১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ আকস্মিকভাবে হয়নি। বছর বছর ধরে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সুবর্ণ ফল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। যার একক নেতৃত্বের কারণে মুক্তিযুদ্ধের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের রূপান্তর ঘটে, যার একক নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার ঘোষণায় ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, সেই মধ্যমণি ছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এই মহান নেতার রাজনৈতিক অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে শোকের দিন। এদিন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তার পরিবারের অন্যান্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। খুনিরা বাঙালি জাতির ললাটে এঁকে দেয় এক অমোচনীয় কলঙ্ক তিলক যা জাতির জন্য চিরদিন লজ্জা, কষ্ট, দুঃখ ও শোকের এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান একটি যমজ শব্দ। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করা যায় না। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি। এই সত্য অস্বীকার করে যারা বিতর্ক সৃষ্টি করতে চায় তারা স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি। এরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য বাঙালি হয়ে বাঙালিকে হত্যা করেছে। এরাই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শকে নস্যাৎ করে জাতিকে বিভক্ত করার লক্ষ্যে হঠাৎ করে রাতারাতি আবিষ্কার করে “বাংলাদেশি” জাতীয়তাবাদ।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন মেজর শরীফুল হক ডালিম। পঁচাত্তরে ডালিমের বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর ৬ মাস। তিনি সামরিক বাহিনীর আইনভঙ্গের কারণে মেজর পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। তবে চাকরি হারালেও মেজর ডালিমের বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাসভবনে অবাধ যাতায়াত ছিল। শুধুমাত্র পরিবারের সদস্য ও অত্যন্ত নিকটাত্মীয় ছাড়া বাসার দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার অনুমতি কারও না থাকলেও ডালিমের ছিল। কারণ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো বঙ্গবন্ধু ডালিমকে খুব স্নেহ ও বিশ্বাস করতেন।
কথায় বলে, “ঘরের শত্রু বিভীষণ”, হয়েছেও তাই। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে ডালিম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৫ আগস্ট পঁচাত্তরের সকালে এই শরীফুল হক ডালিম উচ্চস্বরে ঢাকা বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর প্রথম ঘোষণা করেন।
১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞ নিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহকে অনেকেই দায়ী করে থাকেন। ওই সময় তিনি দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। তবে তিনি এ কথা মানতে নারাজ।
এ প্রসঙ্গে তিনি বিভিন্ন কারণ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
অনেকে বলেন, সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ্যতা অনুযায়ী তখন জিয়াউর রহমানের বাহিনী প্রধান হওয়ার কথা। কিন্তু জেনারেল ওসমানীর পরামর্শে নাকি সেদিন জেনারেল জিয়াকে সেনাপ্রধান না করে জেনারেল শফিউল্লাকে করা হয়েছিল। আসলেই কি তাই?
যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে প্রশ্ন আসবে কেন জেনারেল ওসমানী বঙ্গবন্ধুর কাছে এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন?
১৯৮৭ সালে কে এম শফিউল্লাহ স্টকহোমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এর আগে তিনি ছিলেন কানাডায় হাইকমিশনার। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে কোনো কারণ ছাড়াই তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি এস ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি ছিলেন দেশের প্রথম সেনানায়ক। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নিহত হওয়ার সময় তিনি ছিলেন সেনাপ্রধান।
রাষ্ট্রদূত হিসেবে স্টকহোমে দায়িত্ব পালনকালে আমার সঙ্গে তিনি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল জিয়া একসময় জেনারেল ওসমানীকে কমান্ডিং চিফ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা করেন।”
শফিউল্লাহ বলেন, “জিয়ার ভাষ্য ছিল জেনারেল ওসমানী নাকি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। সুতরাং তরুণদের মাঝ থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। আমি তার এই প্রস্তাবের প্রতিবাদ করি এবং এ ব্যাপারে আমার সাথে আর কোনো কথা না বলার জন্য বলি।”
শফিউল্লাহ বলেন, “মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে জিয়ার এমন আরও অনেক ঘটনা আছে। যা প্রমাণ করে জেনারেল জিয়া একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ক্ষমতালোভী ব্যক্তি ছিলেন।”
তবে কি এই কারণেই জেনারেল জিয়াকে সেনাপ্রধান না করে আপনাকে করা হয়েছিল, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আরও অন্যান্য সিনিয়রদের রেখে আমাকে কেন চিফ অব স্টাফ বানানো হলো, তা আমি নিজেই বলতে পারব না। তবে আমাকে যেদিন জেনারেল ওসমানী দায়িত্বভার নেওয়ার জন্য ডেকেছিলেন তখন আমি ওসমানীকে বলেছিলাম, ‘আমি কেন? অন্যরা কোথায়?’”
- অন্যরা কারা?
- কর্নেল রেজা কোথায়? -
- কর্নেল রেজা রিজাইন করেছে।
তারপর মেজর দত্তের কথা বললে ওসমানী আমার ওপর রেগে গিয়ে বললেন, “ডু ইউ থিঙ্ক হি ইজ ক্যাপাবল?”
আমি এর কোনো উত্তর না দিয়ে তখন জিয়ার কথা বললাম। তিনি তখন রেগে গিয়ে আমাকে বললেন, “আর ইউ আর্গুয়িং? গেট আউট ফ্রম মাই অফিস।”
আমি তখন অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়ে জেনারেল রবের সঙ্গে আলাপ করি।
রব আমাকে বললেন, “এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমি বললাম তিনি তো নিজেই থাকতে পারেন।”
জেনারেল রব বললেন, “৭ এপ্রিল ওসমানী সাহেব সামরিক বাহিনী ছেড়ে জাতীয় সংসদে যোগ দিচ্ছেন।”
জেনারেল শফিউল্লাহর উপরোক্ত সাক্ষাৎকার এবং পরবর্তীতে দেশের রাজনীতিতে জিয়ার কার্যকলাপ প্রমাণ করে সেদিন কেন জেনারেল ওসমানী তাকে সেনাপ্রধান করার প্রস্তাব দেননি, সে সম্পর্কে কি ধারণা করা যায়?
জেনারেল ওসমানী কি জেনারেল শফিউল্লাহকে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন? অন্যদিকে জেনারেল জিয়ার প্রতি কি ওসমানীর সন্দেহ ছিল? সম্ভবত একমাত্র এই কারণেই ওসমানী জিয়ার বদলে শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
এ কারণেই জেনারেল শফিউল্লাহর সমালোচকরা বলে থাকেন, “তার প্রতিদান দিতে তিনি সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।”
এখানে উল্লেখযোগ্য, জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ একই ব্যাচে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। তিনি শফিউল্লাহর সিনিয়র ছিলেন না।
এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে জেনারেল শফিউল্লাহ বলেন, “আমরা একই ব্যাচে কমিশন লাভ করি। তবে লিখিত পরিক্ষায় তিনি আমার চেয়ে এক নম্বর বেশি পান।”
অভিযোগ রয়েছে, বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আর্মির যে ট্রুপ্স পাহারার দায়িত্বে ছিল, কৌশলে আগের দিন তাদের সরিয়ে দেয় রশিদ, ফারুক, ডালিম, নুর, শাহরিয়ার চক্র। সেখানে নিয়োজিত করা হয় নিজেদের অনুগত সিপাহীদের।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের চোখের আড়ালে এটা কীভাবে সম্ভব হলো? তাহলে কি গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িত ছিলেন? তখন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ভূমিকা কী ছিল?
জানা যায়, খুনিরা যখন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণ করে তখন বাসায় পাহারারত সিপাহিরা তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। একমাত্র করেছে পুলিশ। তবে অনেকে বলেন, তখন নাকি একমাত্র শেখ কামাল ও শেখ জামাল কিছুটা বাধার সৃষ্টি করেছিলেন।
এখানে আমি ১৪ আগস্ট বিকেলের একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ওইদিন বিকেলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গণভবনে যান কুমিল্লার তাহের উদ্দিন ঠাকুর। বঙ্গবন্ধু তাহের ঠাকুরকে “সাংবাদিক ঠাকুর” বলে সম্বোধন করতেন। তখন তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার তথ্য ও বেতার প্রতিমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু তাকে খুব স্নেহ করতেন।
তবে আমি বলব সাংবাদিক নয়, তাহের উদ্দিন ঠাকুর ছিলেন “সাংঘাতিক” ঠাকুর। কী ভয়ঙ্কর ব্যাক্তি এই ঠাকুর! ১৪ আগস্ট সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলেন গনভবন। বঙ্গবন্ধু তখন হেঁটে হেঁটে গণভবনের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তাহের ঠাকুরও নেতার সঙ্গে সঙ্গে বাগানে হাঁটছিলেন। ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার সব পরিকল্পনা শেষ করে এই সাংঘাতিক ঠাকুর এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করতে। কী ভয়ঙ্কর এক বিশ্বাসঘাতক।
তবে সেদিন ঠাকুর বঙ্গবন্ধুর সাথে হাঁটতে হাঁটতে কী কথা বলেছিলেন তা আজও সবার কাছে অজানা রয়ে গেল। কারণ আমার বাবা আলী মেহেদী খান দূর থেকে এই দৃশ্য শুধু অবলোকন করেছেন। তিনি তাদের দু’জনের কথাবার্তা শুনতে পাননি। বাবা তখন বঙ্গবন্ধুর ডেপুটি চিফ সিকিউরিটি অফিসার ছিলেন।
আমার বাবা আলি মেহেদী খান ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডিপুটি চিফ সিকিউরিটি অফিসার ছিলেন। ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় গণভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসভবনে ফেরার সময় যথারীতি তার গাড়িতে সঙ্গী ছিলেন তিনি। রাত ৮টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে সোবহানবাগ কলোনির সরকারি বাসভবনে ফেরেন তিনি। জাতির পিতার সঙ্গে এটাই ছিল বাবার শেষ দেখা।
একজন সাধারণ চাকরিজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন মানসিক সৌন্দর্যের বিশালতার সাক্ষী তিনি।
এখন ফিরে আসা যাক ১৫ আগস্টের সেই কালো অধ্যায়ে। ১৫ আগস্ট প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে জেনারেল শফিউল্লাহ বলেন, “১৫ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৫টা ৩০ মিনিটে আমার ডি এম আই সালাউদ্দিন এসে বলেন,
- স্যার আপনি কি ট্যাঙ্ক ও আর্টিলারিকে শহরে মুভ করার নির্দেশ দিয়েছেন?’’
- না
- কিন্তু তারা ইতোমধ্যে রেডিও স্টেশন ও শেখ মুজিবের বাসভবনের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
- স্টপ দেম। শাফায়েত জামিল কোথায়?
এই বলে সাথে সাথে আমি শাফায়েত জামিলকে ফোন করি । কারণ তিনি ছিলেন ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার।
- আপনি জানেন কী হচ্ছে?-
- কী ব্যাপার স্যার?
- আর্টিলারি নাকি মুভ করেছে?
- আমি জানি না স্যার
- আপনি যখন জানেন না, তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একে বন্ধ করুন। ফার্স্ট সেকেন্ড ও ফোর্থ বেঙ্গলকে যাওয়ার জন্য বলুন।
“তারপর আমি বঙ্গবন্ধুকে ফোন করি। তার ফোন এনগেজড পাই। তখন আমি নাভাল চিফ খান ও এয়ার চিফ খন্দকার সাহেবের সঙ্গে কথা বলি। ওনারা এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে বললেন।”
শফিউল্লাহ বলেন, “তারপর আমি জিয়াকে ফোন করে বলি, ‘আর্মির মধ্যে কি কিছু হচ্ছে, আপনি কিছু জানেন?” তিনি আমার কথা শুনে বললেন, তাই নাকি?’ আমি তখন ওনাকে আমার এখানে আসতে বললাম।”
“এরপর আমি খালেদ মোশারফকে ফোন করলে তিনি বললেন তিনিও কিছু জানেন না। পরে আমি শাফায়েত জামিলকে ফোন করলাম। কিন্তু কোনো জবাব পাইনি। এমন করতে করতে বেশ কয়েক মিনিট পার হয়ে গেল। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে লাইন পাই।”
তিনি আমাকে বললেন, “শফিউল্লাহ আমার বাড়ি আক্রমণ করেছে। কামালকে মনে হয় মেরেই ফেলেছে। তুমি ফোর্স পাঠাও।” আমি ওনাকে তখন শুধু এতটুকুই বলতে পেরেছি , “স্যার কেন ইউ গেট আউট। আই এম ডুইং সামথিং। ব্যাস তখনি শুনতে পেলাম টেলিফোনে গুলির আওয়াজ। আর এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার শেষ কথা।”
পরবর্তী ঘটনা জানতে চাইলে জেনারেল শফিউল্লাহ বলেন, “২০-২৫ মিনিট পর জিয়া সম্পূর্ণ ক্লিন শেভে সামরিক পোশাকে অফিসিয়াল গাড়িতে আমার বাসায় আসেন। গাড়ি ড্রাইভ করছিল তার অফিসিয়াল ড্রাইভার। অন্যদিকে খালেদ মোশারফ সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় তার প্রাইভেট কারে পায়জামা ও স্যান্ডেল পরে আমার এখানে আসেন। তখন আমার পরনেও ছিল পায়জামা।”
“আমি দেরি না করে অফিসে গেলাম। গিয়ে দেখি আমার অফিস ট্যাঙ্ক দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। তখন আমি চেষ্টা করছিলাম শাফায়েত জামিল বাহিনীর কী হলো তা বের করার জন্য। জিয়া তখন আমাকে বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমি যেন খালেদ মোশারফকে না পাঠাই।’ তবুও আমি খালেদকে পাঠাই। খালেদ ওখানে গিয়ে বলেন, ‘স্যার ওরা তো আমাকে আসতে দিচ্ছে না। আমি বললাম তারা কারা? এখানে আমাকে কিছু বলতে দিচ্ছে না আসতেও দিচ্ছে না। আই ডোন্ট কেয়ার।’ তারপর তিনি আবার ফোন করে বললেন, ‘ওকে দে আর অ্যালাউয়িং মি ফর ফিফটিন মিনিটস স্যার।’ কিছু সময় পরে খালেদ মোশারফ এলেন এবং বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু ইজ ডেড এন্ড ফুল আর্মি হ্যাজ রিভলটেড এন্ড এন্টায়ার আর্মি হ্যাজ সেলিব্রেটেড।’ আমি বললাম, ‘আই ডোন্ট টেক ইট।’”
এখানে জেনারেল জিয়ার ভূমিকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি আমাকে বলেন, “জিয়াকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি সবকিছুতেই রেডি ছিলেন। তাই হয়তো তিনি ১৫ আগস্ট এত সকালে সম্পূর্ণ সামরিক পোশাকে ফিটফাট এমনকি ক্লিন শেভড অবস্থায় প্রস্তুত ছিলেন। তাই আমার মনে প্রশ্ন জাগল, তাহলে কি তিনি কারও আদেশের অপেক্ষা করছিলেন?”
আমি তখন জেনারেল শফিউল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, “তার মানে কি আপনি বলতে চান ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের খবর জিয়াউর রহমান আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন?”
উত্তরে জেনারেল শফিউল্লাহ বলেন, “শুধু অনুমানই নয়, জেনারেল জিয়া সবকিছুই জানতেন।”
সমালোচকরা বলেন, সেনাপ্রধান হিসেবে এখানে জেনারেল শফিউল্লাহ বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেদিন যে আস্থার ওপর নির্ভর করে তাকে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে তার যোগ্যতা ও ব্যর্থতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে। কারণ সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত কয়েকজন মেজর, কর্নেল রশিদ-ফারুক ও খন্দকার মোস্তাকসহ আরও কিছু ব্যক্তি মিলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরিকল্পনা করল। অথচ সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ, অন্যান্য সামরিক অফিসার ও সেনাপ্রধান কিছুই জানতে পারলেন না?
তাই সমালোচকরা বলেন, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যা প্রমাণ করে সেনাপ্রধান জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ এখানে কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছেন। এখানে কর্নেল রেজা, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কম্যান্ডার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ, মুক্তিযোদ্ধা মেজর সি আর দত্ত কিংবা সমতুল্য অন্য কাউকে (জিয়া নয়) সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দিলে হয়তবা এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত।
অন্যদিকে, এ কথাও সত্য যে কে এম শফিউল্লাহ আসলেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত অনুগত ও নেতৃত্বে বিশ্বাসী একজন ব্যক্তি। দল তাকে অবহেলা করলেও তিনি ড. কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকীসহ আরও অন্যান্যদের মতো আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাননি। এখনো এই বৃদ্ধ বয়সে জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ সেক্টর কমান্ডার ফোরাম এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন।
মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু
নির্বাচিত বিচারপতি স্টকহোম আপিল কোর্ট, নির্বাচিত সদস্য সুইডিশ লেফট পার্টি স্টকহল্ম ডিসট্রিক্ট ব্র্যাঞ্চ