যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই খামেনির দাফন সম্পন্ন

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের মাশহাদ শহরে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে দাফনের দিনও থামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত।   

ছয় দিনের শোক অনুষ্ঠান শেষে গত বৃহস্পতিবার নিজ শহর মাশহাদে আলী খামেনিকে দাফন করা হয়। লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ সময় কিছু মানুষের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার হুমকিসংবলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়। 

বিবিসির প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি, এদিন ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালির আশপাশের এলাকাও রয়েছে। এর আগের দিন বুধবার ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনের মার্কিন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।  

দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের কয়েকটি এলাকাও হামলার শিকার হয়েছে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

জবাবে ইরান কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে। পাশাপাশি কুয়েত, জর্ডান ও ইরাকের বিভিন্ন স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, মার্কিন হামলায় তেহরান-মাশহাদ সংযোগকারী একটি সেতু ও একটি রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ হামলাকে তারা ‘গুরুতর যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনারাক শহরেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির নৌবাহিনীর একটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, গত কয়েক ঘণ্টায় ইরানের ভেতরে নতুন কোনো হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, “হামলার জবাবে পাল্টা হামলা চলবে। তিনি আরও দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের ব্যবস্থাপনাতেই উন্মুক্ত থাকবে।”

সেন্টকম জানায়, সর্বশেষ হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক রসদ সরবরাহ অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা দুর্বল করা।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক নৌপরিবহনে। আন্তর্জাতিক ট্যাংকার মালিকদের সংগঠন ইন্টারট্যাঙ্কোর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০টি জাহাজ চলাচল করছে। এক সপ্তাহ আগে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ এবং চলতি বছরের শুরুতে ছিল প্রায় ১৩০টি।

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে একাধিক বিস্ফোরণ হয়েছে। এছাড়া সিরিক, জাস্ক ও আবু মুসা দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। চাবাহার বন্দরের নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। বুশেহরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি ব্যারাকেও আগুন লাগার খবর জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “গত মাসে ইরানের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন কার্যত শেষ। ভবিষ্যতে নতুন করে আলোচনা অর্থবহ হবে কি না, তা নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।”

জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, “ইরান হুমকির জবাব কথায় নয়, কাজে দেবে।”

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, আলোচনা অব্যাহত রাখা, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল এবং ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ১৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে চলমান সংঘাতের কারণে সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।