Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আত্মহত্যা সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে যা মেনে চলতে হবে

  • আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিরা অন্যের আত্মহত্যার খবরে প্রভাবিত হতে পারেন
  • সেলিব্রেটি বা বিখ্যাত ব্যক্তিদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতা প্রয়োজন
আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৪, ১১:১৬ এএম

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে আত্মহত্যার নীরব মহামারি চলছে। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর কমপক্ষে ১৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। আর পুরো বিশ্বে বছরে আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করেন।

তাই, আত্মহত্যাকে সাধারণ কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে কমবয়সীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আত্মহত্যাকে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত বাংলাদেশি গবেষকদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অন্তত প্রতি দশ জনে একজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা রয়েছে।

তবে শুধু অল্পবয়সীরাই নন, সকল বয়সীদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। এক্ষেত্রে আশার কথা হলো, আত্মহত্যাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ, পরিবার, স্বজন, বন্ধু কিংবা আশেপাশের মানুষ একটু সচেতন, একটু যত্নশীল হলেই বেশিরভাগ আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আত্মহত্যার পেছনে বিভিন্ন ধরনের কারণ থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকেই আত্মহত্যার অন্যতম প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। 

আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, তারা অন্যের আত্মহত্যার খবরে নিজেরাও প্রভাবিত হতে পারেন। তাই বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিসএমএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাহ্‌উদ্দিন কাউসার বিপ্লব ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বর্তমানে বিশ্বে আত্মহত্যা একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও আত্মহত্যার হার কমিয়ে আনা অন্যতম লক্ষ্য। আত্মহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম সবার দায়িত্ব রয়েছে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে আত্মহত্যা প্রতিরোধে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পত্রিকা “মনের খবর” এর এই সম্পাদক বলেন, “আজকাল গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে বেশি বেশি ভিউ পাওয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে বলে অনেকেই মনে করেন। বেশি বেশি ভিউ পাওয়ার আশায় অনেকেই আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও খুব চটকদারভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন।  ব্যক্তি কীভাবে আত্মহত্যা করলেন সেই বর্ণনা অনেকেই তুলে ধরেন, কিংবা সুইসাইডাল নোট পাওয়া গেলে সেটিতে কী লেখা ছিল; সেটিও প্রকাশ করেন। এতে করে আত্মহত্যাপ্রবণ অন্য ব্যক্তিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ধরনের সংবাদে আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিরা প্ররোচিত হতে পারেন।”

তবে শুধু গণমাধ্যম নয়; কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে তার ছবি এবং ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো পোস্ট দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাড়িত সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলছেন বাংলাদেশ অ্যাসোশিয়েশন অব সাইক্রিয়াটিস্টের (বিএপি) এই সাবেক সহ-সভাপতি।

তিনি বলেন, “একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, আত্মহত্যার প্রায় ৯০%-ই ঘটে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে। তাই, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সমাজের আয়না হিসেবে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমকে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।”

একইসঙ্গে গণমাধ্যমে আত্মহত্যা সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়িকা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।

সহায়িকায় বলা হয়েছে- 

সংবাদ পরিবেশনকালে করণীয়

  • আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহজ ও সংবেদনশলী ভাষায় সঠিক তথ্য তুলে ধরে জনগণকে সচেতন করা
  • আত্মহত্যা প্রতিকারে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা কোথায় কীভাবে, কী ধরনের সহায়তা ও চিকিৎসা পেতে পারে, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য উপস্থাপন
  • মানসিক চাপ, আত্মঘাতী এবং নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা মোকাবিলায় কীভাবে সাহায্য পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে সহায়ক প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ
  • সেলিব্রেটি/বিখ্যাত ব্যক্তিদের আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করে যথাসম্ভব সীমিত তথ্য দেওয়া
  • শোকগ্রস্ত পরিবার বা বন্ধুদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ ও পরিবেশনে তাদের মানসিক অবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা, যেন প্রশ্ন ও মন্তব্যে তারা বিব্রত না হন।

সংবাদ পরিবেশনকালে বর্জনীয়

  • আত্মহত্যার সংবাদটি খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রকাশ না করা, সংবাদটির পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে চলা এবং শিরোনামে আত্মহত্যা শব্দটি পরিহার করা
  • এমন কোনো ভাষা ব্যবহার না করা, যেন মনে হয় আত্মহত্যা একটি স্বাভাবিক ঘটনা অথবা আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান
  • আত্মহত্যার স্থান, পদ্ধতি, ব্যবহৃত উপকরণ ও ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ না করা
  • উদ্দীপক ও আকর্ষণীয় শিরোনাম এড়িয়ে চলা
  • ছবি, ভিডিওি ফুটেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো লিংক বা স্ক্রিনশট গণমাধ্যমে প্রকাশ না করা।

আত্মহত্যার সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনকারী সংবাদকর্মী নিজেও ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে তাদের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণ করারও পরামর্শ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়িকা

   

About

Popular Links

x