জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার সীমিত করতে নতুন এক উদ্যোগ নিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তানদের পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার সময় মা-বাবার নিজেদের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন বৈধতার প্রমাণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার সর্বশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই প্রস্তাব করা হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা খসড়া নির্দেশনায় ট্রাম্পের গত ৬ আগস্টের নির্বাহী আদেশ কীভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে, তার প্রথম বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে।
এই আদেশে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তান জন্ম দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন বন্ধ এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ব্যতিক্রমগুলোর পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তার প্রশাসন মার্কিন নাগরিকত্বের অর্থ ও মর্যাদা পুরোপুরি রক্ষা করবে। পাসপোর্ট দেওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়াটি নতুন নিয়মের মধ্যে পড়ে; যাতে যথাযথভাবে এই মানদণ্ড মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।”
নতুন নির্বাহী আদেশে কী আছে
ট্রাম্পের আগের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কোনো শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাবে কেবল তখনই, যখন তার মা-বাবার অন্তত একজন মার্কিন নাগরিক অথবা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা, অর্থাৎ গ্রিন কার্ডধারী।
তবে ৬-৩ ভোটে দেওয়া এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ওই আদেশকে বেআইনি ঘোষণা করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকেরা মনে করেন, এই বিধিনিষেধ মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৬ আগস্টের নতুন নির্বাহী আদেশটি আগের উদ্যোগের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সীমিত। এতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘বার্থ ট্যুরিজম’-এর ওপর। সন্তান জন্মের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যেসব নারী যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেন, তাদের সন্তানদের নাগরিকত্বের যোগ্যতা নতুন ব্যবস্থার আওতায় যাচাই করা হতে পারে। তবে আদেশটি আদালতের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
খসড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো শিশুর মা-বাবার কেউ যদি যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি সরকারের হয়ে কাজ করেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য প্রতারণা বা কোনো ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেনে যুক্ত থাকেন কিংবা ‘এলিয়েন এনেমি’ বা শত্রুভাবাপন্ন বিদেশি হিসেবে বিবেচিত হন, তাহলে ওই শিশুর নাগরিকত্বের দাবিতে বাধা তৈরি হতে পারে।
নির্দেশনায় নির্বাহী আদেশ ১৪৪১৮-এর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কোনো আবেদনকারী ওই আদেশের আওতায় পড়ে কি না, তা নির্ধারণের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মা-বাবার তথ্য এবং তাদের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন অবস্থার প্রমাণ চাইতে পারবে।
পাসপোর্ট আবেদনে কী নথি লাগতে পারে
নতুন নিয়ম চালু হলে সন্তানের পাসপোর্টের আবেদন করার সময় মা-বাবা বা আইনগত অভিভাবকদের নিজেদের নাগরিকত্বের নথি জমা দিতে হতে পারে। মার্কিন নাগরিকদের ক্ষেত্রে বৈধ পাসপোর্ট বা জন্মসনদের মতো নথি চাওয়া হতে পারে।
আর যারা মার্কিন নাগরিক নন, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকার প্রমাণ দিতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আই-৯৪ ফর্ম বা গ্রিন কার্ডের মতো অভিবাসন-সংক্রান্ত নথি জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এসব তথ্য যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট শিশু নতুন নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নির্ধারণ করবে সরকার।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর পাসপোর্টের আবেদনে মা-বাবাকে মূলত সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ এবং ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র দিতে হয়। আবেদনপত্রে তাদের মার্কিন নাগরিকত্বের অবস্থাও জানাতে হয়। তবে সেই তথ্যের পক্ষে আলাদা কোনো নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
আদালতে চ্যালেঞ্জ
ট্রাম্পের প্রথম নির্বাহী আদেশের কারণে যেসব শিশু নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের পক্ষে আইনজীবীরা নতুন আদেশের বাস্তবায়ন ঠেকাতে দুটি পৃথক ফেডারেল আদালতে আবেদন করেছেন।
এর একটি মামলা চলছে ফেডারেল জেলা বিচারক ডেবোরা বোর্ডম্যানের আদালতে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে তিনি বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
গত ২৮ আগস্ট মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে অনুষ্ঠিত শুনানিতে বোর্ডম্যান ট্রাম্পের আদেশকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেন এবং এর বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে আদেশটির বাস্তবায়ন বন্ধ করা হবে কি না, তা বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে বাদীপক্ষকে মামলা সংশোধনের অনুমতি দেন তিনি।
অন্যদিকে, বিচার বিভাগের আইনজীবীরা আদালতে বলেছেন, এখনই আদেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সমীচীন হবে না। তাদের যুক্তি, সংশ্লিষ্ট ফেডারেল সংস্থাগুলো এখনো নির্বাহী আদেশটি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে কোনো প্রকাশ্য নির্দেশনা দেয়নি। ফলে এ পর্যায়ে করা আইনি চ্যালেঞ্জটি সময়ের আগেই নেওয়া হয়েছে।