‘ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ’ বিষয়ে শিশুদের সচেতন করবেন যেভাবে

নিরাপদ শৈশব প্রতিটি শিশুর জন্মগত অধিকার। শৈশবের যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা শিশুর মানসিক গঠনে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার।

যেসব বিষয় শিশুদের শৈশবকে দুর্বিষহ করে তোলে, তার মধ্যে যৌন নিপীড়ন অন্যতম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই শিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে থাকে। আর এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচিতজনরা জড়িত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য বলছে, দেশটিতে প্রতি চারজন মেয়ে শিশুর মধ্যে একজন এবং ২০ জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন হয়রানির শিকার হয়।

সিডিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে এমন হয়রানির শিকার হওয়া ৯০% ঘটনাই কোনো পরিচিত বা পরিবারের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দ্বারা ঘটে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে নারীদের মধ্যে ৩০%, পুরুষদের মধ্যে ১৬% ছোটবেলায় কোনো না কোনো যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

এছাড়া, প্রায় ৮৫% ভাগ ক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতনকারী শিশুর পরিচিত। যেমন; আত্মীয়, বন্ধু বা বিশ্বস্ত বলে ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশে ৭৫% শিশু নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া হয়রানির ঘটনা কারও কাছে প্রকাশ করে না বলে অন্য এক গবেষণায় উঠে এসেচে। সেখানে বলা হয়েছে, লজ্জাবোধ ও জড়তা, নিজের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চেনা, ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ এবং ব্যক্তিগত স্থানের গোপনীয়তা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় তারা এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রকাশ করে না।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে “বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের স্নেহ” বিষয়টা অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। সেই জায়গা থেকে শিশুদের আদর করাটাও সামাজিকভাবে বেশ প্রচলিত।

তবে বিশ্বের অনেক দেশেই মা-বাবা ছাড়া অন্য কেউ বা বাইরের কেউ শিশুদের আদর করাকে বেশ নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। মা-বাবার অনুমতি ছাড়া এমন ক্ষেত্রে অনেক সময় শক্ত আইনের ব্যবস্থাও থাকে। এর পেছনে একটা বড় কারণ শিশুদের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি।

তবে এতটা তীব্র পর্যায়ে যাওয়া ছাড়াও স্বাভাবিক স্পর্শ বা আদর করার ক্ষেত্রে যদি তা কোনো শিশুর জন্য অস্বস্তির কারণ হয় তবে সেটা যৌন নিপীড়নের পর্যায়ে পড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

এছাড়া এমন সংবেদনশীল বিষয়ে সামাজিক ট্যাবু বা গোপনীয়তার সংস্কৃতি কম বয়সে নিপীড়নের শিকার হওয়া ব্যক্তির জন্য মানসিক ট্রমার কারণ হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

অভিভাবকদের করণীয়

এই ধরনের বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এমন বিষয় নিয়ে অভিভাবকরা বিবেচনায় নিতে বা আলোচনা করতে অস্বস্তি বোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে জানতে পারলেও পরিবারের কাছের মানুষদের সন্দেহ করার বিষয়েও অভিভাবকরা কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না বলে এক প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা।

এ বিষয়ে অধিকারকর্মী নিশাত সুলতানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “অভিভাবকরা যদি এ বিষয়ে সচেতনতা না দেখান বা এমন ঘটনা ঘটলে শুধু বিষয়টিকে গোপন রাখার বিষয়ে জোর দেন এবং খারাপভাবে স্পর্শ করা ব্যক্তি যদি পরিবারে অবাধে ওঠাবসা করতে পারেন তাহলে সেটা জীবনভর মা-বাবার ক্ষেত্রে একটা নেতিবাচক মনোভাব বা ট্রমা হিসেবে রয়ে যেতে পারে।”

“ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ” বিষয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে “মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন” কর্তৃক প্রণীত কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে অভিভাবকদের জন্য বলা হয়েছে-

  • শিশুর সঙ্গে একা সময় কাটাতে চাওয়া ব্যক্তির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অভিভাবক ছাড়া কাউকে, এমনকি শিশুর পছন্দের ব্যক্তির সাথেও বাইরে ঘুরতে দেয়া যাবে না। শিশুদের সাথে ছোট বলে এমন আচরণ মেনে নেয়া যাবে না যাতে তারা অস্বস্তি বোধ করে।
  • মা-বাবা ও অভিভাবকদের মাথায় রাখতে হবে পরিবারের ভেতরে-বাইরে কারো কারো “অন্যের শরীরে খারাপভাবে হাত দেওয়ার” অভ্যাস থাকতে পারে। যেসব জায়গায় হাত দেয়া উচিত না তেমন জায়গায় হাত দিলে শিশুরা যেন মা-বাবাকে বলে দেয় সেটা শেখাতে হবে।
  • যে ব্যক্তি শিশুদের ব্যক্তিগত জায়গায় স্পর্শ করবে বা শিশুকে দিয়ে তাদের শরীরে এমনভাবে স্পর্শ করার কথা বলবে যেটা শিশুর পছন্দ হবে না, সেক্ষেত্রে শিশুদের বাধা দেওয়া শেখাতে হবে।
  • সব বয়সী শিশুর প্রতি নজর রাখতে হবে। শিশু এমন কোনো অভিযোগ করলে সেটা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।
  • “গুড টাচ-ব্যাড টাচ” বা “ভালো স্পর্শ, মন্দ স্পর্শ” ধারণার সঙ্গে শিশুকে পরিচিত করিয়ে দিতে হবে।
  • বাচ্চাদের মন খুলে কথা বলা শেখাতে হবে যেন সমস্যার বিষয়ে বলতে তারা ভয় না পায়।
  • যদি তেমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায় সেক্ষেত্রে শিশুকে আশ্বস্ত করতে হবে যে সে ঘটনার জন্য শিশুটি কোনোভাবে দায়ী নয় এবং নিপীড়নকারী ব্যক্তির এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য না।
  • পরিবারের অন্য সদস্য বা পরিচিতদের নিপীড়নকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জানাতে হবে যেন তারা নিজ সন্তানদের নিয়ে সতর্ক থাকতে পারেন।
  • ঘটনাকে তুচ্ছ হিসেবে দেখা বা নিপীড়নকারীর পক্ষ নেওয়া যাবে না। আবার এ নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের দুশ্চিন্তা বা প্রতিক্রিয়া বা অতিরিক্ত প্রশ্ন করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।

শিশুদের যেভাবে বোঝাতে হবে

  • সন্তানদের সুরক্ষার জন্য এ বিষয়গুলো বোঝানোটাও বাবা-মায়ের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
  • আর “গুড টাচ ও ব্যাড টাচ” ধারণা দিতে বিশেষজ্ঞরা যেটা উল্লেখ করেন, সেটা হচ্ছে শিশুদের ব্যক্তিগত অঙ্গ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা।
  • ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে ঠোঁট, গোপনাঙ্গ, পায়ুপথ; মেয়েদের ক্ষেত্রে এই তিন অংশ ছাড়াও বুকের দিকের অংশ।
  • জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফও এই অঙ্গগুলোকে একান্ত ব্যক্তিগত হিসেবে শিশুকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা বলে।

তবে একইসঙ্গে এটাও বলা হয় যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেখানে স্পর্শ করার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন শিশুর যদি টয়লেটে বা গোসলে সাহায্যের প্রয়োজন হয় এবং ডাক্তারের কাছে স্বাস্থ্যের পরীক্ষার জন্য যেতে হয়।

এক্ষেত্রে নিরাপদ স্পর্শের উদাহরণ হিসেবে বলা হয় যদি দাদা-দাদি বা নানা-নানি কেউ জড়িয়ে ধরে এবং গালে চুমু দেয় বা বন্ধুরা হাই ফাইভ দেয়। তবে অনিরাপদ স্পর্শ হিসেবে ইউনিসেফ কিছু বিষয় উল্লেখ করেছে। সেগুলো হলো-

  • যদি ধরলে ব্যথা লাগে
  • যদি এমন জায়গায় ধরা বা স্পর্শ করা হয় যেখানে ধরলে ভালো লাগে না বা যেখানে ধরা উচিত না (ব্যক্তিগত অঙ্গ)
  • অস্বস্তি বোধ হয় বা খারাপ লাগে এমনভাবে কেউ ধরলে
  • যদি এমনভাবে কেউ ধরে যাতে ভয় বা নার্ভাস লাগে
  • যদি তাকে ধরার জন্য বা স্পর্শ করার জন্য শিশুকে জোর করে
  • যদি স্পর্শ করে কাউকে এ বিষয়ে বলতে নিষেধ করে, চুপ থাকতে বলে
  • যদি স্পর্শের কথা কাউকে বললে তার ক্ষতি করার হুমকি দেয়া হয়
  • অস্বস্তি বলতে বোঝানো হচ্ছে – মন খারাপ, রাগ, ভয়, লজ্জা
  • কেউ এমন করলে যাকে বিশ্বাস করা যায় বা আস্থা রাখা যায় এমন মানুষকে বলতে হবে।