যুদ্ধের ধরন ও কৌশল বদলাচ্ছে রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধে দিন দিন তীব্র সেনা সংকটে পড়ছে রাশিয়া। রণক্ষেত্রে প্রতিদিন শত শত নতুন সেনা নিয়োগ দেওয়া সত্ত্বেও নিহত ও আহতের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি হওয়ায় মস্কোর পক্ষে পুরোনো ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সরাসরি স্থলযুদ্ধের চাপ সামলাতে কৌশল বদলে এখন ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার নতুন সেনা নিয়োগ করছে। কিন্তু গত দুই মাসে রুশ সেনাবাহিনীর হতাহতের সংখ্যা নতুন নিয়োগ প্রাপ্তির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে মস্কো প্রতি মাসে নতুন নিয়োগের তুলনায় প্রায় ৬ হাজার বেশি সেনা হারাচ্ছে। এই বড় ঘাটতি মেটাতে ক্রেমলিন আবারও নতুন করে বড় আকারের সেনা সমাবেশের (মোবিলাইজেশন) সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ২০২২ সালের অভিজ্ঞতা থেকে এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের শরতে সর্বশেষ বড় ধরনের সেনা সমাবেশের সময় প্রায় ১০ লাখ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন রুশ নাগরিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, যাদের অর্ধেকেরও কম পরে ফেরত এসেছেন। এছাড়া একসঙ্গে লাখ লাখ নতুন সেনাকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার মতো অবকাঠামোগত সক্ষমতাও রুশ বাহিনীর বেশ সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে পুতিন ইউক্রেনীয় বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের কৌশল থেকে সরে এসে অবকাঠামো ধ্বংসের নীতি বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা পশ্চিমা কর্মকর্তাদের। তাদের তথ্যমতে, জুলাইয়ের শুরু থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের দিকে ৩৬০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। আসন্ন শীতের আগেই ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল করে সাধারণ মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগানোই এখন মস্কোর প্রধান লক্ষ্য।

অন্যদিকে, ইউক্রেনও পাল্টা জবাব হিসেবে রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহে টান ফেলেছে। লড়াই চালিয়ে যেতে কিয়েভ পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আরও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চেয়েছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম কিইভ সফর করে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর ব্রিটেনে তৈরি দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য।

যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে মস্কো। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের মতে, রাশিয়া সরাসরি ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে না চাইলেও যুক্তরাজ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোর বেসামরিক স্থাপনা, সরবরাহ গুদাম ও গুরুত্বপূর্ণ কারখানায় সাইবার হামলা বা প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নাশকতা চালাতে পারে।

সব মিলিয়ে, রণক্ষেত্রে চরম সেনা ঘাটতি রাশিয়াকে স্থলযুদ্ধে পিছু হটে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের কৌশলে জোর দিতে বাধ্য করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।