মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান ডিগনিটি ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৬৭টি দেশে আইন করে সমকামিতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি দেশে সমকামিতার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
মিসরেও সমকামিতাকে দেখা হয় “অত্যন্ত কলঙ্কজনক অপরাধ” হিসেবে। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, দেশটির পুলিশ কৌশলে অনলাইনে সমকামীদের হেনস্তা করে আসছে। এই অভিযোগের বিষয়ে বেশকিছু তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
বিবিসি দেখেছে, ডেটিং অ্যাপস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশটির পুলিশ কীভাবে সমকামী ও এলজিবিটিকিউদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে আসছে।
মিসরে সমকামিতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট কোনো আইন নেই। তবে, “অবৈধ” যৌন সম্পর্কের আইনে সমকামীদের প্রায়ই হেনস্তার মুখে পড়তে হচ্ছে দেশটিতে। এই ধরনের অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে পুলিশের অভিযানের প্রতিবেদনগুলোতেও সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়।
মিসরের সমকামী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পুলিশ তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে কথোপকথন শুরু করে। পুলিশের পাতানো ফাঁদে কেউ পা রাখলেই সে মুখোমুখি হয় ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার।
একজন ডেটিং অ্যাপস ব্যবহারকারী বিসিসিকে জানান, পুলিশ কৌশলে তার যৌন আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে জেনেছে। অ্যাপসে পুলিশ সমকামী সেজে প্রথমে কথাবার্তা শুরু করে। পরে দেখা করার জন্য চাপ দেয়। তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “পুলিশ প্রথমে আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, আমি পুরুষদের সঙ্গে এর আগে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করেছি কি-না। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর পুলিশ আমাকে দেখা করার জন্য চাপ দিতে থাকে। আমি যখন বললাম, আমি মা-বাবার সঙ্গে থাকি, তখন অপরপ্রান্তের ছদ্মবেশি পুলিশ টেক্সট করেছিল, ‘লজ্জা পেয়ো না। আমরা জনসমক্ষে দেখা করবো তারপর আমার ফ্ল্যাটে চলে যাব'।”
বিবিসি জানিয়েছে, এমন আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। মিসরে অশ্লীলতা বা জনসাধারণের নৈতিকতা আইনের প্ররোচনার ভিত্তিতে সমকামীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। শুধু মিসরীয়রাই পুলিশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন এমনটা নয়। অনেক বিদেশিও তাদের হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
একজন বিদেশি নাগরিক বিবিসিকে জানান, অ্যাপসে পুলিশ প্রথমে তাকে বিনামূল্যে যৌনসঙ্গমের প্রস্তাব দেয়। জানতে চায়, তার এমন কোনো কাজে আগ্রহ রয়েছে কি-না। পরে তার বিরুদ্ধে “ব্যভিচারের” অভিযোগ আনা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর তাকে নির্বাসনে পাঠায় মিসরীয় পুলিশ।
মিসরের আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পুলিশ অনেক সময় কেবল অর্থের প্রয়োজনে এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে। যেহেতু আদালতে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় প্রমাণ তারা পেয়ে যায় সেহেতু তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বেগ পেতে হয় না।
এছাড়া পুলিশ এভাবে অনেক নিরীহ ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন নৃত্যশিল্পী জানান, তাকে ২০১৮ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার বন্ধুর কাছ থেকে তার কাছে প্রথমে একটা ফোন আসে। ফোনে তার বন্ধু তাকে মদ্যপানের প্রস্তাব দেয়। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে তিনি তার বন্ধুকে দেখতে পাননি সেদিন। পুলিশ সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।
এরপরে তার শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “ওই সময়টাতে আমি আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেছিলাম।”
তিনি দাবি করেন, সমকামিতার অভিযোগে ফাঁসাতে পুলিশ একটি ডেটিং অ্যাপে তার নামে জাল অ্যাকাউন্ট তৈরি করেছিল। সেখানে এডিট করে তার ছবি বসানো হয়েছিল। সেখানে ছবিতে যে পা দেওয়া হয়েছে সেটি তার নয়।
একই রকম হেনস্তার শিকার আরও কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদের এমন অভিযোগে ফাঁসিয়ে পুলিশ জোর করে মিথ্যে স্বীকারোক্তি নিয়েছে।
“ব্যভিচারের” অভিযোগে ৩ মাসের সাজাপ্রাপ্ত একজন জানিয়েছেন, পুলিশ তাকে অন্য সমকামীদের সম্পর্কে জানাতেও চাপ দিচ্ছিল।
মিসরের সরকারও সমকামীদের বিষয়ে কঠোর হয়েছে। ফলে দেশটি বিদেশি সমকামী পর্যটকদের জন্য কোনোভাবেই আর নিরাপদ মনে করেন না যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট মেম্বার ও পররাষ্ট্র কমিটির অ্যালিসিয়া কার্নস।
তিনি বিবিসিকে বলেন, “তিনি সমকামী ভ্রমণকারীদের মিসরের মতো দেশে ঝুঁকির বিষয়ে অবগত। কেননা দেশটিতে নিজের যৌতার জন্য তাদের বিপদে পড়তে হতে পারে। আমি মিসরের সরকারকে তাদের এমন কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য অনুরোধ জানাব।”
প্রসঙ্গত, মিসরের অন্যতম পশ্চিমা মিত্র যুক্তরাজ্য। প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখের বেশি ব্রিটিশ পর্যটক দেশটিতে যান।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বিবিসি মিসরের সরকারের মন্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিল। তবে তাদের অনুরোধে কোনো সাড়া আসেনি।
তবে, ২০২০ সালে মিসরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাবেক সহকারী আহমেদ তাহের স্থানীয় একটি পত্রিকাকে বলেছিলেন, “আমরা ভার্চুয়াল জগতে পুলিশ নিয়োগ করেছি। ‘গ্রুপ সেক্স পার্টি', সমকামী সমাবেশ কমানোর জন্য। এছাড়া এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্তদের চিহ্নিত করতেও কাজ করা হচ্ছে।”