মিথ বনাম বাস্তবতা

বয়ঃসন্ধিকাল কেবলই শারীরিক নয়

বয়ঃসন্ধিকালের মতো অতিদ্রুত প্রবাহমান একটি সময় কিশোর-কিশোরীদের জন্য শারীরিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই খুব স্পর্শকাতর। লক্ষণীয় বিষয় হলো, শারীরিক পরিবর্তনগুলো যত সহজে দৃষ্টিগোচর হয়, মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতাগুলো সেভাবে হয় না। অথচ, কৈশোর জীবনের সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ ও উচ্ছ্বসিত সময়। 

এর একটি বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি হচ্ছে, এ সময় মানুষের মস্তিষ্কের যৌক্তিক জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিপক্কতা অসম্পূর্ণ থাকে। বয়স্ক ব্যক্তিরা তাদের জ্ঞান ও যুক্তি প্রকাশে মস্তিষ্কের সম্মুখ অংশ ব্যবহার করেন, কিন্তু কৈশোরে তাদের এই অংশটি পূর্ণতা লাভ করে না। ফলে এমিগডালা নামে এক নিউক্লিয়াসের নিয়ন্ত্রণেই তারা চালিত হয়, যেটির অন্যতম মূল কাজ হচ্ছে আবগপ্রবণ আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা। এজন্যই কৈশোরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আবেগতাড়িত হয়। অথচ এই অবধারিত একটি বিষয় এখনো অনেক অনুন্নত এমনকি উন্নত সমাজেও উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে ওঠেনি। 

নিয়ন্ত্রকের নাম হরমোন   

বয়ঃসন্ধিকালীন সময়টা বলতে গেলে সম্পূর্ণটাই হরমোনের ক্রিয়া। আমাদের শারীরিক ও মানসিক সব ধরনের পরিবর্তনের পেছনেই এই হরমোন সক্রিয় ভূমিকা রাখে। শরীরে বয়ঃসন্ধিকালের যাত্রা শুরু হয় হাইপোথ্যালামাস পিটুইটারি গোনাডাল অক্ষের সক্রিয়করণের মাধ্যমে। এটি ইস্ট্রোজনে ও টেস্টোস্টেরনের মতো হরমোনের নিঃসরণকে ট্রিগার করে। এই হরমোন দুটোই মূলত বয়ঃসন্ধিকালে আমাদের যাবতীয় শারীরিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী।

YPF New Logo_Final_Dark Background

একইভাবে, এই সময়ে কিশোর-কিশোরীদের প্রায়শই আবেগের ঝড়-ঝঞ্ঝার পাহাড় অতিক্রম করতে হয়- সুখ থেকে বিরক্তি, দুঃখ থেকে রাগ, সবই যেন মুহূর্তের মধ্যেই হুটহাট পাল্টাতে থাকে। মুড সুইং, ডিপ্রেশন, ফ্রাস্ট্রেশন, স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, বন্ধুমহলের গুরুত্ব বৃদ্ধি, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ কিংবা প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতা- এই সব মানসিক দিকগুলো শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সমানতালে পাল্টাতে থাকে। আবার, এ সময়টাতে যে শারীরিক পরিবর্তনগুলো ঘটে তা কিশোর-কিশোরীদের মনে নিজেদের শরীর নিয়ে অতিরিক্ত আত্নসমালোচনার উদ্রেক ঘটায়। অনেকে আত্নবিশ্বাসী হয়, তো অনেকে আবার হীনমন্যতায় ভোগে। দুটোই তাদের মানসিকতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।

মেয়ে থেকে নারী, ছেলে থেকে পুরুষ হওয়ার মানসিক যাত্রা অনেকের জন্যই খুব একটা সহজ হয়ে ওঠে না। এ সময় তারা সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির মধ্য দিয়ে যায় তা হলো- আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা পরিচয় সঙ্কট। তারা তাদের আত্নবোধকে জানতে চায়, চিনতে যায়, প্রশ্ন করতে চায়। এই সময় কাছের মানুষদের সাথে সুস্থ সম্পর্ক ও পাশে থাকাটা জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেহেতু এ সময় স্বাধীনচেতা প্রবণতা বেশি থাকে, তাই পারিপার্শ্বিক সম্পর্কের গুরুত্বগুলোই প্রকাশ পায় অধিক হারে। এই সম্পর্কগুলোই আবার মানসিক সহমর্মিতা ও চাপ দুটোরই উৎস হতে পারে।

মানসিক সমস্যার সূত্রপাত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি তথ্যমতে, অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সূত্রপাত ঘটে ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই। আরও একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যেই আত্নহত্যার প্রবণতা বেশি। বোঝাই যাচ্ছে, বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য কতটা সংবেদনশীল হয়।

RHRN Horizontal_Black

এজন্য এ সময় মা-বাবা ও কাছের মানুষদের তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নিবিড় মনোযোগ রাখা অত্যাবশ্যক। তাদের সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক, বন্ধুত্বসুলভ আচরণ, পারস্পরিক আন্তঃসংযোগ যত মজবুত হবে, ততই তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও বিকাশের ভিত সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে। এই ভিতের ওপরই নির্ধারিত হয় তার পরবর্তী জীবনের পথচলা, তার ব্যক্তিত্ব, ক্যারিয়ার, সব কোনদিকে যাবে। এজন্য বয়ঃসন্ধিকালে তাদের মনস্তাত্বিক পরিবর্তনগুলোর প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার আসলে কোনো বিকল্প নেই।

ইউথ পলিসি ফোরাম ও 'অধিকার এখানে,এখনই' প্রকল্পের যৌথ প্রয়াসের মিথবাস্টার সিরিজের এটি চতুর্থ পর্ব। এই প্রকল্প নিয়ে আরো জানতে ভিজিট করুন www.ypfbd.org