যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক হামলা শুরুর পর ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে লড়াই কখনো তীব্র আকার ধারণ করেছে, কখনো বা সাময়িক বিরতি শেষে নতুন শক্তিতে রূপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ একের পর এক পোস্টের মাধ্যমে নিজ অবস্থান ও রণকৌশল তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ছয় মাসে ট্রুথ সোশ্যালে ইরান ইস্যু নিয়ে ট্রাম্প অন্তত ৩১৯টি পোস্ট করেছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ১৪ ঘণ্টায় তিনি অন্তত একটি পোস্টের মাধ্যমে ইরান সংকটের ওপর বক্তব্য প্রকাশ করেছেন। এই পোস্টগুলোর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আল জাজিরা ট্রাম্পের নিজস্ব ভাষায় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের এক ভিন্নধর্মী সময়ক্রম তৈরি করেছে, যেখানে আক্রমণাত্মক হুমকি থেকে শুরু করে সরাসরি হামলা চালানো এবং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ট্রুথ সোশ্যালে ডোনাল্ড ট্রাম্প মোট ৪ হাজার ১৮৯টি পোস্ট করেছেন, যার প্রতি ১৩টি পোস্টের মধ্যে একটি ছিল ইরানকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে সকাল ৮টা থেকে ১১টার মধ্যবর্তী সময়ে (ওয়াশিংটন সময়) সবচেয়ে বেশি পোস্ট করা হয়েছে, যা তেহরানের সময়সূচি অনুযায়ী ছিল তৎকালীন সন্ধ্যা।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে এসব পোস্টে ‘ইরান’ শব্দটি ৫১০ বার উচ্চারিত হলেও, এর ঠিক পরেই সবচেয়ে বেশি এসেছে ট্রাম্পের নিজের ও যুক্তরাষ্ট্রের নাম। তিনি নিজেকে ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প’ বা ‘প্রেসিডেন্ট ডিজেটি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ২২১ বার। এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র, হরমুজ প্রণালি বা ইসরায়েলের মিলিত নাম যতবার এসেছে, তার চেয়েও বেশিবার ট্রাম্প নিজের নাম পোস্টগুলোতে এনেছেন। আর প্রায় ২৫ শতাংশ পোস্টের ইতি টেনেছেন তাঁর স্বভাবসুলভ বিদায়বাক্য- ‘এই বিষয়ে আপনার মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ’ লিখে।
সামরিক সংঘাতের সূচনাপর্বের আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্পের পোস্টগুলোতে হুমকি ও আলোচনার এক মিশ্র সুর পাওয়া যায়। একদিকে তিনি তেহরানকে দ্রুত ‘চুক্তি করুন’ বলে আহ্বান জানান এবং ইরানের ওপর বিশেষ শুল্কারোপের ভয় দেখান; অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় পূর্বে চালানো মার্কিন হামলার প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দিতে থাকেন।
অবশেষে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর ঘোষণা দিলে, ঠিক ৫৫ মিনিটের মাথায় ট্রাম্প ৮ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সামরিক অভিযান শুরুর আনুষ্ঠানিক কথা স্বীকার করেন। সেদিনই তিনি ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন এবং পরবর্তী দুই সপ্তাহে আরও ৪০টি পোস্টের মাধ্যমে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া কোনো সমঝোতা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন।
যুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পের পোস্টগুলোতে চরম সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপের কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হয়।
১৩ ও ১৪ মার্চ: খারগ দ্বীপে সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করলেও তেল অবকাঠামো অক্ষত রাখার কারণ হিসেবে তিনি ‘শালীনতার’ কথা উল্লেখ করেন। পরে তিনি দাবি করেন যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার শতভাগ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
৭ এপ্রিল: এক বিস্ফোরক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, "আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মারা যাবে।" তবে পাকিস্তান সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুরোধে মাত্র ১০ ঘণ্টার মাথায় সেই ধ্বংসাত্মক হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে তিনি হরমুজ প্রণালি খোলার শর্ত দেন।
১২ এপ্রিল: হরমুজ প্রণালিতে ঢোকা ও বের হওয়া সব জলযান থামাতে মার্কিন নৌবাহিনীকে দিয়ে 'ইস্পাতের দেয়াল' নামের কঠোর অবরোধের নির্দেশ দেন ট্রাম্প।
৩ মে: অসংলগ্ন দেশগুলোর জাহাজ পারাপারে 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' অভিযানের কথা বলা হলেও আন্তর্জাতিক অনুরোধে তা স্থগিত হয়।
যদিও ইসরায়েল এই যুদ্ধে আমেরিকার প্রধান মিত্র ছিল, তবুও ট্রাম্পের পোস্টে ইসরায়েলের উল্লেখ ছিল অত্যন্ত সীমিত। পুরো ছয় মাসে ইসরায়েলের কথা এসেছে মাত্র ৩২ বার এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম এসেছে মাত্র দুইবার। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, ইসরায়েল তাকে এই যুদ্ধে নামায়নি।
জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের মধ্যস্থতায় এক সংক্ষিপ্ত সমঝোতা বাস্তবায়নের কথা ট্রাম্প নিশ্চিত করলেও তা স্থায়িত্ব পায়নি। ২৬ জুন মার্কিন তরফ থেকে দাবি করা হয় যে ইরান চারটি ড্রোন ছুড়ে জাহাজ আক্রান্ত করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতকেন্দ্র এবং উপকূলীয় রাডারে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের জন্য তেহরানকে দায়ী করে।
সর্বশেষ ১০ জুলাই ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন যে 'যুদ্ধবিরতি সমাপ্ত' এবং পুনরায় হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌঅবরোধ পুনর্বহাল করা হয়। আগস্টের শুরুতে নতুন এক নিয়মের কথা তুলে ধরে তিনি সতর্ক করেন যে, ইরান প্রণালিতে আক্রমণ চালালে তার খেসারত হিসেবে সেখানকার সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিমান হামলা চালানো হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ধারাবাহিক বার্তাগুলো প্রমাণ করে যে, কৌশলগত সামরিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ট্রুথ সোশ্যালকেই তিনি জনমত গঠন ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।