“আশির দশকের শেষদিকের কথা, আমার দাদি তার বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য পাত্রী হিসেবে পছন্দ করলেন আইরিন ফেরদৌস ছন্দাকে। ছন্দাও ছিলেন মুক ও বধির। হায়দারউজ্জামান আল সিদ্দিকী (কল্লোল) নামে সেই মানুষটি আমার বাবা। আমার দাদি এবং মায়ের ভগ্নিপতি চাকরিসূত্রে পরিচিত ছিলেন।”
কল্লোল ও ছন্দার বসবাস এক নৈঃশব্দের জগতে। দু’জনের নৈঃশব্দের শব্দ তারা ভাগাভাগি করে আসছেন প্রায় তিন যুগ ধরে।
“যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এই নৈঃশব্দের মাঝেই আমার বাবা-মা পরস্পরের মাঝে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছেন। মুখে কিছু না বলেও তারা বৈবাহিক প্রতিশ্রুতি, সাহচর্য এবং জীবনের নানান চরাই-উৎরাই পার করে আসছেন একত্রে।”
বাবা-মায়ের পথচলার গল্প বলছিলেন কল্লোল-ছন্দা দম্পতির ছেলে নাসিফ (৩১)।
মুক ও বধির বাবা-মায়ের ঘরে বেড়ে ওঠা নাসিফ নিজের জীবনকে মেলাতে পারেন বলিউড সিনেমা “খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল” সিনেমার সঙ্গে। মণীষা কৈরালা ও সালমান খান অভিনীত সিনেমাটির গল্প গভীর দাগ কেটে যায় নাসিফের মনে। সেখানে এমনই এক দম্পতির কথা বলা হয়েছে যারা কথা বলতে পারতেন না। একদিন তাদের ঘর আলো করে আসে একটি শিশু। নবজাতকের বাবা-মায়ের মতো সমস্যা ছিল না।
প্রাত্যহিক জীবনে সংসারের কাজকর্ম ভাগাভাগি করে নেন নাসিফের বাবা। সব ধরনের পরিস্থিতির সমাধান করে নেন নিজেদের মতো। কলিংবেলের শব্দ যেহেতু তারা শুনতে পান না, তাই লাগিয়ে নিয়েছেন লাইট। কেউ বেল সুইচ টিপলে সেই বাতির জ্বলা-নেভা দেখে তারা অতিথিকে স্বাগত জানান।
নাসিফ বলেন, “কেউ কলিংবেল সুইচ টিপলে ঘরের ভেতরে বাতি জ্বলে-নেভে। আম্মু প্রায়ই বাসায় একা থাকেন, তাই তার সুবিধার্থে বেডরুম, ড্রয়িংরুম, ডাইনিং এবং রান্নাঘরে এমন বাতি লাগানো আছে। ডাইনিং আর রান্নাঘরেই তার বেশিরভাগ সময়টা কেটে যায়। তাই বাতিগুলো হিসেব করে বসানো হয়েছে যাতে তার চোখে পড়ে।”
কানে শুনতে না পাওয়া মানে তারা প্রতিবন্ধী, বিষয়টা এমন না। একটা ভিন্ন উপায়ে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন
তার কথায়, “কানে শুনতে না পাওয়া মানে তারা প্রতিবন্ধী, বিষয়টা এমন না। একটা ভিন্ন উপায়ে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন। প্রয়োজনে তারা ভিডিও কলেও যোগাযোগ করেন।”
প্রযুক্তিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নাসিফ বলেন, “এর মাধ্যমে আমি বাইরে থেকেও বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি।”
সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের বিষয়ে তিনি বলেন, “আর দশটা শিশু যেমন মায়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলে, আমার জন্য ইশারায় মায়ের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি তেমন। বাবাকে কখনো আলাদা করে বিষয়টি শিখতে হয়নি।”
সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে
বাবাকে শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দাদির প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই নাসিফের। তার দাদি সত্যিই চেয়েছিলেন ছেলেকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বধির ব্যক্তিরা কেবল পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেতেন। কারণ তাদের এর বেশি পড়াশোনা করার সুযোগ ছিল না। তাই তার বাবাকে পড়াশোনা শিখতে হয়েছে বাড়িতে। বিশেষ পরীক্ষায় ম্যাট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হন।
ঢাবিতে ভর্তি হয়ে কল্লোল ছিলেন উৎফুল্ল। মেধাবী এই মানুষটিকে পছন্দ করতেন চারুকলার তৎকালীন ডিন ও সহপাঠীরা। কিন্তু একজন অধ্যাপকের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন তিনি। ওই শিক্ষক মনে করতেন কল্লোল চারুকলার যোগ্য নন। সে কারণে তার পড়াশোনা করা হয়ে ওঠে দুরূহ।
একসময় নাসিফের দাদি তার ছেলেকে সেই দুঃসহ পরিবেশ থেকে সরিয়ে আনেন। ঢাবিতে আর পড়া না হলেও দেশের প্রথম বধির ব্যক্তি হিসেবে আর্কিটেকচারে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন কল্লোল। বর্তমানে তিনি গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ে উপ-সহকারী আর্কিটেক্ট হিসেবে কর্মরত। মেঘনা সেতুসহ বহু অবকাঠামোর নকশা তার হাতে করা।
নাসিফ মনে করেন, “শ্রবণক্ষমতা না থাকলেও বধির ব্যক্তিরা অন্যান্য মানুষের থেকে খুব বেশি আলাদা নন। যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে জিনিসটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সেটি হলো শব্দের বিপরীতে ইশারার ব্যবহার। এছাড়া, তাদের সমস্ত কাজকর্ম আর দশজন মানুষের মতোই। টেক্সাসে চমৎকার সব বধির মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, যারা সব ধরনের বৈপরীত্যকে জয় করেছেন।”
তার মতে, “বধির মানুষদের নিয়ে সাধারণ কিছু ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়া প্রয়োজন। একটা ভিন্ন উপায়ে যোগাযোগ করেন বলে তারা ‘অস্বাভাবিক’, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো- এ ধরনের মানুষজন রাগী কিংবা হিংস্র, যা পুরোপুরি ভুল এবং অবিবেচক। তারা বাইরের জগতের সঙ্গে একটা ভিন্ন উপায়ে যোগাযোগ করেন মাত্র।”