বঙ্গোপসাগরে মাঝি-মাল্লাদের সঙ্গে একদিন

গত এপ্রিলের প্রথম ভাগের কথা। রমজানের কারণে কুয়াকাটা সৈকত প্রায় পর্যটকশুন্য। সূর্যোদয়ের সময় বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকজন মৎস্যজীবীর চলাফেরা নজরে পড়ে কেবল।

তাদের কেউ কেউ নৌকা আর জাল প্রস্তুতের কাজ করছিলেন, কারও কারও যাত্রা কেবলই শুরু হচ্ছিল, আর অনেকে ততক্ষণে তরী নিয়ে মাঝ দরিয়ায়।

ছোটখাটো একটা ট্রলারের মালিক নুরুজ্জামান খলিফা। ৫৫ বছর বয়সী এই মৎস্যজীবী পরিত্যক্ত জালে ঘেরা তার নোঙর করা ট্রলারটি পরিষ্কারের কাজ করছিলেন। এসব নৌকায় সাধারণত একসঙ্গে তিনজন জেলে মাছ ধরতে যান। একজনের হাতে থাকে চালানোর দায়িত্ব আর বাকিরা জাল ফেলে মাছ ধরার কাজটি করেন।

নুরুজ্জামান যখন নৌকা প্রস্তুত করছিলেন, তার বাকি দুই সহচর তখন ব্যস্ত খুঁটিনাটি প্রস্তুতিতে। 

নৌকাটি রাখা ছিল সৈকতে। এদিকে, সেখানে তখন পানি নেই। পরিচ্ছন্নতা আর প্রস্তুতি শেষে তাই নৌকার সামনের দিকে তাই চাকা জুড়ে দেওয়া হয়। দুজন জেলে পেছন থেকে ঠেলে সেটিকে সাগরে নামান।

সৈকত থেকে সাগরে নামানো হচ্ছে নৌকা/ঢাকা ট্রিবিউন

নাও ভেসে ভেসে যত দূরে যাচ্ছিল তীরের সবকিছু ততই ছোট হচ্ছিল। এদিকে, তিন মৎস্যজীবী তখন ব্যস্ত জাল ফেলার জায়গা খুঁজতে। একের পর এক জায়গায় জাল ফেলেও মাছের সংখ্যা সন্তোষজনক ছিল না।

পরদিন নুরুজ্জামান বলছিলেন কুয়াকাটার জেলেদের জীবনের গল্প।

তিনি জানান, ১৮ কিলোমিটারের সমুদ্রসৈকত এলাকায় প্রায় চার হাজার নৌকা মাছ ধরার কাজ করে। এই কাজে নিয়োজিত আছেন ১২ হাজারেরও বেশি মৎস্যজীবী।

সরকারিভাবে মাছ ধরার জায়গা নির্ধারিত করে দেওয়া আছে। নুরুজ্জামানদের নৌকায় আছে ১১টি জাল। আর ১১টি জায়গায় তারা সেগুলো ফেলেন।

শৈশব থেকে বাবার সঙ্গে নুরুজ্জামানের মাছ ধরায় হাতেখড়ি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শিখেছেন জাল বুনন। ২৮ বছর ধরে তিনি জাল দিয়ে মাছ ধরে আসছেন। কিন্তু গত এক দশক ধরে পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “দ্বীপের সংখ্যা বাড়ছে। দ্বীপ বা চরের কাছাকাছি মাছ আসতে চায় না। এদিকে, ছোট নৌকা নিয়ে গভীর সাগরে যাওয়া সম্ভব না। তাই এখন এই পেশা ছাড়ছে মানুষ।”

“আজ আমি ৪-৫ কেজি মাছ পেয়েছি। এ দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। শুধু লোকসান আর লোকসান। অনেক মৎস্যজীবীই ঢাকায় গিয়ে অন্য কাজের সন্ধান করছে আজকাল।”

নুরুজ্জামানের পরিবারে রয়েছে বাবা, মা, স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং চার নাতি।

তার আক্ষেপ, “দশজনের পরিবারে আমিই একমাত্র আয় করি। আর এক ছেলে ভ্যান চালায়। সেই আয়ে তার নিজেরই চলে না। এভাবেই চলে আমাদের। আমার এখন কী করা উচিত?”

নুরুজ্জামানের মুখে উঠে এসেছে তার নিত্যদিনের সংগ্রামের গল্প।

প্রতিদিন সকাল ৬টায় ঘুম থেকে ওঠেন তিনি। এরপর সারাদিন তার কাটে জাল মেরামতে। রোদে শুকিয়ে নিতে হয় জাল। সন্ধ্যায় ফের তারা নেমে পড়েন সমুদ্রে। সারাদিনে তার অবসর নেই।

“আমাদের নৌকাটা ছোট। তাই গভীর সাগরে যেতে পারি না। বড় ঝড় উঠলে বেঁচে ফেরার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। সমুদ্রে ঝড়ের মধ্যে পড়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বহু লাশ ভেসে আসে এখানে।”

ঢাকা ট্রিবিউন

দুর্দশার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের অবস্থা এখন শোচনীয়। সরকার আমাদের বড় নৌকা দিয়ে সহায়তা করলে আমরা গভীর সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারতাম। এই অবস্থায় একা বাঁচা যায়, কিন্তু পরিবার নিয়ে টিকে থাকা কষ্টের।”

নুরুজ্জামান বলেন, “২০১৬ সাল থেকে সরকার চাল দিয়ে সহায়তা করে আসছে। আগে মাসে ৪০ কেজি চাল দেওয়া হতো, এখন পাই ২০ কেজি। এ দিয়ে ৮-১০ জনের পরিবার চলেন না। আমাদের ঠিকমতো খাওয়াও জোটে না।”

নুরুজ্জামানের চোখে রাজ্যের হতাশা। তিনি বলেন, “আমার একটা নতুন জাল কেনারও টাকা নেই। সরকার জাল দেয়, কিন্তু আমরা সেগুলো পাই না। এ পর্যন্ত কোনোদিন সরকার থেকে দেওয়া জাল পাইনি।”

বাজার ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে এই মৎস্যজীবী বলেন, “আরেকটা সমস্যা হলো আমরা কখনো মাছের ন্যায্য দাম পাই না। আমাদের কাছ থেকে শতকরা ১০ টাকা কমিশন রেখে দেওয়া হয়। তারপর দাদনদাতারা মাছগুলো নিয়ে বিক্রি করে। সরাসরি বিক্রির কোনো অধিকার নেই আমাদের।”

পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে সরকারের কাছে আরও সহায়তা চেয়েছেন তিনি।

নুরুজ্জামান বলেন, “ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে না দিতে পারলে বেঁচে থেকে কী লাভ? নাতিদের নতুন পোশাকও দিতে পারি না। দৈনিক ২০০-৩০০ টাকা রোজগাড় করি আর এ দিয়ে ১০ জন মানুষকে খাওয়াতে হয়। আমরা জেলেরা অসহায়।”

১১টি জায়গায় তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জাল ফেলা আর তোলা হলো সেদিন। কিন্তু একটাও ইলিশ মাছ উঠল না, জেলেরা ঘরে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিলেন। আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা। আশপাশটা কেমন কালো হয়ে উঠল। মাল্লার ভারি মনের বিষাদ যেন তখন নীলাকাশের মনকেও বিষণ্ন করে তুলেছে। এদিকে, সমুদ্রও কেমন ফুঁসে উঠতে চাইল। তবে তাদের মুখে তেমন চিন্তার চিহ্ন নেই।

তীরে ফিরে আসতে আসতে ছোট্ট একটি শিশুর অপেক্ষা নজরে এলো। নুরুজ্জামানের এক নাতি দাদার জন্য অপেক্ষা করে আছে সৈকতে।

নৌকা তীরে ভেড়ার আগেই লাফিয়ে নেমে পড়লেন নুরুজ্জামান। শিশুটিকে কাঁধে চড়িয়ে তারা ফিরলেন বাড়ির দিকে।