কাঙ্গাল হরিনাথের ঐতিহ্যবাহী ছাপাখানাটি যাচ্ছে জাদুঘরে

সময়টা ব্রিটিশ শাসনামলের। উপমহাদেশে আধুনিক সংবাদপত্র প্রকাশের বিষয়টি তখনও পুরোপুরি শহুরে। সেই সময়ই কুষ্টিয়ার কুমারখালীর একটি গ্রাম থেকে প্রকাশ করা হয় “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” নামে এক মাসিক পত্রিকা, পরে সেটি প্রকাশ হতো সাপ্তাহিকভাবে। সম্পাদক গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ। 

১৮৬৩ সালে পত্রিকা চালুর ১০ বছর পর এটির নিজস্ব ছাপাখানাও চালু হয়। ১৮৮১ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর রানি স্বর্ণকুমারী দেবীর আর্থিক সহায়তায় পত্রিকাটি পরিচালিত হতো। কিন্তু পরবর্তীতে নানা সংকটে পত্রিকা এবং ছাপাখানা বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকেই ঐতিহাসিক ছাপাখানাটি সংরক্ষিত ছিল কাঙ্গাল হরিনাথের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। অনেকেরই দাবি ছিল, এই ছাপাখানা যাতে জাদুঘরে হস্তান্তর করা হয়। তবে নানা কারণে সেটি হয়ে ওঠেনি। অবশেষে ঐতিহ্যবাহী ছাপাখানার ঠাঁই মিলছে ২০১৭ সালে কুমারখালীতে প্রতিষ্ঠিত কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে।

কাঙ্গাল হরিনাথের প্রতিকৃতি/ঢাকা ট্রিবিউন

১৫ জুলাই জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে ছাপাখানাটি হস্তান্তর সংক্রান্ত একটি চুক্তি সই হয়েছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

স্বত্ব হস্তান্তর চুক্তিপত্রে সই করেছেন হরিনাথের চতুর্থ বংশধরের স্ত্রী গীতা মজুমদার ও জাদুঘরের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান। ছাপাখানাটি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কাঙ্গাল হরিনাথের বাস্তুভিটা থেকে স্মৃতি জাদুঘরে নেওয়া হবে।

কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর/ঢাকা ট্রিবিউন

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের পঞ্চম বংশধর দীপঙ্কর মজুমদার জানান, বিশ লাখ টাকার চেক ও দুইজনের চাকরির বিনিময়ে তার মা প্রেসটি হস্তান্তরের চুক্তিনামায় সই করেছেন। চেকটি তারা হাতে পেয়েছেন। 

বিনিময়ের এই প্রক্রিয়ায় তারা খুব খুশি।

হস্তান্তর চুক্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী সাংবাদিক কে এম আর শাহীন বলেন, “দুই পক্ষের সমন্বয়হীনতার অভাবে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণে প্রেসটি বাস্তুভিটায় রেখে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রস্তাব বংশধরদের দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে তারা রাজি হননি। বিনিময়ের মাধ্যমে স্বত্ব হস্তান্তর করেছেন তারা।”

কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ওবাইদুল্লাহ বলেন, “২০১৭ সালে স্মৃতি জাদুঘরটি চালু হয়। কিন্তু প্রেসটি পড়ে ছিল কাঙ্গাল হরিনাথের বাস্তুভিটায়। দর্শনার্থীরা এসেই আগে প্রেসটি দেখতে চান। নানা জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বত্বটি হস্তান্তর করছেন তার উত্তরসূরীরা। শিগগিরই জাদুঘরে দেখা যাবে ঐতিহ্যবাহী এ স্মৃতিচিহ্নটি।”

কাঙ্গাল হরিনাথ/ঢাকা ট্রিবিউন

ব্রিটিশ ভারতের নদীয়া জেলা (বর্তমান কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়ায়) ১৮৩৩ সালের ২২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন কাঙ্গাল হরিনাথ। তার আসল নাম হরিনাথ মজুমদার। উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক হরিনাথ ছিলেন বাউল সঙ্গীতের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি ফকির চাঁদ বাউল নামেও পরিচিত ছিলেন।

অর্থাভাবে খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি হরিনাথ। তবে সংবাদপত্রে দারিদ্র্য ও নাগরিক সচেতনতা বিষয়ে লেখালিখি করতেন তিনি।

প্রথম দিকে তিনি কবি ঈশ্বরচন্দ্রের “সংবাদ প্রভাকর”-এ নিজ গ্রামের মানুষের ওপর নির্যাতন ও তাদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে প্রবন্ধ লিখতেন। পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগে “গ্রামবার্তা” প্রকাশিকা বের করেন। প্রথমে এটি মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশ করা হলেও পত্রিকাটি কালক্রমে প্রথমে পাক্ষিক ও সবশেষে এক পয়সা মূল্যমানের সাপ্তাহিকীতে রূপান্তরিত হয়। এতে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান বিষয়ে প্রবন্ধ ছাপা হতো। এছাড়া ব্রিটিশ নীলকরদের শোষণের বিভিন্ন ঘটনাও ছাপা হতো। চার-ফর্মার এই মাসিক পত্রিকার মূল্য ছিল পাঁচ আনা। শেষে এক পয়সার সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়।

২০১৭ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়/ঢাকা ট্রিবিউন

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার সম্পাদিত “গ্রামবার্তা” প্রকাশিকা পত্রিকা কলকাতার গিরীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন যন্ত্রে প্রথম মুদ্রিত হয়। পরে ১৮৭৩ সালে কাঙ্গালের নিজ বাড়িতে প্রেস স্থাপনের পর সেখানেই প্রাচীন বাংলা পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। পত্রিকাটিতে প্রজাদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা তুলে ধরা হতো সাহসিকতার সঙ্গে। সামাজিক সমস্যা-নিপীড়ন, শোষণ কিংবা যেকোনো অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হতো “গ্রামবার্তা” পত্রিকায়। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ও দেশি জমিদারদের হুমকি তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

প্রায় ১৮ বছর ধরে রাজশাহীর রানী স্বর্ণকুমারী দেবীর সহায়তায় এটি চালানোর পর আর্থিক সংকট এবং সরকারের নিবর্তনমূলক আইনের কারণে বন্ধ করে দিতে হয়। এর পর থেকে কাঙ্গাল হরিনাথের বাস্তুভিটায় জরাজীর্ণ ভবনে ছাপাখানাটি রাখা ছিল। অবশেষে সেটি জাদুঘরে নেওয়া হচ্ছে।