ভারতের অযোধ্যার রামমন্দিরের দানবাক্স থেকে কোটি কোটি রুপি আত্মসাতের ঘটনায় তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) জানিয়েছে, নগদ অর্থ গণনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মী পরিকল্পিতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরার দৃশ্য আড়াল করে দানবাক্সের টাকা চুরি করতেন। পরে সেই অর্থ মন্দিরের টয়লেটে লুকিয়ে রেখে সুযোগ বুঝে বাইরে পাচার করা হতো।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার নৈতিক দায় স্বীকার করে রামমন্দির ট্রাস্টের দুই কর্মকর্তা চম্পত রায় ও অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেছেন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তে জানা গেছে, ব্যাংকে জমা হওয়া অর্থের হিসাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রথম অনিয়মের বিষয়টি নজরে আসে। সাধারণত একটি দানবাক্সে ৬ থেকে ৭ লাখ রুপি থাকার কথা থাকলেও কয়েক সপ্তাহ ধরে ৫০০ রুপির নোটের বান্ডিলে ঘাটতি ধরা পড়ে। এরপর অর্থ গণনা কক্ষে গোপনে ক্যামেরা বসানো হলে চুরির পুরো কৌশল ধরা পড়ে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দৃশ্য আড়াল করতেন। সেই সুযোগে আরেকজন কর্মী নোটের বান্ডিল থেকে টাকা সরিয়ে নিজের পোশাকের ভেতরে লুকিয়ে ফেলতেন।
এসআইটির তদন্তে আরও জানা গেছে, অভিযুক্তরা আরেকটি কৌশলেও অর্থ আত্মসাৎ করতেন। তারা প্রতিটি বান্ডিলে অতিরিক্ত নোট ঢুকিয়ে ভাউচার প্রস্তুত করতেন। পরে ব্যাংকে নেওয়ার আগে সেই অতিরিক্ত নোট সরিয়ে ফেললেও ভাউচারের হিসাব ঠিক থাকত। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
চুরি করা অর্থ প্রথমে মন্দিরের টয়লেটে লুকিয়ে রাখা হতো। পরে সুযোগ বুঝে তা বাইরে নিয়ে গিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হতো।
এসআইটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল থেকে ৫ জুন পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজে অন্তত ৭০টি চুরির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, ২০২৪ সালে রামমন্দির উদ্বোধনের পর থেকেই এই চক্র সক্রিয় ছিল।
তদন্তে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মোট কত অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি রুপি গায়েব হওয়ার দাবি করা হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে রাজি নন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ মামলায় গ্রেপ্তার আটজনের মধ্যে অর্থ গণনার দায়িত্বে থাকা ছয় কর্মী অবিনাশ শুক্লা, অনুকল্প মিশ্র, লভকুশ মিশ্র, মনীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে ও রামাশঙ্কর মিশ্র রয়েছেন। এছাড়া সুবাস শ্রীবাস্তব এবং রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নুকেও মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অভিযুক্তদের অনেকেই পরিচিতজনের সুপারিশে চাকরি পেয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, টিন্নু যাদব তাঁর চাচাতো ভাই মনীশ যাদবকে এবং অনুকল্প মিশ্র তাঁর ভগ্নিপতি লভকুশ মিশ্রকে অর্থ গণনার দলে নিয়োগ করিয়েছিলেন।
এসআইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্ব শেষে কর্মীদের দেহ তল্লাশি না করা ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতা। তদন্তে এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে যে, অভিযুক্তদের কয়েকজন চুরি করা অর্থ নিজেদের ব্যাংক হিসাবেও জমা করতেন। এছাড়া ভক্তদের দান করা স্বর্ণালংকার যেমন কানের দুল, নাকফুল, চুড়ি ও নূপুর চুরির অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে মন্দিরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, সিসিটিভি নজরদারি, অর্থ গণনার নথি সংরক্ষণ এবং তদারকি ব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, এসব অনিয়ম আগে থেকেই শনাক্ত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি নির্বিঘ্নে অর্থ আত্মসাৎ করতে সক্ষম হয়েছে।