এরদোয়ানের ঘাড়ে কিলিকদারোগ্লুর নিঃশ্বাস

ভোটের আগেও ছিলেন একরকম অচেনা মুখ। কিন্তু নির্বাচন শেষে এখন তিনিই আলোচিত। তুরস্কের সুলতান খ্যাত প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের মসনদ একরকম নড়বড়ে তার সামনে। দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে অবসরপ্রাপ্ত আমলা কামাল কিলিকদারোগ্লু।

ভোটের ফলাফল গণনার পর দেখা গেছে এরদোয়ানের ভাগ্যে প্রয়োজনীয় ৫০% ভোট জোটেনি। তার একেবারে কাছাকাছি ৪৫% ভোট পেয়েছেন ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী নেতা কিলিকদারোগ্লু। তাকে মনে করা হচ্ছে মসনদের অন্যতম দাবিদারও।

নির্বাচনের আগের জরিপে কিলিকদারোগ্লু ৫০% ভোট পেতে পারেন বলে জানানো হয়েছিল।

এরদোয়ানের প্রচলিত অর্থনীতির পদ্ধতি দেশটিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইউরোর বিপরীতে লিরার মান পড়ে যাচ্ছিল। ফলে তার পরাজয় হতে পারে এমন শঙ্কা আগেই ছিল।

তবুও ভোটে এরদোয়ানের যে অর্জন তাতে তিনি এখনও ফুরিয়ে যাননি এটিই প্রমাণ করছে। গত দুই দশকে তিনি জাতীয় কোনো ভোটে পরাজিত হননি।

কিলিকদারোগ্লুর দাবি, তিনি যে ভোট পেয়েছেন, তাতে দেশের মানুষ তার নেতৃত্ব চায় এমনটিই জবাব দিয়েছেন। এজন্য ভোট গণনা চলার সময় সমর্থকদের ব্যালট বাক্স পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার ভোরে তুরস্কের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের তিনি বলেন, জাতির ইচ্ছাকে ভয় পাবেন না।

আগামী ২৮ মে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট পদে রানঅফ ভোট হবে। সেখানে কিলিকদারোগ্লুর সামনে রয়েছে ইতিহাস গড়ার হাতছানি। ২০০৯ সাল থেকে স্থানীয় নির্বাচনে এরদোয়ান ও তার সমর্থিত দলগুলোকে বহুবার পরাজিত করেছেন তিনি।

এরদোয়ানকে চ্যালেঞ্জ করার দৌড়ে নামার সময় কিলিকদারোগ্লুর ছয় দলের বিরোধী জোটে ভাঙন দেখা দিয়েছিল।

তবুও শেষমেস একটি জোট গঠন করতে সক্ষম হন তিনি। যার ফলাফলও দেখা গেলো ভোটের জয়ের মধ্য দিয়ে।

কিলিকদারোগ্লুর জাতীয়তাবাদী মিত্র মেরাল আকসেনার টুইট করেছেন, আমরা জিতেছি। ফলাফল স্পষ্ট হয়ে গেছে।

আমলা থেকে রাজনীতিবিদ

১৯৪৮ সালে তুনসেলিতে জন্মগ্রহণ করেন কিলিকদারোগ্লু। রাজনৈতিক খ্যাতি অর্জনের পেছনে তুর্কি আমলাতন্ত্রের মধ্যে তার ব্যাপক কর্মজীবন ও জনপ্রিয়তা ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের সেক্রেটারি-জেনারেল হিসাবে কাজ করেছেন কিলিকদারোগ্লু।

তার টেকনোক্র্যাটিক দক্ষতা ও অপ্রতিরোধ্য আচরণ তাকে একজন বাস্তববাদী প্রশাসক হিসেবে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। সেই দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে তিনি রাজনীতিতেও নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছেন।

দলীয় নেতৃত্ব

রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) নেতৃত্ব থেকে সাবেক নেতা ডেনিজ বেকালের পদত্যাগের পর ২০১০ সালে কিলিকদারোগ্লু দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন।

একাধিক সাধারণ নির্বাচনে সিএইচপিকে নেতৃত্ব দিয়ে কিলিকদারোগ্লু তুরস্কের প্রধান বিরোধী দলের প্রধান হিসাবে নিজেকে প্রমাণিত করেছেন।

বছরের পর বছর ধরে তার নেতৃত্বে দলটি ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (একেপি) চ্যালেঞ্জ করেছে।

এখন তার নেতৃত্বে জাতীয় পর্যায়ে সরকার গঠনের পথে দলটি।

অর্জন

ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সহানুভূতি, মেরুকৃত রাজনৈতিক আবহাওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকাসহ রাজনৈতিক কর্মজীবনে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন কিলিকদারোগ্লু।

তবুও তার সফলতা কম নয়। ২০১৯ সালে বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় জয় পায় দলটি।

কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই

বর্বর ও বোমাসুলভ এরদোয়ানের বৈপরীত্যের একটি উদাহরণ মৃদুভাষী কিলিকদারোগ্লু। একজন জনতাবাদী হওয়ার কারণে তুরস্কের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে উত্থান ঘটেছে তার।

এরদোয়ান যেখানে কিলিকদারোগ্লুকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। সেখানে কিলিকদারোগ্লু তুলে ধরেছেন তুর্কিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার দুর্দশা।

তার প্রধান অঙ্গীকারের মধ্যে একটি হলো, শাসন ক্ষমতা পার্লামেন্টের কাছে হস্তান্তর করা।