ক্র্যাক প্লাটুনের ‘অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল’

সময়টা ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষদিক। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায় চলছে তখন। দুই নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার মেলাঘরে তরুণদের কমান্ডো আক্রমণের কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে কর্নেল) এটিএম হায়দার। 

এমন সময় ক্যাম্প পরিদর্শনে এলেন দুই নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর (ব্রিগেডিয়ার) খালেদ মোশাররফ। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় করতে তিনি সংক্ষিপ্ত এক বক্তব্যদানের পাশাপাশি একটি সুইসাইড স্কোয়াড গঠনের সিদ্ধান্ত জানান সবাইকে। যাদের মূল দায়িত্ব হবে ঢাকায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি এবং ঢাকায় অবস্থান করা বিদেশি সাংবাদিক, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের মধ্যে এই ধারণা দেওয়া যে- ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা বিদ্যমান। 

সেই লক্ষ্যেই জুনের শুরুতে ১৬ জনের একটি গেরিলা দলকে পাঠানো হয় ঢাকায়। এই স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্টে ঢাকায় ঢুকেছিলেন আলী আহমেদ জিয়াউদ্দীন, মাহবুব আহমাদ (শহীদ), শ্যামল, ভাষণ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর ছেলে), ফতেহ আলী চৌধুরী, আবু সাইদ খান, আনোয়ার রহমান (আনু), মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া), ইঞ্জিনিয়ার সিরাজ, গোলাম দস্তগীর গাজী, তারেক এম আর চৌধুরী, নজিবুল হক, রেজা (ধানমন্ডি), আব্দুস সামাদ (আড়াইহাজার), জব্বার (রুপগঞ্জ), ইফতেখার এবং হাবিবুল আলম। 

গেরিলা ফতেহ আলী চৌধুরী জানান, গেরিলাদের দেওয়া হয়েছিল মাত্র ১২টি গাঢ় কালচে বাদামি রংয়ের ‘‘পাইন আপেল টাইপ'' হ্যান্ড গ্রেনেড আর একটি করে বেয়নেট। 

অন্যদিকে গেরিলা মোফাজ্জ্বল হোসেন চৌধুরী মায়া জানিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে চারটি করে হ্যান্ড গ্রেনেড এবং ২০ পাউন্ড করে এক্সপ্লোসিভ দেয়া হয়েছিল। ১৬০ রুপি (তৎকালীন পাকিস্তানি মুদ্রা) নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে তারা সবাই ঢাকায় পৌঁছেছিলেন ৩ জুন থেকে ৬ জুনের মধ্যে। 

পাকিস্তানিরা তখন ঢাকা তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে বলে প্রচার করছিল। কোথাও কোনো “দুষ্কৃতিকারীদের” সমস্যা নেই এবং ঢাকার পরিস্থিতি শান্ত। ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (সাবেক শেরাটন) এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকায় উপস্থিত ইউএনএইচসিআর প্রধান প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান ও কর্মকর্তারা, বিশ্বব্যাংকের ডেলিগেট টিম, অন্যান্য আর্থিক সহায়তাকারী সংস্থার বেশ কিছু প্রতিনিধি এবং বিদেশি সাংবাদিকদের নিমন্ত্রণ করে। ঢাকাকে “শান্ত ও নিরাপদ” হিসেবে উপস্থাপন করে এই দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহই ছিল পাকিস্তানি জান্তা সরকারের উদ্দেশ্য। বলাই বাহুল্য এই অর্থের বেশিরভাগই খরচ হতো বাঙালিদের নিধনে।

গেরিলারা পাকিস্তানিদের এই বানোয়াট গল্পটাই মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে চাইলেন বিদেশি দাতাসংস্থার প্রতিনিধিদের সামনে। যেন তারা বুঝতে পারেন ঢাকার পরিস্থিতি মোটেও ভালো নেই এবং এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি সরকারকে অর্থনৈতিক ঋণ বা সাহায্য দেওয়া লাভজনক হবে না। 

এই প্রদর্শনবাদের ওপর পাকিস্তানি জান্তা সরকারের ভাবমূর্তি এবং আর্থিক লাভের নিশ্চয়তা নির্ভর করছিল। তাই ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্য সমাবেশ ও সতর্কতা ছিল সবচেয়ে বেশি। বিশেষত হোটেল ইন্টারকনের চারপাশটা পুরোটাই ছিল গ্রিনজোন। ঢাকায় পাঠানো গেরিলাদেরও বলা হয়েছিল শহরের আশপাশে গ্রেনেড ফাটিয়ে স্রেফ আলোড়ন ও আলোচনা তৈরি করার জন্য।

কোনোভাবেই যেন পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে না জড়ায় গেরিলারা, সে ব্যাপারে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন মেজর এটিএম হায়দার এবং শহীদুল্লাহ খান বাদল। কারণ, একে তো গেরিলাদের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই, দ্বিতীয়ত শুরুতেই সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তানিদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামার কোনো পরিকল্পনা ছিল না হাইকমান্ডের। অপারেশন কোনোভাবে ব্যর্থ হলে ঢাকায় গেরিলা ওয়ারফেয়ার মাস তিনেক পিছিয়ে যাওয়ারও শংকা ছিল। 

কিন্তু অসম সাহসী গেরিলারা সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা গিজগিজে পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে হোটেল ইন্টারকনের সামনেই গ্রেনেড ফাটিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেবেন সবাইকে। হামলা করার দিন নির্ধারণ করা হলো ৯ জুন, ১৯৭১। জান্তা সরকার বিদেশি অতিথিদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়, তার আগেই অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অপারেশনের জন্য প্রাথমিকভাবে গেরিলা জিয়া, মায়া, স্বপন, ভাষণ, হাবিবুল আলম এবং ভাষণের মামা মুনির আলম মির্জা (বাদল) নির্বাচিত হলেন। অপারেশনের প্রয়োজনে মায়া, আলম ও জিয়া রেকি করতে যান হোটেল ইন্টারকনে। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটা গাড়িতে করে হোটেলে গিয়ে খাওয়াদাওয়ার ছলে প্রয়োজনীয় জরিপ ও খোঁজখবর নেয় তারা, ভেতর ও বাইরের সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যাওয়া-আসার ব্যাপারে তথ্য নিয়ে সেই মোতাবেক অপারেশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। 

স্বপন আগেই জানিয়েছিলেন, তার কাছে একটা পিস্তল আছে কাভারিং ফায়ার দেওয়ার জন্য। অপারেশনের জন্য একটা গাড়ির প্রয়োজন ছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো সবাই মিলে গুলশান ১ নম্বর গোলচত্বর থেকে একটা গাড়ি হাইজ্যাক করা হবে। সিদ্ধান্ত মতো ৭ জুন থেকেই গাড়ি ছিনতাইয়ের চেষ্টা শুরু করে গেরিলারা। কিন্তু প্রথমদিন ভাষণের জন্য কোনো গাড়িই ছিনতাই করা যায়নি। যতগুলো গাড়ি যাচ্ছিল, সেগুলোর মালিকরা হয় ভাষণকে চেনেন, অথবা ভাষণ তাদের চেনে। হয় তাদের আত্মীয় বা বাবার সহকর্মী। 

দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ৮ জুনেও একই অবস্থা, যে গাড়িই পছন্দ হয়, সেই গাড়ি দেখেই ভাষণ বলে, “এটা আমার চাচা বসে আছেন, অথবা ওটায় আমার খালুর ভাই বসে আছেন, ছিনতাই করা যাবে না।” বিরক্ত হয়ে সেদিনও গাড়ি ছিনতাই না করে সবাই ফিরে আসে তাদের আস্তানায়। সিদ্ধান্ত হয় মূল অপারেশনের দিনে ভাষণকে সঙ্গে রাখা হবে না।  

৯ জুন, ১৯৭১। ঠিক আগের দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে থেকে একটা নীল ডাটসান ১০০০ গাড়ি ছিনতাই করলেন তারা। বাদলের মাজদা গাড়ি দিয়ে এয়ারপোর্ট রোড থেকে ডাটসানকে অনুসরণ করা শুরু হয়। এরপরে গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে এসে ডাটসানকে ওভারটেক করে সামনে এসে থামানো হলো। আর পেছন থেকে আলম তার ট্রায়াম্ফ হেরাল্ড দিয়ে ব্যারিকেড দিলেন। অস্ত্রের মুখে ডাটসানে থাকা একমাত্র যাত্রী ড্রাইভারকে নামিয়ে ডাটসান নিয়ে তারা চলে গেলেন সিদ্ধেশ্বরীতে। সেখান থেকে নেওয়া হলো ৯টি গ্রেনেড, আনারসের মত দেখতে তাই এই গ্রেনেডগুলোকে ডাকা হতো ‘‘পাইনঅ্যাপেল''। 

তারপর সেখান থেকে ড্রাইভিং শুরু করলেন ক্যামেরাম্যান বাদল, পাশেই পিস্তল হাতে বসে ছিলেন স্বপন। পিছনের আসনের বাম দিকে জানালার পাশে মায়া, ডান দিকের জানালার পাশে হাবিবুল আলম আর দুজনের মাঝখানে জিয়া। এই অপারেশনের জন্য ৯টি গ্রেনেডের মধ্যে আলম, জিয়া ও মায়া প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ ছিল তিনটি করে গ্রেনেড। 

গাড়িটি প্রেসিডেন্ট ভবন (বর্তমানে সুগন্ধা) ছাড়িয়ে ডানে মোড় নিয়ে তিন রাস্তার মাঝখানের বড় রাস্তা পেরিয়ে বাম দিকে মোড় নেয়। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সীমানা দেয়াল। 

ধীরগতিতে গাড়িটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন বাদল, গেরিলারা দেখতে পেলো হোটেলের দেয়ালের ওপর বসা নানা ধরনের টুপি পরে অনেক মানুষ অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে হোটেলের দরজার দিকে। যেন নামি-দামি কোনো মানুষকে দেখতে বা স্বাগত জানার অপেক্ষায় আছে তারা। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এগুলো হচ্ছে চাটুকার শ্রেণির বাঙালি, বিহারি কিংবা রাজাকার! 

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ঠিক মাঝ বরাবর পৌঁছে হঠাৎ গেরিলারা সাইরেনের শব্দ পেলেন এবং দেখলেন সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের একটি এস্কর্ট দল ময়মনসিংহ রোড হয়ে আসছে। আর পেছন পেছন পুলিশের আরও দু-তিনটি গাড়ি।

শেষ গাড়িটি ছিল ৬০ দশকের মাঝামাঝি মডেলের একটি সাদা শেভ্রোলেট, যার মাঝ বরাবর চকলেট রঙের ডোরা দাগ। প্রচণ্ড নিরাপত্তা দেখেই বোঝা গেল এ গাড়িতেই আছে ডেলিগেটেরা। পাহারার মাঝ দিয়ে গাড়িগুলো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

সাথে সাথে বাদল মিন্টো রোডের দিক থেকে একটা শার্প ইউটার্ন নিয়ে ফুটপাত সংলগ্ন হোটেলের ছোট গেটে এসে থামল গাড়িটা। তখনকার নিয়ম ছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দহলিজ বা টেরেস এবং তার রিভলভিং এনট্রান্স বা ঘূর্ণায়মান প্রবেশপথ বরাবর ছোট গেটটি দিয়ে পথচারীরা হোটেলে ঢুকতে পারতেন। গাড়িবহর দেখা মাত্রই হোটেলের দেওয়ালের ওপর বসে থাকা বা হাঁটতে থাকা বেইমান বাঙালিরা হাততালি দিয়ে আনন্দে নেচে উঠল। 

তারা খেয়ালই করেনি একটা সাদা ডাটসান থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে চারজন মুক্তিযোদ্ধা হেঁটে তাদের পেছনের ছোট গেটটির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য খেয়াল করলেও তারা কিছু বুঝত কি-না সন্দেহ, কারণ এই আরবান গেরিলাদের বেশ দামি পোশাক পরা সভ্য-ভব্য চলাফেরা দেখে বোঝার কোন উপায় ছিল না যে কি দুর্দমনীয় সাহসী এরা!

যাইহোক, ততক্ষণে হোটেলের টেরেস বরাবর এবং রিভলভিং এনট্রান্সের পাশেই সাবধানে নিঃশব্দে ৩ থেকে ৪ ফুট দূরে দূরে পজিশন নিয়েছে আলম, মায়া ও জিয়া। আর একটু দূরে স্বপন শার্টের নিচে পিস্তলের বাটে হাত রেখে অপেক্ষা করছিল। গাড়িটা থামতেই আলম গ্রেনেড থেকে পিন খুলে দেখলেন, জিয়া গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছেন। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের প্রকট আওয়াজের পর তাকালে দেখা গেল, গাড়িটা উল্টে টেরেসের কোণায় গিয়ে পড়েছে। গাড়ি থেকে দুজন বের হওয়ার চেষ্টা করছে। 

ঠিক সে মুহূর্তে আলম তার গ্রেনেড ছোড়েন, সেটা গিয়ে পড়ল রিভলভিং দরজার কাছে। সাথে সাথে মায়ার ছোঁড়া তৃতীয় গ্রেনেডটাও পড়লো একই জায়গায়!

ততক্ষণে চারদিকে প্রচণ্ড শোরগোল আর হতবিহ্বল পাকিস্তানি সেনাদের মাঝেই নিজের দ্বিতীয় এবং সবমিলিয়ে চতুর্থ গ্রেনেড ছোড়েন জিয়া। উল্টে যাওয়া গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে গ্রেনেডটা ভেতরে পড়েই বিস্ফোরিত হলে আলম দেখতে পান শেভ্রোলেট গাড়িটির পেছন দিকটা হঠাৎ তিন-চার ফুট উপরে উঠে গিয়ে আবার নিচে পড়ছে। সম্ভবত মায়া তারপর আরও গ্রেনেড ছুঁড়েছিলেন, ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তুপে অন্ধকার হয়ে যায় চারদিক। 

একটি গ্রেনেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় জামার আস্তিন গাড়ির দরজায় আটকে যাওয়ায়।

সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! প্রচণ্ড শোরগোলের ভেতর সবাই নিজের চোখে প্রথমবারের মতো ভয়ংকর পাকিস্তানিদের ওপর অসম সাহসে আক্রমণ দেখলেন। সাথে সাথেই গেরিলা চারজন গাড়িতে উঠতে না উঠতেই এক্সিলেটরে পা দাবিয়ে গাড়ি টান দিলেন বাদল। ঘুরিয়ে মিন্টো রোড ধরে ফেরার পথে গেরিলারা দেখলেন, হোটেলের সীমানা দেয়ালে বসে থাকা সব বেইমানগুলো প্রাণভয়ে পালিয়েছে, চারপাশে স্যান্ডেল, লুঙ্গি আর মাথার টুপি পড়ে আছে অনেক। 

এরপর গাড়িটা সুগন্ধার পাশ দিয়ে বেইলি রোডে ঘুরিয়ে ডানদিকে সামরিক জান্তা সরকারের অন্যতম দৈনিক পত্রিকা মর্নিং নিউজ অফিসের পাশে নিয়ে আসেন বাদল।

গাড়ির গতি একটু কমিয়ে পত্রিকা অফিসের সীমানা দেওয়ালের উপর দুটো গ্রেনেড ছুঁড়ে মারেন আলম, প্রচন্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে আশপাশ। এরপর দ্রুত সেখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে রমনা থানার পাশ দিয়ে মগবাজারের কাজী অফিসের পাশে জামায়াতের আমির ও গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড গোলাম আজমের বাসভবনের পাশে আসেন তারা। সেখানে জামায়াত কর্মী এবং তাঁবেদার শান্তি কমিটির দালালদের সভা চলছিল। 

বাড়ি লক্ষ্য করে পর পর দুটো গ্রেনেড ছোড়েন মায়া। গ্রেনেড দুটো গিয়ে বাড়ির ভেতরে আঘাত হানলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন বাসায় গোলাম আজম ছিল না। সেদিনই গোলাম আজম শেষ হয়ে গেলে হয়তো আজ আমাদের ইতিহাসটা অন্যরকম হতেও পারতো।

দ্রুতগতিতে সেখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে দৈনিক পাকিস্তান (দৈনিক বাংলা) এবং মর্নিং সান পত্রিকার সামনে দুটো গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরোনো পল্টনের গলিতে ঢুকে গিয়ে গাড়িটা ফেলে প্ল্যানমতো যে যার বাসায় চলে যান গেরিলারা। মেলাঘরে ফেরার পর তারা অপারেশনের সাফল্য সম্পর্কে জানতে পারেন। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ আগেই বিবিসি এবং অল ইন্ডিয়া রেডিও'র খবরে অপারেশনের কথা জানতে পেরেছিলেন। 

এই অপারেশন করার কথা ছিল ইন্টারকন্টিনেন্টালের আশেপাশের এলাকায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা হোটেল ইন্টাকন্টিনেন্টালে আক্রমণ করে তুলকালাম বাঁধিয়ে দেওয়ায় বিশ্ববাসীই শুধু বিস্মিত হয়নি। বিস্মিত হয়েছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ এবং ক্যাপ্টেন হায়দারও। 

বিশেষ করে খালেদ তো বিবিসিতে এই খবর শুনে কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘‘দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল! বললাম, ঢাকার বাইরে বিস্ফোরণ ঘটাতে আর ওরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এসেছে।''

কমান্ডারের এই উক্তি থেকেই আরবান গেরিলাদের প্লাটুনটি ক্র্যাক প্লাটুন হিসেবে পরিচিতি পায়। অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল ছিল ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ওপর পরিচালিত গেরিলাদের প্রথম আক্রমণ। যা ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বলে কিংবদন্তি হিসেবে অমলিন আজও!


তথ্যসূত্র:

১. ব্রেইভ অফ হার্ট- হাবিবুল আলম বীর প্রতীক

২. বারে বারে ফিরে যাই- ডা. মেজর আখতার বীর প্রতীক

৩. সাক্ষাৎকার: মোফাজ্জ্বল হোসেন চৌধুরী মায়া, স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র ( ৯ম খণ্ড) 


রা'দ রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক