শীর্ষের শীর্ষেন্দুর জন্মদিন

সন, তারিখ কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে সেটা “দেশ” পত্রিকার পূজা সংখ্যা ছিল। সাক্ষাৎকারে তার কাছে অনেকটা এভাবে জানতে চাওয়া হয়, “এত যে পূজা সংখ্যা প্রকাশ হচ্ছে, এতে সাহিত্যের মান নিচে নেমে যাচ্ছে কি-না? লেখকদের ওপর চাপ বাড়ছে কি?”

উত্তর তিনি দিয়েছিলেন এভাবে, “আমি তা জানি না। কারণ, আমি নিজে বায়না পেলে লিখতে বসি।” এই নগদে বিশ্বাসী অতলস্পর্শী জনপ্রিয় আমাদের কালের কিংবদন্তি লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। আজকের দিন ২ নভেম্বর যার জন্মদিন। 

শুভ জন্মদিন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়!

তীব্র লেখার ক্ষুধা নিয়ে যার ধরায় আবির্ভাব ১৯৩৫ সালে ময়মনসিংহে। ভারতবর্ষ ভাগের পর যে “বাঙাল” কলকাতায় পাড়ি জমান সপরিবারে। নিজের যোগ্যতায় বিরামহীন চেষ্টায় সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন “লেখক” হিসেবে। সীমান্ত পিলার একাকার হয়েছে যার সৃষ্টিকর্মে। এখন পর্যন্ত দুই বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় লেখক এই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। 

স্বীয় ভাষায় সাহিত্যপাঠের সামান্যতম অভিজ্ঞতা যার আছে, তার কাছে শীর্ষেন্দু জাদু অপরিচিত নয়। আমাদের বেড়ে ওঠার পরতে পরতে আছেন শীর্ষেন্দু, হুমায়ূন, সুনীল, সমরেশ। হুমায়ূন আহমেদ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কাছাকাছি সময়ে অদেখা ভুবনে পাড়ি জমান। সমরেশও বিদায় নিয়েছেন। এমন সব চলে যাওয়ায় হৃদয় ছিন্ন হয়। তবু মনে হয় আমরা ভাগ্যবান। কারণ, বিধি এখনও কেড়ে নেয়নি শীর্ষেন্দুকে। তিনি সক্রিয় আছেন। ঋজু হয়ে ধরে আছেন “জনপ্রিয় সাহিত্য”-এর প্রদীপ্ত মশাল। 
  
বিমূর্তকে পাল্লা পাথরে মাপা চলে না। সাহিত্যের “জনরা”, “প্যাটার্ন” যাই বলি তাও এর ভিন্ন নয়। কিন্তু দুঃখজনক সত্য বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী, পণ্ডিত, সমালোচকদের কাছে জনপ্রিয় সংস্কৃতি এক অচ্ছুত বিষয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দ, ভালো লাগায় এ গোত্রের এলার্জি। গালিগালাজে এর পরিচয় হয় “সস্তা” কখনও “বাজারি”। কিন্তু পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার এই চরম শিখরে “অবাজারি” বা “অবাণিজ্যিক” কিছুর অস্তিত্ব কি কেউ দেখাতে পারেন? তবু শীর্ষেন্দুদের মতোন অনেককে গালি হজম করতে হয়। আমরা ভুলে যাই একজন জনপ্রিয় লেখকের কীর্তি বিপুল পাঠক সৃষ্টি। বইয়ের প্রতি তার টানের সেতু নির্মাণ। সে পাঠক পরের সময়ে তার প্রতি আকৃষ্ট নাও থাকতে পারেন। পাঠ ভুবনে নিজের পথ বেছে নেওয়ার স্বিদ্ধান্তে কর্তৃত্ব ফলানোর কী?

নিজস্ব পাঠক সৃষ্টির অসামান্য ক্ষমতাধারী কথাশিল্পী শীর্ষেন্দুকে ভালোলাগে এ কারণেই। রাখঢাকহীনভাবে যিনি ক্যাশে বিশ্বাসী। প্রথমে কিশোরবেলায় তাকে চিনেছি ইন্ডিয়ান রাইটার হিসেবে। “দূরবীন” পড়ে কার ধ্রুবর জন্য মায়া লাগেনি? নিজের চৌকি পাতা ঘরেই “মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’’তে হারিয়ে গেছি। “কাগজের বউ”য়ে যশোধরার প্রেমে উত্তাল হয়েছি। উপুড় হয়ে, চিৎ হয়ে পড়েছি ভারি সাইজের “যাও পাখি”, “মানবজমিন”। বেড়াতে আমেরিকায় গিয়ে ভিক্ষুক দেখে ভ্রমণ কাহিনী লেখা শুরু করা “বাঙালের আমেরিকা দর্শন” পড়ে মুগ্ধ হয়েছি জাদুকর শীর্ষেন্দুর জন্যে। 
  
বাংলা চলচ্চিত্রও ভীষণভাবে ভর করা শীর্ষেন্দু স্তম্ভে। অসংখ্য সিনেমা হয়েছে তার গল্পভিত্তিক। বাংলাভাষী কোটি মানুষের বইয়ের তাক, পড়ার টেবিল, গাছতলা, স্নিগ্ধ পুকুরঘাটে পৌঁছেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। সাহিত্যিক তো কম নেই বাংলায়। তবু কেন কবির সুমনকে তার সমার্থক হয়ে থাকা গান “তোমাকে চাই” এ গাইতে হয়? -

“শীর্ষেন্দুর কোনও নতুন নভেলে, হঠাৎ পড়তে বসা আবোল-তাবলে”..

ঢাকাকে বাংলা ভাষার রাজধানী বলা শহরে প্রভাবশালী অনেকগুলো পত্রিকা নিজেদের নাম পর্যন্ত খুঁজে বের করতে পারেনি। তখন ধর তক্তা মার পেরেকের মতোন কপি পেস্ট করেছে এই জনপ্রিয় ধারার লেখকদের উপন্যাসের নাম থেকে। বিষয়টি বিস্ময়করই বটে!

কথাশিল্পীর জন্মদিন ক্ষণে প্রার্থনা করি তার সহস্রায়ুর। সক্রিয় কলম হাতে যেন শীর্ষেই থাকেন শীর্ষেন্দু।