মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে ইরানের ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই দাবি করেছেন, গর্বিত ও বিজয়ী ইরানি জাতি বিশ্বের শয়তানদের নতজানু করেছে এবং তাদের আধিপত্য চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে রেজাই লেখেন, এই ঘটনা ইতিহাসে “চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে”। তবে একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, ইরান তার “শহীদ নেতাদের রক্তের জন্য শোকাহত” এবং এর “প্রতিরোধ ছাড়া কোনো প্রলেপ নেই”।
এদিকে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে একটি কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, নির্ধারিত এই বৈঠকটি হচ্ছে না। এর ফলে চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি আলো দেখার আগেই ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেবাননে ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে ইরান তার প্রতিনিধি দলকে সুইজারল্যান্ডে পাঠাতে বিলম্ব করছে। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে লেবাননেও যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ থাকলেও ইসরাইল তা তোয়াক্কা করছে না। দক্ষিণ লেবাননে গত রাতভর ও শুক্রবার সকাল পর্যন্ত চলা ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ১৮ জন নিহত হয়েছে এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে তীব্র লড়াই চলছে।
লেবাননে হামলার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো আলোচনা তেহরানের ‘রেড লাইনের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তিনি বলেন, “যদি শত্রু অতিরিক্ত আগ্রাসী হয়, তাহলে আমরা প্রমাণ করেছি যে আমাদের আঙুল ট্রিগারে রাখা আছে এবং শত্রুকে চূর্ণকারী জবাব দিতে আমরা কোনো দ্বিধা করব না।”
পরমাণু ইস্যুকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলে ওঠে। জবাবে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে তীব্র ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে ইরান। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ সংঘাতের পর গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ।
তবে লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় সংঘাত থামেনি। পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল পাকিস্তানে দুই দেশের মধ্যে বিরল সরাসরি আলোচনা হলেও তা ব্যর্থ হয় এবং ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এরপর ১৭ এপ্রিল লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও হিজবুল্লাহ তা বর্জন করায় অল্প সময়ের মধ্যে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।
২১ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ালেও ৭ জুন ইসরাইল বৈরুতে ভয়াবহ বোমা হামলা চালায়। এর প্রতিবদে ইরান ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করলে পরদিন ইসরাইল মধ্য ও পশ্চিম ইরানে পাল্টা বিমান হামলা চালায়। ৯ জুন হরমুজ প্রণালীতে হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন হামলার জবাবে ইরান কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ করে। এই তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলার পর গত ১৪ জুন ট্রাম্প যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সমঝোতা স্মারকের ঘোষণা দেন, যা গত বুধবার স্বাক্ষরিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তিটি বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা টিকবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই সংকট নিরসনে রোববার (২১ জুন) মিশরের আলামেইন শহরে জরুরি আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে মধ্যস্থতাকারী তিন দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক। কায়রো ও ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।