আমি কবি বা লেখক নই তাই কোনো কবির বা সাহিত্যকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আমার আলোচনা বা লেখার যোগ্যতা নাই। তবে কানাডায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কবি আসাদ চৌধুরীর সাথে আমার পরিচয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের জাতীয় দিবসসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান আমরা ভার্চুয়ালি আয়োজন করতাম। এমনই একটি ভার্চুয়াল আয়োজনে কবি আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে তার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়।
পরবর্তীতে মহামারি কমলে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কানাডার ভারতীয় হাইকমিশনের সাথে অটোয়াতে আমরা একটি যৌথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে কবি সেখানে সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেদিন মঞ্চে কবিকে বক্তৃতা দেওয়ায় জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলে আমাদের সকলকে অবাক করে দিয়ে কবি বাংলায় তার বক্তব্য শুরু করেন। সেদিন মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনি এবং কথা বলাটাও যে শিল্পের একটি অসাধারণ রুপ সেটি উপলব্ধি করি। পাশাপাশি প্রবাসে এ রকম একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগ ও ব্যক্তি হিসেবে তার গভীর আত্মবিশ্বাসী মনোভাবের সাথে আমি প্রথম পরিচিত হই। তিনি তার বক্তব্যে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ এবং আমাদের মুক্তি সংগ্রামে ভারতের জনগণ ও সরকারের সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে, কানাডায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসারে হাইকমিশনের বিভিন্ন উদ্যোগে আমি নিয়মিত আসাদ চৌধুরীর পরামর্শ গ্রহণ শুরু করি। এই প্রক্রিয়ায় কবি ও তার পরিবারের সাথে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেড়ে ওঠে।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে কবি আসাদ চৌধুরী তার কণ্ঠ ও লেখালেখির মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীনতা উত্তরকালে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে কবি আসাদ চৌধুরী সারাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। পাশাপাশি, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার চেতনাকে করেছেন তার সাহিত্য কর্মের অন্যতম প্রধান উপজীব্য। শেষ বয়সে প্রবাস জীবনেও কবি তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। উত্তর আমেরিকাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রচারে কবি ছুটে বেড়িয়েছেন এক শহর থেকে আরেক শহরে।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমাদের কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তার প্রতিফলনের জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। গত ২০২১ সালের অক্টোবরে কুমিল্লাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হলে আসাদ চৌধুরী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আমাকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে আশু ব্যবস্থা নিতে বলার জন্য অনুরোধ করেন। এছাড়া গত মার্চ মাসে ২০২৩-এ পঞ্চগড়ে আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর স্বাধীনতা বিরোধী মহলের হামলা হলে কবি গভীর দুঃখবোধ করেন। কবিসহ কানাডার ১০০ জনেরও বেশি সিনেটর ও সংসদ সদস্যদের অনুরোধে আমি ব্যক্তিগতভাবে জেলা প্রশাসক ও এসপিসহ স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় নিয়ে আসাসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অনুরোধ করি। কবি সব সময় বলতেন বাংলাদেশে যেন কখনই ২০০১ সাল নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর যে অত্যাচার হয়েছিল সেরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। কবি প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছড়িয়ে দিতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন আমৃত্যু মুক্তিযোদ্ধা।
দীর্ঘদিন ধরেই কবি ব্লাড ক্যান্সারসহ অন্যান্য উপসর্গে ভুগছিলেন। শেষের দিকে হার্টের সমস্যাও ভুগছিলেন। এত কিছু স্বত্বেও কবিকে আমি দেখেছি জীবন ও প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর একজন মানুষ হিসেবে। হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে আমি ও আমার সহধর্মিণী তাকে দেখতে যাই। কবির কন্যা আমাকে জানালেন যে, আমি হাসপাতালে আসার আগে আগে কবির শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। হাসপাতালে তিনি পূর্ণ জ্ঞানে পুরোপুরি চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে সালামের উত্তর দিয়েছিলেন এবং যতক্ষণ হাসপাতালে ছিলাম আমার হাত ধরেছিলেন। এখনো আমি আমার হাতে তার স্পর্শ অনুভব করি। আমি আশা করেছিলাম কবি সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।
কবি আর ফিরে আসেননি। গত ৫ অক্টোবর ২০২৩ তারিখ ভোর রাতে আমাদের সকলকে ছেড়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কবির মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক আমি ঢাকায় সরকারের সর্বোচ্চ মহলসহ পররাষ্ট্র সচিবের সাথে যোগাযোগ করলে তারা সাথে সাথে কবির মৃতদেহ দেশে নেওয়ার সমস্ত আর্থিক ব্যয় নির্বাহের অনুমোদন প্রদান করেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার আমাদের সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাধ্যমত সব কিছু করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যদের ইচ্ছায় তাকে কানাডাতেই সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কানাডায় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর কানাডায় কোভিড-১৯ অতিমারির কিছু বাধ্যবাধকতার কারণে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় সম্মানের আয়োজন আমরা ভার্চুয়াল মাধ্যমে সম্পন্ন করেছি। হাইকমিশনার হিসেবে কবি আসাদ চৌধুরীই প্রথম মুক্তিযোদ্ধা যাকে প্রথম আমি সশরীরে উপস্থিত থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাই এবং আমি কবির পরিবারের হাতে সরকারের পক্ষ থেকে সম্মানসূচক একটি সাইটেসন নিজ হাতে তুলে দেই। এটা করতে পেরে আমি শুধু সরকারি দায়িত্বই পালন করিনি, আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করেছি। তার জানাজায় অংশ নেওয়াসহ নিজ হাতে কবির কবরেও মাটি দেই। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কানাডায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমি একজন অভিভাবকে হারালাম।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার মেঝভাইও অংশ নিয়েছিলেন। বিদেশে থাকার কারণে আমার ভাইয়ের জানাজায়ও আমি অংশ নিতে পারিনি। কবির কফিনে আমি যখন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাটি জড়িয়ে দিয়েছি আমার মনে হয়েছে আমার ভাইসহ সকল মুক্তিযোদ্ধাদের আমি সম্মান জানাচ্ছি। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যে ৩০ লাখ ভাই-বোন শহিদ হয়েছেন তারাসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা ভাই-বোনদের সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক মানবতাবাদী এই সত্যলগ্ন কবি আসাদ চৌধুরী আজীবন অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রচার করেছেন। চারদিকে যখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছড়িয়ে পড়ছে তখন কবি আক্ষেপ করে লিখেছেন একটি কবিতা। সেটি দিয়েই এই এই লেখার পরসমাপ্তি টানছি:
‘আগুন ছিলো মুক্তি সেনার
স্বপ্ন-ঢলের বন্যায়-
প্রতিবাদের প্রবল ঝড়ে
কাঁপছিলো সব-অন্যায়।
এখন এ-সব স্বপ্নকথা
দূরের শোনা গল্প,
তখন সত্যি মানুষ ছিলাম
এখন আছি অল্প।’
কবি আসাদ চৌধুরী বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে তার সাহিত্য ও কর্মে।