহত্যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য ও জ্ঞান থাকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।”
আত্মহত্যা প্রতিরোধে ব্যক্তি, পরিবার এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রতি তাগিদ দেন এই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে গণমাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ক প্রচারণা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যা সংক্রান্ত যেকোনো পোস্ট শেয়ারের ক্ষেত্রে প্রত্যেককে সতর্ক থাকার পাশাপাশি গণমাধ্যমে আত্মহত্যা সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।