বইপোকাদের জন্য ঢাকার সেরা কিছু বুক ও স্টাডি ক্যাফে

বইয়ের সঙ্গে কফি বা অন্যান্য কোমল পানীয় পরিবেশন মূলত ইউরোপ-আমেরিকার ধারা। কিন্তু প্রিয় বই হাতে নিয়ে আয়েশ করে চা বা কফিতে চুমুক দেওয়াটা যেকোনো ব্যস্ত-সমস্ত শহরবাসীরই কাম্য। কেননা শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য সঠিক পরিবেশ তৈরিতে নয়, এরকম স্থান যান্ত্রিক জীবনে বিস্তর প্রশান্তির জন্যও সহায়ক। স্বল্প পরিসরে হলেও এই ধরণের অভিজ্ঞতা বিগত কয়েক দশক ধরে পেয়ে আসছেন বাংলাদেশের বইপ্রেমীরা। চলুন, ঢাকা শহরে অবস্থিত কিছু চমৎকার বুক ও স্টাডি ক্যাফের ব্যাপারে জেনে নেওয়া যাক।

পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র

দেশ ও বিদেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ বইয়ের ভাণ্ডার হিসেবে দেশের সবচেয়ে পুরনো সংগঠন পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র। এর প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৮৭ সালের ১২ জুলাই। ১৯৯৯ সালে পাঠক সমাবেশ রিডার্স ক্লাব কর্মসূচির ফলে সংগঠনটির সঙ্গে পাঠকদের সখ্যতা আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে আরও যোগ হয়েছে শিশু কর্নার। বসে বই পড়ার জায়গা কম থাকলেও এর দেশি-বিদেশি অরিজিনাল প্রিন্টের সংগ্রহ কাছে টানে বইপ্রেমীদের।

শাহবাগ মোড়ের জাতীয় জাদুঘর থেকে কাঁটাবনের দিকে কিছুটা এগোলেই আজিজ সুপার মার্কেটের বিপরীত পার্শ্বে এর অবস্থান। এছাড়া কাঁটাবনের এলিফেন্ট রোডের ২৭৮/৩ ঠিকানায়ও একটি শাখা রয়েছে পাঠক সমাবেশ কেন্দ্রের। প্রায় ছয় হাজার বর্গ ফুটের এই জায়গায় লাইব্রেরি ছাড়াও ঠায় পেয়েছে সাইলেন্ট রিডিং রুম এবং ক্যাফে। প্রতিদিন এর কার্যক্রম সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৯টায় শেষ হয়।

দ্যা রিডিং ক্যাফে

২০১৪ সাল থেকে চালু হওয়া দ্যা রিডিং ক্যাফের প্রতিষ্ঠাতা আতিকুর রহমান। রাজধানী জুড়ে ক্যাফেটির মোট চারটি শাখা; গুলশান, বনানী, উত্তরা, এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরি। সবগুলোতেই প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১২০ জন অতিথির জন্য আয়োজন চলে। বিদেশী ফিকশনধর্মী বইগুলোর আধিক্য থাকায় তরুণদের আনাগোনাটাই বেশি হয় এখানে। তবে সেইসঙ্গে বাচ্চাদের বইও রয়েছে। এমনকি শিশুদের খেলা করার জন্য আলাদা একটি জোনও রয়েছে।

পছন্দের বইটি পড়ার পাশাপাশি ব্যবস্থা রয়েছে চা-কফি খাওয়ার। দ্যা রিডিং ক্যাফে পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত হয় সকাল ১০টায়, আর বন্ধ হয়ে যায় রাত ৯টার দিকে।

নার্ডি বিন কফি হাউজ

ফারিয়া মাহজাবিন এবং মাসরু হাসান কমল ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শুরু করেন এই কফি শপটি। গুটি কয়েক বইয়ের তাকগুলোকে ইউরোপীয় কায়দায় সামঞ্জস্য করা হয়েছে পুরো শপের আভ্যন্তরীণ নকশার সঙ্গে। আরামপ্রদ বসার জায়গাগুলোতে কফি আর বই নিয়ে নিমেষেই একটি অলস বিকেল কাটিয়ে দেওয়া যায়। এখানকার বইয়ের বিভাগটি ইংরেজি সাহিত্য পড়ুয়াদের জন্য উৎকৃষ্ট। তবে সেগুলো শুধু এই ক্যাফেতে পড়ার জন্য, কেনার উপায় নেই।

কফি হাউজটির অবস্থান ধানমণ্ডির ২ নম্বর রোডের আহমেদ কাজী টাওয়ার নামের ৩৫ নম্বর বাড়িটির আন্ডারগ্রাউন্ডে। এখানে আগত টিনেজ ও তরুণ-তরুণীদের মূল আকর্ষণ থাকে বাহারি পদের কফি এবং স্ন্যাক্স। প্রতি চুমুকের স্বাদ বাড়িয়ে দেয় আড্ডা, আর মাঝে মাঝে লাইভ মিউজিক। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে নার্ডি বিন কফি হাউজ।

বাতিঘর/ইউএনবি

বেঙ্গল বই

বইয়ের মাঝে ডুব; এই স্লোগান নিয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বেঙ্গল বইয়ের যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর। দেশ-বিদেশের বইয়ের পাশাপাশি এখানে রয়েছে পুরনো মূল্যবান বই ও ম্যাগাজিন। নিরিবিলিতে বসে বই পড়ার আধুনিক ক্যাফেতে রয়েছে চা-কফি ও ফ্রেশ জুস খাওয়ার ব্যবস্থা। আছে আকাশ কুসুম নামের শিশু কর্নার, যেখানে শিশুরা আঁকাআঁকি, পড়াশোনা ও খেলাধুলা করতে পারে।

বিভিন্ন সময়ে এর আয়োজনগুলোর মধ্যে থাকে কবিতা পাঠের আসর, পাঠচক্র, প্রকাশনা উৎসব, নতুন লেখক ও তাদের লেখা নিয়ে সভা, চিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। বেঙ্গল বইয়ের বর্তমান অবস্থান ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর রোডের ৪২ নম্বর বাসা। শুক্র ও শনিবার যাবতীয় কর্মকাণ্ড শুরু হয় সকাল ৯টায়, আর শেষ হয় রাত ৯টায়। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে কাজ চলে দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

বাতিঘর

২০০৫-এর ১৭ জুন চট্টগ্রামের চেরাগি মোড়ে ১০০ বর্গফুটের ছোট্ট দোকান থেকে বাতিঘরের পথচলা। প্রতিষ্ঠাতা দীপঙ্কর দাশ। এখন চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেট মিলিয়ে বাতিঘরের মোট শাখা ৬টি। বাতিঘরের সংগ্রহে রয়েছে আড়াই হাজার প্রকাশনা সংস্থার প্রায় লক্ষাধিক বই।

দ্বিতীয় শাখা হিসেবে ঢাকার বাংলামোটরের আউটলেটটি চালু হয়েছিল অনেক পরে; ২০১৭ সালে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনের সাত তলায় এই বইঘরটি বানানো হয়েছে লালবাগ কেল্লার আদলে। বাংলা- ইংরেজি দুই ভাষার বইগুলো পাঠকরা ভেতরে বসেই পড়তে পারেন। ছেলে-বুড়ো সবার রুচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই সমৃদ্ধ করা হয়েছে বইয়ের সংগ্রহ। এমনকি প্রত্যেকটি শাখাতেই রয়েছে আলাদা শিশু-কিশোর কর্নার। সরকারি ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে বাতিঘর।

বুকওয়ার্ম বাংলাদেশ

১৯৯৪ সালে বিমান বাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন তাহের কুদ্দুস চালু করেছিলেন বুকওয়ার্ম বুকস্টোর। ঢাকার তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরে সংলগ্ন সড়ক ঘেঁষে ছিল বইয়ের দোকানটি। বর্তমানে এর অবস্থান গুলশান এলাকার বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ পার্কে।

এটাকে আসলে কোনো বুক ক্যাফে বলা যাবে না। গুলশান লেকের পাড়ে সবুজ গাছগাছালি ঘেরা হওয়ায় বুক শপটির প্রতি স্থানীয়দের আকর্ষণ এত বেশি। বুকওয়ার্ম মূলত ইংরেজি সাহিত্যের এক বিশদ সংগ্রহশালা। ফিকশনের পাশাপাশি নন-ফিকশন ইংরেজি বইগুলো তরুণ বৃদ্ধ সকলকেই কাছে টানে। দোকানের বাইরে পাশেই নর্থ অ্যান্ড কফি রোস্টার নামের কফিশপটা এখানে ভিড় হওয়ার আরেকটি কারণ।

বুকওয়ার্ম স্বাগতদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় সকাল ১১টায়, আর বন্ধ করা হয় রাত ৮টায়।

পাঞ্জেরী বুক শপ

দেশের প্রথম পাঠকসেবা প্রদানকারী পাঞ্জেরী বুক শপ সংক্ষেপে পিবিএস নামে অধিক পরিচিত। বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল বাকী দায়িত্ব নেন পিতার প্রকাশনা ব্যবসার। তার সঙ্গে ছিলেন কাওসার হাসান ও কামরুল হাসান শায়ক। তাদেরই সম্মিলিত চেষ্টায় পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করে পিবিএস।

দেশের সব থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ সাহিত্য ভাণ্ডার হওয়ায় পিবিএস সব ধরণের পাঠকের প্রিয় গন্তব্য। তবে এখানকার মূল আকর্ষণ হলো শিশু কর্নারটি। বইয়ের ছোট বড় তাকগুলোর পাশাপাশি আরও দেখা যায় খেলনা, ইলেক্ট্রনিক্স, হ্যান্ডিক্রাফ্ট আইটেম। এছাড়াও আছে থ্রিডি থিয়েটার এবং মিউজিক ক্যাফে। বুক ক্যাফের ধারণাটি প্রথম পিবিএস-ই বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করে।

এছাড়া বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে এখানে নানা রকমের আয়োজন চলে। যেমন- চিল্ড্রেন্স উইক, প্রতি শুক্রবারের এক জোড়া বিনোদন ঘণ্টা, হ্যালোউইন ফ্যাস্টিভাল, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। সারা ঢাকা শহরজুড়ে পিবিএস-এর মোট তিনটি শাখা; শান্তিনগর, উত্তরা এবং ধানমণ্ডি। সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল ৯টা থেকে শুরু করে রাত ৯টা অব্দি খোলা থাকে পিবিএস।

ভাইভ স্টাডি ক্যাফে/ইউএনবি

কবিতা ক্যাফে

সবুজ রঙা দেয়াল, লতানো গাছ এবং বাঙালিয়ানার ছোঁয়ায় এক প্রশান্তিদায়ক স্থান কবিতা ক্যাফে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চালু হওয়া এই বইঘরে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাংলা বইগুলো। এছাড়া অধিকাংশ বইগুলোর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা জলধি এবং তরুণ লেখকদের বই। লেখক ও পাঠকদের এক স্বতঃস্ফূর্ত মিলনমেলা কবিতা ক্যাফে। নানা উপলক্ষকে কেন্দ্র করে চলে গান ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান। আড্ডাগুলো আরও প্রাণ পায় ক্যাফের সাহিত্যবান্ধব নাস্তা চা, সিঙ্গারা, ঝালমুড়ি, ও খিচুড়িতে।

ক্যাফেটির ঠিকানা কাঁটাবনের ২৩৪/সি নিউ এলিফ্যান্ট রোড। পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে সকাল ১১টা থেকে শুরু করে রাত ১১টা পর্যন্ত।

প্রথমা বুক ক্যাফে

সাম্প্রতিক বুক শপগুলোর মধ্যে নান্দনিক পরিবেশের জন্য পরিচিতি পেয়েছে প্রথম আলো ও ইউনাইটেড গ্রুপের এই যৌথ উদ্যোগটি। ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর থেকে কার্যক্রম শুরু করা ক্যাফেটি খুব কম সময়েই বইপ্রেমীদের ভালবাসা অর্জন করে নিয়েছে। মাদানি এভিনিউয়ের নামকরা ঢাকা ইউনাইটেড সিটির শেফস টেবিল প্রাঙ্গণে ক্যাফের অবস্থান। বই পড়া ও বই কেনার সঙ্গে রয়েছে হাল্কা স্ন্যাক্সেরও ব্যবস্থা। পাঠকদের জন্য প্রথমা বুক ক্যাফে খোলা থাকে বিকাল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।

ভাইভ স্টাডি ক্যাফে

আবুধাবি ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মাহিদুল আলম “এডভাইভ” নামক একটি প্রযুক্তি নির্ভর প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলেন। এটি মূলত ইংরেজি শেখার একটি প্লাটফর্ম, যা বিভিন্ন ধরণের এডুকেশনাল সফটওয়্যার তৈরি করে। এই কার্যক্রমেরই অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট শুরু করা হয় ভাইভ স্টাডি ক্যাফে।

হাতিরঝিলের মহানগর ২ নম্বর গেটে অবস্থিত এই ক্যাফেটি এখন তরুণদের প্রিয় গন্তব্য। “ভাইভ” এর প্রতিষ্ঠাতা সঙ্গে শীত-আগমনী আমেজের প্লে-লিস্টের শ্রুতিমধুর সুর মন ভালো করে দেবে। ভেতরের প্রতিটি দেয়ালের সুন্দর করে সাজানো বই আর সঙ্গে রয়েছে লম্বা স্টাডি টেবিল। কফি কর্নারের বিভিন্ন রকম কফি, চা, আইসক্রিমসহ বাহারি স্বাদের স্ন্যাক্স। শ্রুতিমধুর সুরে বাজতে থাকা গান সাইলেন্ট জোনের নিরবতাতে এতটুকু হস্তক্ষেপ করে না। শিক্ষার্থীদের গ্রুপ স্টাডি এবং অফিস পাড়ার লোকদের প্রয়োজনীয় কাজের জন্য এটি এখন সর্বোত্তম জায়গা। কেননা এখানে রয়েছে ফ্রি ওয়াইফাই এবং প্রিন্টার। ছুটির দিনসহ সপ্তাহের প্রতি দিনই সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে ভাইভ স্টাডি ক্যাফে।

শেষাংশ

ঢাকার এই জনপ্রিয় ১০টি বুক ও স্টাডি ক্যাফে এই কিন্ডেলের যুগেও কাগুজে বই হাতে নিয়ে পড়ার ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। এক্ষেত্রে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের পাঠকদের প্রিয় গন্তব্য হতে পারে পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র, পিবিএস, বাতিঘর, বেঙ্গল বই, এবং দ্যা রিডিং ক্যাফে। স্বতন্ত্র পাঠক শ্রেণীর জন্য নিবেদিত রয়েছে বুকওয়ার্ম বাংলাদেশ, কবিতা ক্যাফে, এবং প্রথমা বুক ক্যাফে।

বই পড়ার পাশাপাশি নিরিবিলিতে দীর্ঘক্ষণ সময় কাটানোর জন্য নতুনগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে ভাইভ স্টাডি ক্যাফে। আর নার্ডি বিন কফি হাউজের নিকটস্থ ইংরেজি সাহিত্যপ্রেমীদের কফি হাতে অবকাশ যাপনের জন্য দূরে কোথাও যেতে হবে না।