৪০০ বছরের পুরোনো শহর ঢাকা। দ্রুত নগরায়ন আর বর্ধিত জনগোষ্ঠীর চাপে হারাতে বসেছে শহরটির নান্দনিক রুপ। যানজট আর ধূলোয় নাকাল শহরের প্রাণ। তবে এই কোলাহলপূর্ণ শহরেও শ্যামলীর একটি সড়কে আপনার দৃষ্টি কেড়ে নেবে একটি দেয়াল। যে দেয়ালজুড়ে নানা রংয়ের খেলা। আর এই এতো রংয়ের বিচ্ছুরণ মূলত গামছা থেকে। আর যে কারণেই এই দেয়ালটির নাম হয়ে উঠেছে গামছা দেয়াল।
শ্যামলীতে এসওএস শিশুপল্লীর কাছে ঢাকা শিশু হাসপাতালের ঠিক পাশেই চোখজুড়ানো এই গামছা বাজারটির অবস্থান। রাজধানীর মিরপুর রোডের এই সাত ফুট উঁচু দেয়ালজুড়ে লাল, নীল, সবুজ, হলুদসহ বিভিন্ন রংয়ের গামছা হয়ে উঠেছে সৌন্দর্যের অনন্য নিদর্শন।
গামছা বাঙালি জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। সাধারণত গোসলের পর শরীর মোছার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও গামছার রয়েছে নানাবিধ ব্যবহার। একরঙা থেকে শুরু করে নানা রংয়ের গামছা পাওয়া যায়। এছড়া বিভিন্ন ধরনের চেকের নকশা ফুটে ওঠে গামছাতে।
যেভাবে শুরু গামছা দেয়াল বাজারের
গত প্রায় ১৫ বছর ধরে শ্যামলীতে চলে আসছে গামছার এই বাজারটি। শুরুর দিকের কথা জানিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা বিক্রেতা আবদুর রহিম বলেন, "বাজারটি শুরু হওয়ার কয়েক বছর পর ২০১২ সালে আমি এখানে গামছা বিক্রি শুরু করি। এখন আমরা এখানে মোট সাতজন বিভিন্ন রং, ডিজাইন ও দামের গামছা বিক্রি করি।”
এখানকার বিক্রেতারা সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝালকাঠি এবং নরসিংদীর বাবুরহাটের পাইকারি বাজার থেকে গামছা সংগ্রহ করে থাকেন। তারা প্রতি সপ্তাহে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে গামছাগুলো ঢাকায় আনেন।
ফেব্রিকস এবং আকার অনুযায়ী বিভিন্ন গামছা পাওয়া যায় এই দেয়াল বাজারে। ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন নকশার গামছা মেলে এখানে। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে সাত হাজার টাকার গামছা বিক্রি করেন শ্যামলীর এই দেয়াল বাজারের বিক্রেতারা।
এই বাজারের আরেক বিক্রেতা মো. রুজেল মিয়া জানান, গামছা বিক্রির আয় তার আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, "আমার এই ছোট ব্যবসা থেকে আয় খুব বেশি নয়, তবে এটি আমার পরিবারের জন্য যথেষ্ট।” এখানের বিক্রেতাদের কোনো ধরনে চাঁদা বা অন্যকোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না বলেও জানান তিনি।
বিভিন্ন ধরনের ক্রেতা
রঙিন এই গামছার দেয়াল এই পথে চলাচলকারী যেকোনো মানুষের নজর কেড়ে নেয়। ব্যস্ত শহরবাসী বাজারে না গিয়ে সহজেই এখান থেকে কিনে নিতে পারেন গামছা। এখান থেকে অনেক ক্ষুদ্র ও পাইকারি ব্যবসায়ীরাও গামছা কেনেন বলে জানান বিক্রেতা আব্দুর রহিম। গামছার কাপড়ে তৈরি জামাকাপড় এবং ফতুয়ার জনপ্রিয়তা বাড়ায় অনেক পোশাক প্রস্তুতকারীরাও তাদের কাছ থেকে গামছা কেনেন বলে জানান তিনি।
এছাড়া শ্যামলী এলাকায় বেশ কয়েকটি সরকারি, বেসরকারি এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। রোগী এবং তাদের স্বজনরাও এখানকার গামছার ক্রেতাদের একটি বড় অংশ।
পাশপাশি শ্যামলী, মোহাম্মদপুর এবং কল্যাণপুরের আশেপাশের এলাকাগুলোর ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা এখান থেকে নিয়মিত গামছা কিনে থাকেন।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা কথা হয় জহিরুল ইসলাম নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি জানান, বাজারের দোকানের চেয়ে রাস্তার পাশের এই দেয়ালে গামছা তুলনামুলক কম দামে পাওয়া যায়।
তার সঙ্গে কথা বলার সময় দোহারে পদ্মা নদীর মৈনট ঘাটে নৌকা ভ্রমণের জন্য একদল কিশোরকে ১৫টি গামছা কিনতে দেখা যায়।
শহরে রংয়ের বিচ্ছুরণ
ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে রঙিন গামছার দেয়াল বাজার শ্যামলীর কল্যাণপুর খালের কাছে ৪ নম্বর সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। দেয়ালে ঝুলে থাকা নানা রংয়ের গামছা স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের চোখে প্রশান্তি যোগায়। এছাড়া ব্যবসায়ীরা ফুটপাথটি সবসময় পরিষ্কার রাখায় সেটি হয়ে উঠেছে আরও আকষর্ণীয়।
শ্যামলীর গামছা দেয়াল তাই শুধু এখন আর বিকিকিনির জায়গা নয়। শহরের যান্ত্রিক ব্যস্ততার মধ্য এটি হয়ে উঠেছে সৌন্দর্য্য আর ঐতিহ্যের সংযোগ সেতু।