Saturday, July 18, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কয়েক ঘণ্টার একটি অভ্যুত্থান যেভাবে পাল্টে দিয়েছে তুরস্কের ইতিহাস

তুরস্কের ক্ষমতার কাঠামো, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০২:০৬ পিএম

২০১৬ সালের ১৫ জুলাই তুরস্কে সংঘটিত ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ওই অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হলেও এর পরবর্তী এক দশকে তুরস্কের ক্ষমতার কাঠামো, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

অভ্যুত্থানের রাতে রাজধানী আঙ্কারা ও ইস্তানবুলে রাস্তায় গোলাগুলি, ট্যাংকের অবস্থান, যুদ্ধবিমানের নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া এবং সংসদ ভবনে হামলার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। তুরস্কে অতীতে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ও হস্তক্ষেপ ঘটলেও সংসদ ভবনে হামলার মতো ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি।

পরিস্থিতির মধ্যে অজ্ঞাত একটি স্থান থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টেলিভিশনে যুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জনগণকে রাস্তায় নেমে অভ্যুত্থান প্রতিরোধের আহ্বান জানান। দেশের বিভিন্ন মসজিদ থেকেও লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সেই আহ্বান প্রচার করা হয়। পরদিন ভোরের মধ্যেই অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

সরকারি হিসাবে, ওই ঘটনায় ২৫৩ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ১৮৪ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া অভিযুক্ত ৩৪ জন অভ্যুত্থানকারীও নিহত হন।

অভ্যুত্থানচেষ্টার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইসলামি ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেন ও তার অনুসারীদের দায়ী করে তুরস্ক সরকার। যদিও ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গুলেন এ অভিযোগ অস্বীকার করে গেছেন।

ঘটনার পর জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। এ সময় দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করে সরকার।

অভিযানের অংশ হিসেবে হাজার হাজার সেনা কর্মকর্তা, বিচারক, প্রসিকিউটর, পুলিশ সদস্য, শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মচারীকে গ্রেপ্তার, বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গুলেনপন্থি অভিযোগে শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সরকারের দাবি ছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে গুলেনপন্থি নেটওয়ার্ক নির্মূল করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই অভিযানের মাধ্যমে ভিন্নমতও দমন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যুত্থানচেষ্টার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের হাতে নির্বাহী ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীভূত হওয়া।

২০১৭ সালের গণভোটে সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালুর পক্ষে রায় দেন ভোটাররা। ২০১৮ সালে সেই ব্যবস্থা কার্যকর হলে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত হয় এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

সরকারের ভাষ্য, নতুন ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। তবে সমালোচকদের মতে, এতে রাষ্ট্রক্ষমতা একজন ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

অভ্যুত্থানচেষ্টার পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউজ তাদের মূল্যায়নে বলেছে, রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার অধীনে আইনপ্রণেতাদের ভূমিকা দুর্বল হয়েছে এবং নীতিনির্ধারণে প্রেসিডেন্টের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক দোগান চেতিনকায়ার মতে, ১৫ জুলাইয়ের পর তুরস্কের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বায়ত্তশাসনের বড় অংশ হারিয়েছে। বিচার বিভাগ ও আইনসভাও আগের মতো কার্যকর ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এক দশক পরও ২০১৬ সালের সেই ব্যর্থ অভ্যুত্থান তুরস্কের রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।

   

About

Popular Links

x