যুক্তরাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী রাজত্বকারী রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর কোহিনুর বা কোহ-ই-নুর নামক হীরা ফেরত দেওয়ার দাবি করছেন অনেক ভারতীয়। হীরা এই প্রয়াত রানির মায়ের জন্য তৈরি করা মুকুটে রাখা হয়েছিল।
ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর টুইটারে “কোহিনুর” শব্দটি নিয়ে ট্রেন্ডিং শুরু হয়েছে ভারতে। ভারতীয়রা দাবি করতে শুরু করেছে যে, ১০৫-ক্যারেট ডিম্বাকৃতির “আলোর পাহাড়” রত্নটি রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পরপরই তার উৎপত্তিস্থলে ফিরিয়ে আনা হোক।
রানি এলিজাবেথের মায়ের জন্য বানানো মুকুটে ২ হাজার ৮০০ মূল্যবান পাথর বসানো হয়। ওই হীরাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ১০৫ ক্যারেটের ডিম্বাকৃতির জ্বলজ্বলে সেই কোহিনুর হীরা। এটি বর্তমানে সবচেয়ে দামি রত্নগুলোর একটি। ১৪ শতকে ভারতের গোলকুণ্ডা খনিতে হীরাটি পাওয়া গিয়েছিল এবং কয়েক শতাব্দীতে এটির মালিকানা বেশ কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছে।
১৯৪৭ সালে ও পরবর্তীতে ভারত সরকার বহুবার কোহিনুরের প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুরোধ করেছে। তবে ব্রিটেন ক্রমাগত এই দাবির বিরোধিতা করে আসছে।
রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর পর কে পাচ্ছেন কোহিনুরের মুকুট?
সর্বশেষ বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানি কনসোর্ট ক্যামিলা এখন বিখ্যাত হীরার মুকুটটি পড়বেন। রাজা চার্লস তৃতীয় যখন আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে বসবেন তখনই রানি ক্যামিলা এটি প্রথম পড়বেন।
ব্রিটেন কি ভারতকে কোহিনুর ফেরত দেবে?
রত্ন ফেরত দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই বলেই জানা গেছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী অলোক শর্মা ২০১৬ সালে ভারত সফরের সময় বলেছিলেন, “যুক্তরাজ্য সরকার বিশ্বাস করে যে হীরা পুনরুদ্ধারের জন্য কোনো আইনি ভিত্তি নেই।”
কোহিনুর যেভাবে ভারত থেকে ব্রিটেনে গেলো
লিখিত রেকর্ডে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোহিনুর প্রথম সামনে আসে। মুঘল সম্রাট শাহজাহান ১৬২৮ সালে সিংহাসনকে একটি বড় রত্নখচিত করার আদেশ দেন। স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনে উল্লেখ আছে, ইহুদি ধর্ম এবং খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাসে দেখা যায়, অলঙ্কৃত সৃষ্টিটি তার নকশার ইঙ্গিত নিয়েছিল ইসলামের কিংবদন্তী হিব্রু সুলতান সুলেমানের সিংহাসন থেকে।
কোহিনুর হীরা এবং তৈমুর রুবি দুটি খুব বড় রত্ন ছিল যা সিংহাসনকে সাজানোর জন্য ব্যবহার করা সমস্ত মূল্যবান পাথরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান। হীরাটি সিংহাসনের একেবারে শীর্ষে ময়ূরের মাথায় একটি উজ্জ্বল রত্নপাথর হিসেবে স্থাপন করা হয়।
পারস্যের নাদের শাহসহ মধ্য এশিয়ার অন্যান্য রাজাদের এই ধরনের সম্পদে আগ্রহ জন্মেছিল। ১৭৩৯ সালে নাদের শাহের দিল্লী আক্রমণে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ যায় এবং মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ক্ষতিসাধন হয়।
স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের ফিচারে আরও বলা হয়, নাদের শাহ তার লুটের অংশ হিসেবে ময়ূর সিংহাসনটি করায়ত্ত করেছিলেন এবং তিনি সিংহাসন থেকে বের করে কোহিনূর হীরা ও তৈমুর রুবি তার বাহুবন্ধনিতে নিয়েছিলেন।
কোহিনুর হীরাটি ৭০ বছর ভারত থেকে দূরে ছিল, যা শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের সম্পদে পরিণত হয়। একের পর এক ট্র্যাজেডিতে, এটি বেশ কয়েকটি রাজার হাত বদল হয়।
বছরের পর বছর সংঘর্ষের পর, হীরাটি ভারতে ফিরে আসে এবং ১৮১৩ সালে শিখ রাজা রঞ্জিত সিং অধিগ্রহণ করেন। কোহিনুরের প্রতি সিং-এর নির্দিষ্ট সখ্যতা রত্নটির মর্যাদা এবং ক্ষমতার আভাকে দৃঢ় করে। ১৮৩৯ সালে রঞ্জিত সিং-এর মৃত্যুর পর চার বছরে চারটি ভিন্ন লোকের হাতে মুকুটটি ছিল। সমস্ত বিশৃঙ্খলা অবসানের পর বালক দিলীপ সিং ও মা রানি জিন্দানের জন্য হীরাখচিত মুকুটটি রাখা ছিল।
স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের ফিচারে বলা হয়েছে, ব্রিটিশরা, যারা ততদিনে ভারতের ওপর তাদের দখলদারিত্ব শক্ত করেছিল, তারা দিলীপকে একটি আইনি নথিতে সই করতে বাধ্য করেছিল। যার জন্য ১০ বছর বয়সী ছেলেটিকে কোহিনূর এবং সার্বভৌমত্বের সমস্ত দাবি ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
সেই দিক থেকে, রানি ভিক্টোরিয়া হীরাটির গর্বিত মালিক ছিলেন। ভিক্টোরিয়া একটি ব্রোচ হিসেবে কোহিনূর পরতেন, পরে এটি ক্রাউন অলঙ্কারের একটি অংশে পরিণত হয়।