দেশের প্রথম স্টাডি ক্যাফে

ঢাকায় অবসর কোথায়, কোথায় নীরবতা। কোলাহলমুক্ত পরিবেশ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন নিজের মতো করে ভাববার, পড়াশোনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোনিবেশের জন্য জায়গা। বাসা-বাড়িতেও সেই উপযুক্ত পরিবেশ থাকে না অনেকের। উপযুক্ত পরিবেশ বলতে একদম পিনপতন নীরবতা, আরও অনেক উদ্যমী মানুষের সান্নিধ্য ও অনুপ্রেরণা আর মস্তিষ্ককে চাঙ্গা রাখতে কফি।

এমন একটা জায়গার খোঁজ করেন হয়ত অনেকেই। পেয়েও যান কেউ কেউ। নিভৃতচারী মানুষ নিজের মতো করে সময় কাটাতে পারেন, কাজ কিংবা পড়াশোনাও করতে পারেন সেখানে। রাজধানীর মহানগর আবাসিক এলাকায় তাদের জন্য রয়েছে “ক্যাফে ভাইভ”। কর্তৃপক্ষের দাবি এটিই “দেশের প্রথম” স্টাডি ক্যাফে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এসব সুবিধা নিয়ে ক্যাফে ভাইভ প্রতিষ্ঠা করেন মহিদুল আলম। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটা ক্যাফেভিত্তিক কমিউনিটি গড়ে তোলা। শুরু থেকেই সাড়াও পেতে শুরু করেন বেশ। 

ক্যাফে ভাইভের একদম শুরু থেকেই আসা-যাওয়া মহানগর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আরিফের। তার অভিজ্ঞতায়, “বাসায় পড়াশোনা করতে করতে মাঝেমধ্যে একটু আলসেমি পেয়ে বসে। এমন অবস্থায় জায়গা বদল করলে মনোযোগ ফিরে পাওয়া যায়। ভাইভের সাইলেন্ট জোনে পড়াশোনা করেই আমি আইইএলটিএস, জিআরই-এর প্রস্তুতি নিয়েছি।”

“নানান ঘরানার সৃষ্টিশীল প্রতিভাবান মানুষের সঙ্গে দেখা হয় এখানে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ডাক্তার, প্রকৌশলী, ফ্রিল্যান্সার, প্রোগ্রামার প্রভৃতি। এভাবে কমিউনিটি তৈরি হয়। ভাইভ থেকেই বিভিন্ন পেশার লোকজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেক রকম জ্ঞান ও তথ্যের আদান-প্রদান হয়েছে।”

প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মো. সাইফ উদ্দিন বলেন, “কোরিয়ায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান অনেক আছে। আমাদের এড ভাইভ নামে আরেকটা স্টার্টআপ ছিল। তখন আমরা দেখেছি বাংলাদেশে স্টার্টআপগুলোর খুব একটা ফান্ড থাকে না। জায়গা নিয়ে একটু মুশকিলে পড়েন তারা। তাদের হয়ত ছোট টিমের জন্য একটা রুম প্রয়োজন, কিন্তু সবার পক্ষে তেমনটা পাওয়া সম্ভব হয় না। আমরা চিন্তা করলাম এমন একটা জায়গার কথা যেখানে সামান্য কিছু খাবার কিনে সারাদিন বসে কাজ করা যায়, ওয়াইফাই থাকবে, নিরিবিলি যে যার কাজ বা পড়াশোনা করতে পারবে। পাশাপাশি, এই শহরে নিজের মতো করে সময় কাটানোটাও কঠিন। গতানুগতিক রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফেগুলোতে সময়ের একটা বাধ্যবাধকতা থেকেই যায়। কিন্তু আমরা মনে করি নিজের মতো করে মানুষ যতক্ষণ ইচ্ছা পড়াশোনা, কাজ বা সময় কাটাক আমাদের এখানে। সেজন্য আমাদের একটা ডেডিকেটেড সাইলেন্ট জোন আছে, সেখানে সকাল ৯টা থেকে বিকেল এমনকি রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত পড়াশোনা বা নিজের কাজ করার সুবিধা রয়েছে। ২০০ টাকার খাবার কিনলেই সাইলেন্ট জোনের সুবিধা নেওয়া যায়।”

ক্যাফে ভাইভে কিছু বই আর ম্যাগাজিনও রয়েছে। সাইফের কথায়, “আপনি চাইলে আমাদের কাছে থাকা বইগুলো কিনতে অথবা পড়তেও পারবেন। মূল ব্যাপারটা হলো নিজেকে সময় দেওয়া। আর বইয়ের সঙ্গে কফির বন্ধুত্ব তো পুরোনো।”

তিনি বলেন, “মজার ব্যাপার হলো আমাদের বেশিরভাগ গ্রাহকই ঘুরে-ফিরে আসেন। অর্থাৎ তাদের কাছে এই আবহটা গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই বারবার তারা আসেন। যেমন ধরুন- অনলাইন উদ্যোক্তা, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চপদস্থ চাকরিজীবীরা আসেন। পড়াশোনা করেন, মিটিং করেন।”

পেশাদারি আবহ

ক্যাফে ভাইভ কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মিল রাখতে সচেষ্ট। কর্তৃপক্ষের ভাষায়, “যেমন ধরুন আমরা সাইলেন্ট জোনে নীরবতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে কোনো ছাড় দিই না। হাতিরঝিলে প্রচুর মানুষ আসেন, আমরা চাইলেই তাদের আকৃষ্ট করতে পারতাম। কিন্তু আমরা চেয়েছি সেসব মানুষ আমাদের এখানে আসুক যারা নীরবতা পছন্দ করেন, একটা উপযুক্ত পরিবেশে যারা পড়াশোনা বা কাজ করতে চান। তাই আমরা বড় করে বিলবোর্ডও টাঙাইনি।”

নিভৃতচারী মানুষ নিজের মতো করে সময় কাটাতে পারেন এখানে/আহমেদ সার্জিন শরীফ

কাজ কিংবা পড়াশোনার জন্য পেশাদারি আবহই অন্যান্য ক্যাফের সঙ্গে তাদের মূল পার্থক্যের জায়গা বলে মনে করে ভাইভ। সাইফ বলেন, “এমনও হয়েছে কোনো এক বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী রাতে ফোন করে বলেছেন তিনি কিছুক্ষণ পরিবারের লোকজনকে নিয়ে একটু আমাদের এখানে বসতে চান। দেশের আর কোনো ক্যাফেতে গ্রাহকরা এমন পরিবেশ পেয়েছেন বলে আমার জানা নেই। আমরা চেয়েছি গ্রাহকরা যেন কোনোভাবেই এখানে এসে বিরক্ত বোধ না করেন এবং বারবার ফিরে আসেন। এত দ্রুত কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারাটা বড় প্রাপ্তি। শুরু থেকেই আমরা একটা ক্যাফে কমিউনিটি গড়তে চেয়েছি।”

সময়ের ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, নেই বিরক্তির বিড়ম্বনা

সাইফের কথায়, “দেশে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আমাদের পরিচালন ব্যয় তুলতে হিমশিম খেতে হয়। তবুও আমরা এমন কোনো লাভজনক পদক্ষেপ নিই না যা ক্যাফের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে। অনেকেই এখানে ৬-৭ মাস ধরে প্রতিদিনই আসেন। আমরা তাদের সেই আস্থার জায়গাটা ধরে রাখতে চাই। স্বাভাবিক সময়ে বছরের ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার চেষ্টা করি আমরা। আমাদের এখানে অনেক সময় সবগুলো টেবিলেই অতিথিরা থাকেন। তখন নতুন অতিথি এলে পুরোনো কাউকে আমরা উঠিয়ে দেই না। স্বল্পসময়ে অনেক বিক্রির সম্ভাবনা থাকলেও না।”

বই পড়ার জন্য অনেক ক্যাফে আছে। সেগুলোর সঙ্গে নিজেদের গুলিয়ে ফেলতে চায় না ভাইভ ক্যাফে। 

তাদের কথায়, “অনেক সময় এমন জায়গার প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করি যেখানে আমরা নিজের কাজটা ভালো করে করতে চাই, সব ভুলে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া যায় এমন পরিবেশ চাই। আমাদের এখানে উচ্চগতির ওয়াইফাই আছে যাতে কেউ এখানে বসে তার স্টার্টআপের কাজ নির্বিঘ্নে করতে পারেন। এসব কাজ হয়ত বাসায় বসেও করা যায় কিন্তু এখানে একটা প্রফেশনাল পরিবেশ রাখার চেষ্টা করেছি আমরা যাতে মানুষ তার কাজে আরও মনোনিবেশ করতে পারে। এখানে আমরা সেই পরিবেশটাই রাখার চেষ্টা করেছি যাতে কেউ কারও দ্বারা বিরক্ত না হন। যেমন ধরুন আমরা সাইলেন্ট জোনকে পুরোপুরি আলাদা করে রেখেছি যাতে একদিকে মিউজিক চললেও নিরবচ্ছিন্ন নৈঃশব্দ চান এমন অতিথিদের বিরক্ত না করে। আমরা সেসব সুরই বাজানোর চেষ্টা করি, যেগুলো আপনাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করে তুলবে। আবার ধরুন কেউ কেউ তার ভিজিটিং কার্ডে আমাদের ঠিকানাটা দিয়ে রেখেছেন নিজের ঠিকানা হিসেবে। তারা কাজের জন্য বাড়ির চেয়ে এই জায়গাটিকেই বেশি উপযুক্ত মনে করেন। আমরা তাদের স্বাধীনতার দিকটিকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছি।”

ক্যাফে ভাইভে কিছু বই আর ম্যাগাজিনও রয়েছে/আহমেদ সার্জিন শরীফ

খাবারের মানের ব্যাপারেও তারা যথেষ্ঠ সচেতন। খাবার আগে থেকে বানিয়ে রাখে না ভাইভ। নতুন কোনো খাবার আনার আগে নিজেরা পরখ করে, সন্তুষ্ট হলে তবেই তা অতিথিদের জন্য মেন্যুতে যোগ করা হয়। 

ভাইভে যারা কাজ করেন তারা সবাই শিক্ষার্থী। এখানে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। ফলে রুচিশীল অতিথিদের সঙ্গে তারা সহজেই মানিয়ে নিতে পারেন।

ভাইভ কর্তৃপক্ষ মনে করে, এ ধরনের ক্যাফে তখনই যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারবে যখন উদ্যোক্তারা সঠিক পরিবেশ বজায় রাখতে পারবেন।

ক্যাফে কমিউনিটি

সাইফ বলেন, “আমরা আরও একটা বিষয়ে খুবই কঠোর। সবসময় বলি মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ক্যাফেতে আসতে নিরুৎসাহিত করি। কারণ আমরা মনে করি বাসা-বাড়িই তাদের সর্বোত্তম পড়াশোনার জায়গা। আবার বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন শিক্ষার্থীদের আমরা স্বাগত জানাই। মূল কথা হলো আমরা খাবারকে নয় নির্দিষ্ট কমিউনিটিকে প্রাধান্য দিই যারা পড়াশোনা, ক্যারিয়ার কিংবা নিজের মতো করে সময় কাটানোর জন্য একটা উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজছেন।”

রাজধানীর মহানগর আবাসিক এলাকায় ‘ক্যাফে ভাইভ’/আহমেদ সার্জিন শরীফ

ভাইভে জানুয়ারি থেকে আসা যাওয়া তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা রেজওয়ান রাজুর। শখের বশে মোবাইল অ্যাপস ডেভলপ করেন তিনি। অফিসে যাওয়া-আসার পথে বাইরে থেকে ভালোলাগা। তিনি বলেন, “প্রথম দিন তাদের সাইলেন্ট জোনটা দেখে কাজের জন্য উপযুক্ত মনে হয়। আসলে নানান কারণে বাসায় অ্যাপ ডেভলপের কাজে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। ভাইভের সাইলেন্ট জোনে বসলে মনে হয় যেন এটা আমার কাজের জন্যই তৈরি করা। নিজের মতো করে ভাবা কিংবা কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়। বাকি যারা বসেন তারাও এই আবহটা বজায় রেখেই কাজ করেন। শিক্ষার্থী কিংবা কর্মজীবী উভয় ধরনের মানুষই আসেন এখানে। আবাসিক এলাকার কাছে এ ধরনের ক্যাফের ধারণা আমার ভালো লেগেছে।”

ভাইভে “স্মোকিং জোন” নেই। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন রাজু। কারণ এতে পরোক্ষভাবে ধূমপানকে নিরুৎসাহিত করা হয় বলে মনে করেন তিনি।