যৌন নিপীড়নের দায়ে বাংলাদেশি ইমামের লন্ডনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

পূর্ব লন্ডনের সাবেক ইমাম আব্দুল হালিম খানকে (৫৪) নারী ও শিশুদের ওপর দীর্ঘ দিন ধরে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন লন্ডনের স্নেয়ারসব্রুক ক্রাউন আদালত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের রায় অনুযায়ী, তাকে কমপক্ষে ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। ১১ বছর ধরে অন্তত সাতজন ভুক্তভোগীর ওপর পৈশাচিক নিপীড়নের দায়ে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়।

আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ প্রমাণ করেছে, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে হালিম খান ধর্মীয় প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির নারী ও শিশুদের টার্গেট করে এসব ঘটনা ঘটান।

বিচারক লেসলি কাথবার্ট সাজা ঘোষণার সময় বলেন, “আপনি নিজের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এমন আচরণ করতেন যেন আপনি আইনের উর্ধ্বে বা ধরাছোঁয়ার বাইরে।”

বিচারক আরও বলেন, হালিম খান সুকৌশলে এমন ভুক্তভোগীদের বেছে নিতেন, যারা লোকলজ্জা বা ধর্মীয় কারণে মুখ খুলতে ভয় পাবেন। তিনি জানতেন যে যদি কেউ অভিযোগ করে, তবে মানুষ একজন “সম্মানিত ইমামের” কথাই বিশ্বাস করবে।

মামলার শুনানিতে উঠে আসে শিউরে ওঠার মতো সব তথ্য। আব্দুল হালিম খান ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস করাতেন যে তাদের ওপর বদ জিনের আছর আছে। চিকিৎসার নামে তিনি তাদের নির্জন ফ্ল্যাট বা গাড়িতে করে নিয়ে যেতেন। সেখানে তিনি নিজের ওপর “জিন” ভর করার অভিনয় করতেন। জিন সেজে তাদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালাতেন।

এক ভুক্তভোগী আরিয়া (ছদ্মনাম) জানান, নির্যাতনের সময় হালিম খান তাকে চোখ বন্ধ রাখতে বলতেন এবং গাড়ির জানালায় টোকা মারার শব্দ শুনিয়ে বিশ্বাস করাতেন যে বাইরে অশুভ শক্তি ঘুরছে। আতঙ্কে ১৩ বছরের আরিয়া তখন সব কিছু সহ্য করতে বাধ্য হতো। আরেক কিশোরীকে তিনি এই বলে ভয় দেখিয়েছিলেন, মুখ খুললে তার পরিবার কালো জাদুর প্রভাবে মারা যাবে।

দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত হালিম খানকে মোট ২১টি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। এর মধ্যে ৯টি ধর্ষণের অভিযোগ, চারটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর দুবার যৌন নির্যাতন, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুকে পাঁচবার ধর্ষণ এবং একটি “পেনিট্রেশনের” মাধ্যমে শারীরিক লাঞ্ছনা।

লিড প্রসিকিউটর সারাহ মরিস কেসি বলেন, হালিম খান ভুক্তভোগীদের মনে “চিরস্থায়ী ক্ষত” সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের ধর্মবিশ্বাসকে তাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছেন।

আদালতে ফারাহ (ছদ্মনাম) নামের এক ভুক্তভোগীর জবানবন্দি সবাইকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। তিনি জানান, নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানানোর পর তার মা-বাবা তাকে বিশ্বাস করেননি, বরং তাকেই দোষারোপ করা হয়েছে। ফলে কিশোরী বয়সেই তাকে বাড়ি ছাড়তে হয়।

তিনি বলেন, “আমি আজও আমার পরিচয় নিয়ে সংশয়ে থাকি। যাদের কাছে আমি সুরক্ষা আশা করেছিলাম, তারাই আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।”

ভুক্তভোগীদের একজন হালিম খানকে “শয়তানের প্রতিমূর্তি” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ধর্মের মুখোশ পরে হালিম খান যে অপরাধ করেছেন, তা সাধারণ অপরাধের চেয়েও জঘন্য।

মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেনি রোনান বলেন, “আব্দুল হালিম খান নিজেকে একজন ভালো মানুষ ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতেন। কিন্তু আদতে তিনি ছিলেন এক ভয়ংকর অপরাধী।”