“পরীক্ষা” শব্দটিকে শিশুদের কাছে আতঙ্ক বললেও অত্যুক্তি হবে না। পরীক্ষায় বসার আগে যেমন শিশুরা যেমন চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তেমনি পরীক্ষার পরে ফলাফল কেমন হবে এমন উদ্বেগও কাজ করে অনেকের ভেতর। পরীক্ষায় খারাপ ফল করার কারণে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে।
তাই পরীক্ষা পরবর্তী শিশু-কিশোরদের হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা কমাতে অভিভাবকদের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ যেন স্বাভাবিক হয় সেটিই নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য দরকার যত্নশীল হওয়া।
ইন্ডিয়ান সোশ্যাল সায়েন্স কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের গভর্নর প্রণয় আগরওয়াল “অধ্যয়ন, পরীক্ষা ও ফলাফল” বিষয়ে শিশুদের উদ্বেগ কমানোর কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তার পরামর্শগুলো তুলে দেওয়া হলো-
সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব না রাখা
শিশু-কিশোরেরা পরীক্ষাভীতির কারণে ফলাফল-কেন্দ্রিক বিষণ্নতায় ভোগে। ভালো ফল করতে না পেরে অনেকের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হয়। তাদের মনে হয়, সে হয়তো অন্যদের তুলনায় কম যোগ্য। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তার ভেতর থেকে এমন হীনমন্যতা ও বিষণ্নতা দূর করতে হবে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য আলাদা কোনো চাপ তৈরি করা যাবে না।
শিক্ষকদের ভূমিকা
শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকদের। শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষণ পদ্ধতি যেন শিশুদের ভেতর বিদ্বেষমূলক প্রতিযোগিতা তৈরি না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর শেখার পুরো পরিমাপক না-ও হতে পারে। বিষয়টিকে সেভাবেই মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে- তার শেখার ক্ষেত্রে আরও মনোযোগী হওয়া দরকার কি-না এটি তারই একটি পদ্ধতি। প্রয়োজনে সংশোধনী দিতে হবে।
ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা
শিক্ষার্থীর নেতিবাচক প্রবণতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো থেকে তাকে বের হয়ে আসতে সহায়তা করতে হবে। শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্মাতে সহায়তা করাও শিক্ষার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থী যেন মনে করে সে তার সেরাটা দিয়েছে। সে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়া বা খারাপ ছাত্র নয়। এমন বোধ তৈরি করতে হবে। শিশুমনে যা একবার প্রগাঢ়ভাবে বাসা বাঁধে সেটিই তাকে পুরো জীবনভর বয়ে বেড়াতে হয়। অনেকের ক্ষেত্রে সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সবার ভেতর নিজেকে সেরা ভাববার বিষয়টিকে জাগ্রত করতে হবে।
শিশুদের মধ্যে আগ্রহ জাগানোর কাজটি বাবা-মায়ের /ফাইল ছবি/মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউনআনন্দদায়ক অনুভুতির সঙ্গে পরিচয় করানো
পরীক্ষাভীতি শিশুর স্বাভাবিক অনুভূতিকে বাধাগ্রস্ত করে। এজন্য শিশুটিকে তার প্রিয় জিনিসের সংস্পর্শ অনুভব করাতে হবে। এর মাধ্যমে শিশুর কল্পনাশক্তিও বৃদ্ধি পাবে। যেমন শিশুটি যদি পাহাড়ে যেতে পছন্দ করে তবে তাকে এমন একটি গল্পের মাধ্যমে সেই পাহাড়ের ভেতরে নিয়ে যেতে হবে যেন সে পরীক্ষার বিষয়টি ভুলে যেতে পারে বা তার প্রিয় কোনো ফুলের ঘ্রাণ, কোনো গান, খাবারের বিষয়ে তাকে কল্পনা করাতে হবে। এতে শিশুটির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও তৈরি হবে।
কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে
শিশু যদি কোনো প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পড়ে তাকে কী কী করতে হবে তা বুঝিয়ে দেওয়াটা জরুরি। তাকে খেলাধুলার বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে হবে। খেলা শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখানো, ছবি আঁকা শেখানো- কার্যক্রমগুলোতে তাকে বেশি বেশি করে যুক্ত করতে হবে।
সর্বদা উৎসাহ দিতে হবে
শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা চারপাশের সবকিছুতে অভ্যস্ত নয়। তারা তাদের বাবা-মা, শিক্ষক ও বন্ধুদের মাধ্যমে চারপাশকে বোঝার চেষ্টা করে। আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্বেরও প্রকাশ ঘটে এই সময়ে। শিশুকে সবসময় উৎসাহ দিতে হবে। যেন সে মনে না করে, তার কম নম্বর পাওয়ার কারণে সে অন্যদের থেকে কম আত্মমর্যাদার অধিকারী। অন্যদের সঙ্গে ভালো কাজে অংশগ্রহণে তাকে উৎসাহ দিতে হবে।