Tuesday, June 09, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যেভাবে শিশুদের মধ্যে বাড়ছে ‘কসমেটিকোরেক্সিয়া’

বিশেষ করে ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে

 

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

আট বছর বয়সী রোদেলার (ছদ্মনাম) পড়ার টেবিল জুড়ে এখন আর রূপকথার গল্পের বই বা রংপেন্সিল নেই। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে রেটিনল সেরাম, নিয়াসিনামাইড, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড আর নামী-দামী ব্র্যান্ডের ফেসওয়াশ। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আর রাতে ঘুমানোর আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অন্তত ৫টি ধাপ পেরিয়ে স্কিনকেয়ার বা ত্বকের যত্ন না নিলে তার দিনই কাটে না। রাইসা একা নয়, বর্তমান সময়ের এক বড় অংশের অবুঝ শিশুরা ভুগছে এক নতুন মানসিক ও শারীরিক ব্যাধিতে, যার চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত নাম - ‘কসমেটিকোরেক্সিয়া’। 

কসমেটিকোরেক্সিয়া কী?

সহজ কথায়, কসমেটিকস এবং স্কিনকেয়ার পণ্যের প্রতি শিশুদের এই অতিরিক্ত ও ক্ষতিকর আসক্তিই হলো কসমেটিকোরেক্সিয়া। বিশেষ করে আট থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা (যাদের প্রাক-কিশোর বা 'টুইন' বলা হয়) এই ব্যাধিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা ইউটিউবে ‘গেট রেডি উইথ মি’ হ্যাশট্যাগের ভিডিওগুলো এখন শিশুদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। ইনফ্লুয়েন্সাররা কীভাবে একের পর এক প্রসাধনী ত্বকে মাখছেন - তা দেখে অবচেতনভাবেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছে শিশুরা।

এর ওপর রয়েছে বহুজাতিক কসমেটিকস কোম্পানিগুলোর চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনী কৌশল। উজ্জ্বল রঙ, কার্টুন ক্যারেক্টার বা ফলের সুবাসযুক্ত আকর্ষণীয় প্যাকেজিংয়ে বড়দের অ্যান্টি-এজিং বা স্কিন-ব্রাইটেনিং পণ্যগুলো এমনভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে, যা সহজেই শিশুদের প্রলুব্ধ করে। ফলে, যে বয়সে মাঠে ধুলোবালি মেখে খেলার কথা, সেই বয়সে শিশুরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ত্বকের ‘বার্ধক্য’ রোধ করতে!

শিশুদের ত্বক প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি পাতলা, নরম এবং সংবেদনশীল। চিকিৎসকদের মতে, এই বয়সে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় সম্পূর্ণ তৈরি হতে থাকে।

এই কোমল ত্বকে যখন রেটিনল, ভিটামিন-সি, আলফা হাইড্রক্সি অ্যাসিড কিংবা বিটা হাইড্রক্সি অ্যাসিড - এর মতো তীব্র রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়, তখন ত্বকের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এর ফলে খুব অল্প বয়সেই শিশুদের ত্বকে মারাত্মক অ্যালার্জি, র‍্যাশ, একজিমা, কেমিক্যাল বার্ন (রাসায়নিকের কারণে ত্বক পুড়ে যাওয়া) এবং স্থায়ী পিগমেন্টেশনের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এমনকি অকালেই তাদের ত্বক বুড়িয়ে যাচ্ছে।

হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের সরলতা, বাড়ছে মানসিক রোগ

কসমেটিকোরেক্সিয়া শুধু শিশুদের শরীরেই ক্ষত তৈরি করছে না, এটি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রসাধনীর এই অন্ধ অনুকরণ শিশুদের মনে এক ধরণের গভীর হীনম্মন্যতা ও ‘বডি ডিসমরফিয়া’ (নিজের চেহারা নিয়ে তীব্র অসন্তুষ্টি) তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিল্টার বা মেকআপের কৃত্রিম রূপকে তারা ‘আসল সৌন্দর্য’ মনে করছে। ফলে নিজের স্বাভাবিক চেহারা নিয়ে তাদের মনে তীব্র ক্ষোভ, বিষণ্ণতা ও সামাজিক উদ্বেগের জন্ম হচ্ছে, যা তাদের শৈশবের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এ ট্রেন্ড থেকে বাঁচার উপায়

এই ভয়াবহ ট্রেন্ড থেকে শিশুদের রক্ষা করতে অভিভাবক এবং সমাজকে এখনই কঠোর ভূমিকা নিতে হবে:

সচেতনতা ও পর্যবেক্ষণ: অভিভাবকদের জানতে হবে, ১২-১৩ বছর বয়সের আগে শিশুদের ত্বকে ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ছাড়া আর কোনো রাসায়নিকের প্রয়োজন নেই। সন্তান ইন্টারনেটে কী দেখছে, সেটির ওপর কড়া নজরদারি রাখতে হবে।

ব্র্যান্ডগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ: বিশ্বের অনেক দেশে ইতিমধ্যেই শিশুদের কাছে ক্ষতিকর অ্যান্টি-এজিং পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ বা সীমিত করার দাবি উঠছে। বাংলাদেশেও কসমেটিকস বিক্রির ক্ষেত্রে বয়স নির্ধারণী নীতিমালা থাকা জরুরি।

আসল সৌন্দর্যের শিক্ষা: শিশুদের বোঝাতে হবে যে, বিজ্ঞাপনী ঝলকানি বা নিখুঁত ত্বকের ধারণাটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম। তাদের ভেতরের গুণাবলি ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে উৎসাহ দিতে হবে।

রূপচর্চার ভুল স্রোতে ভেসে গিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন অকালেই কৃত্রিমতার আড়ালে হারিয়ে না যায়। প্রসাধনীর বিষাক্ত রাসায়নিকের চেয়ে শিশুর ডায়েরির পাতায় আঁকা জলরং কিংবা খেলার মাঠের ধুলোবালি অনেক বেশি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর। শৈশবকে শৈশবের মতোই সতেজ থাকতে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

   

About

Popular Links

x