যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুের চার মাসেরও বেশি সময় পর শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় শোক পালন ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। কয়েক দিনব্যাপী এই কর্মসূচিকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা, ব্যাপক জনসমাগম এবং কড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইরান।
শুক্রবার থেকে রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছে। শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সাধারণ মানুষ রোববার বিকেল পর্যন্ত সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবার খামেনিকে তার জন্মশহর মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে। এর আগে তেহরান, কোম, নাজাফ ও কারবালাসহ একাধিক শহরে জানাজা ও শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
সরকারের ধারণা, পুরো কর্মসূচিতে এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে। এত বড় পরিসরে রাষ্ট্রীয় আয়োজন এর আগে ইরানে কখনও হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বৃহৎ এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে হাজারো সেবাকেন্দ্র স্থাপন, ১০ লাখের বেশি মানুষের থাকার ব্যবস্থা এবং তেহরানের কেন্দ্রজুড়ে নির্ধারিত চলাচলপথ তৈরি করা হয়েছে। পুরো নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের তেহরানভিত্তিক ইউনিট ‘মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর’।
নিরাপত্তার স্বার্থে শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি তেহরানের আকাশসীমাও আংশিক এবং পরে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হবে।
অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, পার্লামেন্টের স্পিকার, মন্ত্রী ও ধর্মীয় নেতারা তেহরানে পৌঁছাচ্ছেন। প্রায় ৮০০ বিদেশি সাংবাদিক এই আয়োজন কাভার করবেন বলে জানিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকারও জানাজায় অংশ নিতে তেহরান সফর করছেন।
আয়োজক কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে প্রত্যেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করতে পারেন।
মঙ্গলবার মরদেহ কোম শহরে নেওয়া হবে। সেখানে জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বুধবার মরদেহ ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হবে। পরে আবার ইরানে ফিরিয়ে এনে বৃহস্পতিবার মাশহাদে দাফন করা হবে।
দাফনের পরও সারা দেশে ৪০ দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক পালন এবং প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণানুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছে ইরান।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির শেষকৃত্য শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে এই আয়োজনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য প্রদর্শন এবং খামেনি-পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামোকে আরও সুসংহত করার চেষ্টা করছে তেহরান।
তবে এখনো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে জল্পনা রয়েছে, জানাজার নামাজে কে ইমামতি করবেন এবং খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন কি না। পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তরই ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।