নেতানিয়াহু থাকছেন কি না জানা যাবে আজকের নির্বাচনে

ইসরায়েলের নাগরিকরা আজকের নির্বাচনে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভবিষৎ ও ক্রমশ ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাবেন। বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া এই নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

ইসরায়েলের ১২০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৬১টি আসন। নির্বাচনে কোনো একক দলই এই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে না।

প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, ইসরায়েলে সবচেয়ে দীর্ঘসময়েরে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্যপন্থী গাদি আইজেনকোটের জনপ্রিয়তায় প্রায় সমান সমান। সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট রাজনীতিতে নবীন।

ইসরায়েলে প্রায় ৭৩ লাখ মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ লাখেরও বেশি তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। জরিপ অনুযায়ী, এসব তরুণের অধিকাংশই নিজেদের মধ্য-ডানপন্থী বা ডানপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী বলে মনে করেন।

ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত এই নির্বাচনে ভোট দিতে বিদেশ থেকে কয়েক ১০,০০০ ইসরাইলি দেশে ফিরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু বিরতি দিয়ে দিয়ে মোট ১৯ বছরেরও বেশি সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এনেছেন। নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরাইলিদের নিরাপদ রাখার সক্ষমতা একমাত্র তারই রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে একাধিক যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েল। এসব যুদ্ধে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রথমবারের মতো ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে।

এদিকে, দেশের ভেতরেও ইসরায়েলিরা ইরান, হামাস, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে পড়েছেন।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন নেতানিয়াহু। সে সময় তিনি তার সরকারে উগ্র ডানপন্থী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর থেকে ইসরায়েলের রাজনীতিতে এসব দলের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সামরিক বাহিনীতে জনবলের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অতি-গোঁড়া ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ থেকে অব্যাহতি বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় নেতানিয়াহুকে সমালোচনা করছে বিরোধীরা। এ ক্ষেত্রে তার সরকারের অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতাও বিরোধীদের সমালোচনার অন্যতম কারণ।

তবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার দায় তিনি স্বীকার করেননি। ওই হামলাটি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন হিসেবে বিবেচিত।

এদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান ও ৬৬ বছর বয়সী বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ওই হামলার পেছনে থাকা নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করবেন।

নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে আইজেনকোটের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একটি অনানুষ্ঠানিক জোট গড়ে উঠেছে। তার দল ‘ইয়াশার’-এর নেতৃত্বে থাকা এই জোটে ডানপন্থী থেকে মধ্য-বামপন্থী বিভিন্ন মতাদর্শের দল রয়েছে।

আইজেনকোট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে তিনি সহিংসতায় জড়িত ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট—কেউই প্রকাশ্যে প্রধানত আরব ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের জোটে যাওয়ার ঘোষণা দেননি। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১% আরব। নির্বাচনে প্রত্যাশিত ব্যবধানে ফলাফল হলে এসব দল সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এরপর সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা করতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবারও নতুন নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।